নবম জাতীয় পে-স্কেল: আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ে প্রজ্ঞাপন, তিন ধাপে বাড়বে মূল বেতন
সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল ২০২৬ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। প্রজ্ঞাপনের খসড়া রেজল্যুশন বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয় (বিজি প্রেস) হয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পৌঁছানোর পর বর্তমানে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং বা আইনি যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। ভেটিং ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর এসআরও নম্বর দিয়ে গেজেট প্রকাশের কথা রয়েছে। ফলে গেজেট প্রকাশের সুনির্দিষ্ট সময় এখনো নিশ্চিত না হলেও প্রক্রিয়াটি শেষ ধাপের দিকে এগিয়েছে।
নতুন পে-স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার, সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা
প্রস্তাবিত নবম জাতীয় পে-স্কেলে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে বেতন কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন কাঠামোয় প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা এবং ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।
অর্থাৎ সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন গ্রেড—দুই ক্ষেত্রেই মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি হওয়ায় নতুন কাঠামোয় সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি দেখা যাচ্ছে নিচের দিকের গ্রেডগুলোতে।
ছবিতে থাকা প্রস্তাবিত বেতন-চার্ট অনুযায়ী কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রেডের চিত্র হলো—
| গ্রেড | বর্তমান মূল বেতন | চূড়ান্ত নতুন মূল বেতন |
|---|---|---|
| ১ম | ৭৮,০০০ টাকা | ১,৫৬,০০০ টাকা |
| ২য় | ৬৬,০০০ টাকা | ১,৩২,০০০ টাকা |
| ৩য় | ৫৬,৫০০ টাকা | ১,১৩,০০০ টাকা |
| ৪র্থ | ৫০,০০০ টাকা | ১,০০,০০০ টাকা |
| ৫ম | ৪৩,০০০ টাকা | ৮৬,০০০ টাকা |
| ৬ষ্ঠ | ৩৫,৫০০ টাকা | ৭১,০০০ টাকা |
| ৭ম | ২৯,০০০ টাকা | ৫৮,০০০ টাকা |
| ৮ম | ২৩,০০০ টাকা | ৪৬,০০০ টাকা |
| ৯ম | ২২,০০০ টাকা | ৪৪,০০০ টাকা |
| ১০ম | ১৬,০০০ টাকা | ৩২,০০০ টাকা |
| ২০তম | ৮,২৫০ টাকা | ২০,০০০ টাকা |
প্রকাশিত তথ্যেও প্রথম গ্রেডে ১ লাখ ৫৬ হাজার এবং ২০তম গ্রেডে ২০ হাজার টাকা নির্ধারণের বিষয়টি উঠে এসেছে।
একবারে নয়, তিন ধাপে কার্যকর হবে নতুন বেসিক
নতুন পে-স্কেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—চূড়ান্ত বেতন একবারে কার্যকর হবে না। সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনার চাপ বিবেচনায় নিয়ে বর্ধিত মূল বেতন তিন ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
১ম থেকে ৯ম গ্রেডে বর্তমান বেতন ও চূড়ান্ত নতুন বেতনের মধ্যকার বর্ধিত অংশের—
- ৪০ শতাংশ প্রথম ধাপে,
- ৩০ শতাংশ দ্বিতীয় ধাপে এবং
- ৩০ শতাংশ তৃতীয় ধাপে
মূল বেতনের সঙ্গে যুক্ত হবে।
অন্যদিকে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডে বর্ধিত অংশের—
- ৫০ শতাংশ প্রথম ধাপে,
- ২৫ শতাংশ দ্বিতীয় ধাপে এবং
- ২৫ শতাংশ তৃতীয় ধাপে
কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
উদাহরণ: প্রথম গ্রেড
প্রথম গ্রেডে বর্তমান মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা। চূড়ান্ত নতুন বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ বর্ধিত অংশ ৭৮ হাজার টাকা।
তিন ধাপে এই বৃদ্ধি কার্যকর হলে—
প্রথম ধাপ: ১,০৯,২০০ টাকা
দ্বিতীয় ধাপ: ১,৩২,৬০০ টাকা
তৃতীয় ধাপ: ১,৫৬,০০০ টাকা
অর্থাৎ প্রথম ধাপেই পুরো ৭৮ হাজার টাকা যোগ হবে না; বর্ধিত অংশের ৪০ শতাংশ যুক্ত হবে।
উদাহরণ: ২০তম গ্রেড
২০তম গ্রেডে বর্তমান মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে চূড়ান্তভাবে ২০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।
তিন ধাপে মূল বেতন দাঁড়াবে—
প্রথম ধাপ: ১৪,১২৫ টাকা
দ্বিতীয় ধাপ: ১৭,০৬২.৫০ টাকা
তৃতীয় ধাপ: ২০,০০০ টাকা।
৯ম গ্রেডেও বড় পরিবর্তন
সরকারি চাকরিতে বহুল গুরুত্বপূর্ণ ৯ম গ্রেডের ক্ষেত্রেও বেতন দ্বিগুণ করার প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমান ২২ হাজার টাকা মূল বেতন থেকে চূড়ান্তভাবে ৪৪ হাজার টাকা হবে।
তিন ধাপে এই গ্রেডের মূল বেতন হওয়ার কথা—
প্রথম ধাপ: ৩০,৮০০ টাকা
দ্বিতীয় ধাপ: ৩৭,৪০০ টাকা
তৃতীয় ধাপ: ৪৪,০০০ টাকা।
এ কারণে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়িত হলে শুধু উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা নয়, মাঝারি ও নিম্ন গ্রেডের বিপুলসংখ্যক সরকারি কর্মচারীর মূল বেতনেও দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে।
বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতা আলাদা হিসাব
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মূল বেতন বৃদ্ধি আর সব ধরনের ভাতা বৃদ্ধি একই বিষয় নয়। নতুন বেসিক নির্ধারণের পাশাপাশি বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াতসহ বিভিন্ন ভাতা নিয়ে আলাদা কাঠামো রয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামোর মূল বেতন ধাপে ধাপে কার্যকর হলেও বিভিন্ন ভাতা নতুন হারে দেওয়ার পরিকল্পনা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।
ফলে কোনো কর্মচারীর নতুন পে-স্কেলে চূড়ান্ত বেসিক যত টাকা হবে, সেটিই তার তাৎক্ষণিক মোট মাসিক বেতন বা হাতে পাওয়া মোট অর্থ—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। বেসিক, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াতসহ অন্যান্য সুবিধা আলাদাভাবে হিসাব করতে হবে।
১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে
সরকার নবম জাতীয় পে-স্কেল অনুমোদন করেছে এবং এর কার্যকারিতা ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ধরা হয়েছে। তবে গেজেট প্রকাশের আগে বাস্তবায়নের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন।
এখানেই বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের সবচেয়ে বড় আগ্রহ—গেজেট ঠিক কবে প্রকাশ হবে?
সর্বশেষ পাওয়া তথ্যে নির্দিষ্ট কোনো তারিখ নিশ্চিত করা হয়নি। বরং আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষ হওয়ার পর এসআরও নম্বর সংযুক্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করার প্রস্তুতির কথাই বলা হচ্ছে। তাই গেজেট প্রকাশের নির্দিষ্ট দিন নিয়ে এখনই চূড়ান্ত দাবি করা সতর্কতার সঙ্গে এড়িয়ে চলাই যুক্তিযুক্ত।
প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ সুবিধার আওতায়
নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রভাব শুধু কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পেনশনভোগী মিলিয়ে প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ নতুন কাঠামোর সুবিধার আওতায় আসতে পারেন। এ কাঠামো বাস্তবায়নে বেতন, ভাতা ও পেনশন খাতে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা হতে পারে।
এ কারণেই পুরো বেতন কাঠামো একবারে কার্যকর না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকারের ওপর এককালীন বড় আর্থিক চাপ কিছুটা কমানো এবং রাজস্ব, বাজেট ও মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব সামলানোর সুযোগ তৈরি হবে।
এখন অপেক্ষা শুধু গেজেটের
সব মিলিয়ে নবম জাতীয় পে-স্কেলের ক্ষেত্রে এখন মূল নজর আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষ হওয়া এবং এরপর এসআরও নম্বরসহ গেজেট প্রকাশের দিকে। মন্ত্রিসভার অনুমোদন, রেজল্যুশন প্রস্তুত, বিজি প্রেস হয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে আসা—এসব ধাপ অতিক্রম করে প্রজ্ঞাপন এখন আইনগত যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে।
গেজেট প্রকাশ হলে তখনই নতুন বেতন কাঠামোর চূড়ান্ত ভাষা, বাস্তবায়নের তারিখ, ধাপভিত্তিক বেতন, ভাতা, পেনশন এবং অন্যান্য শর্ত সরকারি প্রজ্ঞাপনের ভিত্তিতে নিশ্চিতভাবে জানা যাবে। তাই বর্তমানে প্রচারিত বেতন-চার্টকে সম্ভাব্য/প্রস্তাবিত কাঠামো হিসেবে দেখা উচিত এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য গেজেটকেই মূল দলিল হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
সংক্ষেপে: নবম পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন এখন আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং পর্যায়ে; প্রথম গ্রেডের চূড়ান্ত মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা, ২০তম গ্রেডে ২০ হাজার টাকা, বর্ধিত বেসিক তিন ধাপে কার্যকর এবং বিভিন্ন ভাতা নতুন কাঠামোয় পরবর্তীতে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। এখন সরকারি চাকরিজীবীদের অপেক্ষা—আইনি যাচাই শেষ করে কবে গেজেট প্রকাশ করা হয়।




