কর্মক্ষেত্রে মানসিক নির্যাতন : ছোট পদের নারী কর্মীর অসহায়ত্ব ও এক নারী বসের ক্ষমতার অপব্যবহার
ঘরের শান্তির মতোই অফিসের শান্তি মানুষের স্বাভাবিক বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বর্তমান সময়ে অনেক কর্মক্ষেত্রেই তা ডুমুরের ফুল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে যারা তুলনামূলক ছোট পদে চাকরি করেন, তাদের ওপর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একাংশের মানসিক নির্যাতন ও আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা দিন দিন এক ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। সম্প্রতি এক নারী সরকারি/বেসরকারি চাকুরিজীবীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উঠে আসা অভিজ্ঞতা কর্মক্ষেত্রের এক অন্ধকার দিককে উন্মোচিত করেছে, যেখানে একজন নারী কর্মকর্তার অধীনেই আরেকজন নারী কর্মী চরম হেনস্তার শিকার হচ্ছেন।
অতিরিক্ত কাজের চাপ ও প্রতিনিয়ত দুর্ব্যবহার
ভুক্তভোগী ওই নারী কর্মী জানান, ছোট পদে চাকরি করার কারণে অফিসে তার কাজের চাপ প্রচণ্ড। নির্ধারিত অফিস সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও তাকে প্রতিনিয়ত কাজ করতে হয়। এত খাটুনির পরও সামান্য কোনো ত্রুটি বা যেকোনো বিষয় হলেই সমস্ত দোষ তার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া অফিস প্রধানের নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ইচ্ছামতো বকাঝকা এবং প্রতিনিয়ত মানসিক হেনস্তার কারণে ওই কর্মী বর্তমানে নিজেকে একজন ‘মানসিক রোগী’র মতো অনুভব করছেন এবং প্রায়ই অফিসে ও বাসায় কান্না করেন।
নারী বসের বৈষম্যমূলক আচরণ
আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত ধারণা আছে যে, নারী কর্মকর্তাদের অধীনে নারী কর্মীরা হয়তো বেশি নিরাপদ বা সহানুভূতি পান। কিন্তু বাস্তব চিত্র অনেক সময়ই ভিন্ন। ভুক্তভোগী কর্মী নিজেই একজন নারী এবং তার অফিস প্রধানও একজন নারী। তিনি জানান:
এর আগে এই পদে একজন পুরুষ কর্মী ছিলেন, যিনি বসের সব কথা শুনতেন না। তাকে বদলি করে দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান কর্মী বসের সব নির্দেশ মেনে চলেন বলেই তাকে আরও বেশি নরম মাটি হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে এবং সমস্ত ক্ষোভ তার ওপর ঝাড়া হয়।
ওই নারী কর্মকর্তা যে পূর্ববর্তী কর্মস্থলে ছিলেন, সেখানেও তার এমন খারাপ ব্যবহারের কারণে অধস্তনরা অতিষ্ঠ ছিলেন।
ছুটির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা ও বদলির জটিলতা
শারীরিক অসুস্থতা থাকলেও যেখানে এই অফিসে একদিনের বেশি ছুটি পাওয়া দুষ্কর, সেখানে মানসিক অসুস্থতার কারণে ছুটি পাওয়া কল্পনাতীত। ভুক্তভোগী কর্মী বদলি বা প্রতিকারের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হলেও কোনো ইতিবাচক সাড়া পাননি। উল্টো তাকে জানানো হয়েছে:
“তোমার পদে বদলি সম্ভব নয়, যদি বদলি হতেই হয় তবে তোমার পরিবর্তে অন্য লোক দিয়ে যাও।”
এমনকি জেলা বা ঢাকা পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করলেও লাভ হচ্ছে না, কারণ প্রশাসনিক চেইনে অনেক সময় স্থানীয় প্রভাবশালী কর্মকর্তাদেরই দাপট বেশি থাকে। আশেপাশের সহকর্মীরা এই অন্যায়ের সাক্ষী হলেও পদের সীমাবদ্ধতার কারণে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।
না জানিয়ে চাকরি ছেড়ে দিলে আইনি ও প্রশাসনিক পরিণতি
চরম মানসিক যন্ত্রণায় ভুগে ভুক্তভোগী কর্মী কোনো অব্যাহতিপত্র না দিয়ে বা কাউকে কিছু না জানিয়ে চাকরি থেকে অনুপস্থিত থাকার কথা ভাবছেন। তবে প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক ইস্তফা বা অব্যাহতিপত্র ছাড়া চাকরি ছেড়ে দিলে বড় ধরনের আইনি ও পেশাগত জটিলতা তৈরি হতে পারে:
বিভাগীয় মামলা ও বরখাস্ত: সরকারি বা আধা-সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে বিনা শান্তিতে টানা অনুপস্থিতিকে ‘পলাতক’ বা ‘কর্তব্যে অবহেলা’ হিসেবে গণ্য করে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হতে পারে এবং চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত (Dismissal) করা হতে পারে।
আর্থিক ক্ষতি ও পাওনা প্রাপ্তিতে বাধা: ভবিষ্যৎ তহবিল (PF), গ্র্যাচুইটি বা অর্জিত ছুটির টাকা আটকে যেতে পারে।
আইনি নোটিশ: বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে চুক্তিভঙ্গের দায়ে প্রতিষ্ঠান আইনি নোটিশ পাঠাতে পারে বা ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে।
সহকর্মীদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও বাস্তবতা
এই ঘটনাটি প্রকাশ পাওয়ার পর সহকর্মীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ তাকে বসের চোখে চোখ রেখে সরাসরি শান্তভাবে কথা বলার পরামর্শ দিয়েছেন, আবার কেউ কেউ পরিস্থিতি সহ্য করে আল্লাহর কাছে বিচার দেওয়ার কথা বলেছেন। অনেকে চরম উপহাস করে বলছেন, “ছোট পদে চাকরি করলে এমন কথা শোনাই স্বাভাবিক।” তবে অধিকাংশেরই পরামর্শ—যতই কঠিন হোক, কোনো আনুষ্ঠানিক নিয়ম না মেনে হুট করে চাকরি ছেড়ে দেওয়া কোনো বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও করণীয়
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্মক্ষেত্রের এই ধরনের আচরণকে ‘ওয়ার্কপ্লেস বুলিং’ (Workplace Bullying) বা কর্মক্ষেত্রে হেনস্তা বলা হয়। এটি একজন মানুষের আত্মবিশ্বাস পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বিশেষজ্ঞরা কিছু পরামর্শ দিয়েছেন:
১. প্রমাণ সংগ্রহ: বসের খারাপ ব্যবহার, অতিরিক্ত খাটিয়ে নেওয়ার বিষয়গুলোর অডিও রেকর্ড, মেসেজ বা ইমেলের মতো তথ্যপ্রমাণ সংরক্ষণ করা।
২. লিখিত মেডিকেল লিভ: একজন রেজিস্টার্ড মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ (Psychiatrist) দেখিয়ে তার প্রেসক্রিপশন ও সার্টিফিকেটসহ লিখিত ছুটির আবেদন করা।
৩. নিয়মতান্ত্রিক ইস্তফা: পরিস্থিতি যদি একেবারেই সহ্যসীমার বাইরে চলে যায়, তবে না জানিয়ে পালিয়ে না গিয়ে, নিয়ম অনুযায়ী এক মাস আগে বা চুক্তি অনুযায়ী লিখিত ইস্তফাপত্র জমা দিয়ে চাকরি ছাড়া উচিত।
নিজের মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে কোনো চাকরিই দীর্ঘমেয়াদে করা সম্ভব নয়। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আবেগের বশবর্তী না হয়ে আইনি ও প্রশাসনিক নিয়ম মেনে চলাই শ্রেয়।


