পেনশন । লাম্পগ্র্যান্ট I পিআরএল

প্রতিবন্ধী সন্তান কি আজীবন পারিবারিক পেনশন পাবে? সরকারি আদেশে স্পষ্ট যা বলা আছে

সরকারি কর্মচারীর কোনো সন্তান যদি দৈহিক বা মানসিক অসামর্থ্যের কারণে স্থায়ীভাবে আংশিক বা সম্পূর্ণ কর্মক্ষমতাহীন হন এবং উপার্জনে অক্ষম থাকেন, তাহলে ওই সন্তান আজীবন পারিবারিক পেনশন পাওয়ার সুযোগ রাখেন। তবে এ সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া যায় না; নির্ধারিত কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়।

এ বিষয়ে সরকারি কর্মচারীদের জন্য জারি করা ‘সরকারি কর্মচারীগণের পেনশন সহজীকরণ আদেশ, ২০২০’-এ পৃথক বিধান রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সরকারি ওয়েবসাইটেও ২০২০ সালের এই পেনশন সহজীকরণ আদেশ প্রকাশিত হয়েছে।

প্রতিবন্ধী সন্তানের আজীবন পেনশনের বিধান

সরকারি আদেশের ‘প্রতিবন্ধী সন্তান’ সংক্রান্ত অংশে বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারীর সন্তান দৈহিক বা মানসিক অসামর্থ্যের কারণে স্থায়ীভাবে আংশিক বা সম্পূর্ণ কর্মক্ষমতাহীন এবং উপার্জনে অক্ষম হলে নির্ধারিত শর্তে তিনি আজীবন পারিবারিক পেনশন পেতে পারেন।

অর্থাৎ, সাধারণ সন্তানের মতো নির্দিষ্ট বয়সসীমা পর্যন্ত নয়—প্রতিবন্ধী সন্তান নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করলে তার জন্য আজীবন পারিবারিক পেনশনের বিধান রয়েছে।

সরকারের কেন্দ্রীয় হিসাব কর্তৃপক্ষের পেনশন-সংক্রান্ত তথ্যেও মূল পেনশনার, স্ত্রী এবং প্রতিবন্ধী সন্তানকে আজীবন পেনশন পাওয়ার যোগ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে প্রতিবন্ধী হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে পেনশন নয়

এখানেই বিষয়টির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। শুধু কোনো সন্তান প্রতিবন্ধী—এমন তথ্যের ভিত্তিতে আজীবন পারিবারিক পেনশন চালু হবে না। প্রতিবন্ধিতা, কর্মক্ষমতা এবং উপার্জনে অক্ষমতার বিষয়টি নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হতে হবে।

সরকারি আদেশ অনুযায়ী, প্রতিবন্ধী সন্তানকে সংশ্লিষ্ট সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধন ও প্রতিবন্ধী পরিচয়পত্রের আওতায় থাকতে হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সরকারি নির্ধারিত মেডিকেল বোর্ডের মাধ্যমে তার দৈহিক বা মানসিক অসামর্থ্যের কারণে স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারানো এবং উপার্জনে অক্ষমতার বিষয়টি নির্ধারণ করতে হবে। সরকারি নথিতে এ উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে স্থায়ী মেডিকেল বোর্ড গঠনের বিষয়টিও উল্লেখ রয়েছে।

চাকরিতে থাকা অবস্থাতেও বিষয়টি জানানো জরুরি

কোনো সরকারি কর্মচারীর প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে শুধু অবসরের সময় বিষয়টি জানালেই যথেষ্ট নয়। কর্মচারী চাকরিতে থাকা অবস্থায় কিংবা পেনশন ভোগরত অবস্থায় প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে, প্রয়োজনীয় দলিল-দস্তাবেজসহ বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে অবহিত করার বিধান রয়েছে।

এর ফলে পরবর্তীতে ওই সন্তান পারিবারিক পেনশনের যোগ্য কি না—তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নথি আগে থেকেই সংরক্ষিত থাকে।

কী কী শর্ত পূরণ করতে হবে?

সরকারি আদেশে উল্লেখিত বিধানগুলো বিশ্লেষণ করলে প্রতিবন্ধী সন্তানের আজীবন পারিবারিক পেনশনের ক্ষেত্রে প্রধান বিষয়গুলো হলো—

১. প্রতিবন্ধিতার সরকারি নিবন্ধন থাকতে হবে
সন্তানের প্রতিবন্ধিতা সমাজসেবা অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থায় নিবন্ধিত হতে হবে এবং প্রতিবন্ধী পরিচয়পত্র থাকতে হবে।

২. স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতাহীন ও উপার্জনে অক্ষম হতে হবে
শুধু প্রতিবন্ধিতা থাকলেই হবে না; দৈহিক বা মানসিক অসামর্থ্যের কারণে স্থায়ীভাবে আংশিক বা সম্পূর্ণ কর্মক্ষমতাহীন এবং উপার্জনে অক্ষম হওয়ার বিষয়টি নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রমাণিত হতে হবে।

৩. মেডিকেল বোর্ডের সনদ প্রয়োজন হতে পারে
এ ধরনের অক্ষমতা ও উপার্জনে অক্ষমতার বিষয়টি নির্ধারণে সরকার কর্তৃক গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সনদ গুরুত্বপূর্ণ।

৪. সরকারি চাকরিতে প্রতিবন্ধী কোটায় চাকরি করলে বিশেষ বিধান প্রযোজ্য
প্রতিবন্ধী সন্তান যদি প্রতিবন্ধী কোটায় সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত হন, তাহলে পিতা বা মাতার উত্তরাধিকারী হিসেবে আজীবন পারিবারিক পেনশনের সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে। এ বিষয়টি পেনশন-সংক্রান্ত সরকারি নির্দেশনায় স্পষ্ট করা হয়েছে।

সরকারি কর্মচারীর মৃত্যুর পর কীভাবে আবেদন করতে হবে?

কর্মচারী মারা যাওয়ার পর প্রতিবন্ধী সন্তান যদি আজীবন পারিবারিক পেনশনের যোগ্য হন, তাহলে তিনি নিজে অথবা তার পক্ষে পরিবারের কোনো সদস্য বা আত্মীয় সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে পারবেন।

আবেদনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হিসেবে সাধারণত প্রতিবন্ধিতার নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র, উত্তরাধিকার সনদ, পিতা বা মাতার পেনশন মঞ্জুরির আদেশ এবং পিপিও (PPO)-সহ প্রয়োজনীয় দলিল দিতে হবে।

অর্থাৎ, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করলে পেনশন কার্যকর হওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

একবার পারিবারিক পেনশন বন্ধ হলে কি আবার চালু করা যাবে?

এটিও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। সরকারি বিধান অনুযায়ী, পারিবারিক পেনশন ভোগকারী যোগ্য সদস্যের মৃত্যুর পর যদি একবার পারিবারিক পেনশন বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে পরবর্তীতে শুধু প্রতিবন্ধিতার দাবি দেখিয়ে সেই পারিবারিক পেনশন আবার চালু করার সুযোগ নেই।

তাই প্রতিবন্ধী সন্তানের পেনশন-সংক্রান্ত কাগজপত্র, নিবন্ধন, সনদ ও উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত নথি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ

প্রতিবন্ধী সন্তানের পেনশন প্রাপ্যতার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হিসেবে গণ্য হওয়ার বিধান রয়েছে। ফলে আবেদন করার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নথিপত্র, প্রতিবন্ধিতার প্রমাণ, মেডিকেল বোর্ডের সনদ এবং অন্যান্য শর্ত যাচাই করে সিদ্ধান্ত দেবে।

তাহলে সংক্ষেপে উত্তর কী?

হ্যাঁ—সরকারি কর্মচারীর প্রতিবন্ধী সন্তান নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলে পিতা বা মাতার মৃত্যুর পর আজীবন পারিবারিক পেনশন পাওয়ার বিধান রয়েছে। তবে এর জন্য প্রতিবন্ধিতা অবশ্যই সরকারি নিয়মে স্বীকৃত হতে হবে এবং স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা ও উপার্জনের অক্ষমতার বিষয়টি যথাযথভাবে প্রমাণ করতে হবে।

এটি কোনো নতুন বা মৌখিক সুবিধা নয়; ‘সরকারি কর্মচারীগণের পেনশন সহজীকরণ আদেশ, ২০২০’-এ এ বিষয়ে স্পষ্ট বিধান রাখা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সরকারি নথি এবং সরকারি পেনশন-সংক্রান্ত তথ্যেও প্রতিবন্ধী সন্তানকে আজীবন পেনশনের আওতায় থাকার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।

একটি তারিখগত বিষয়: বিভিন্ন অনলাইন পোস্টে ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০-এর কথা উল্লেখ থাকলেও সরকারি ওয়েবসাইটের একটি তালিকায় পেনশন সহজীকরণ আদেশ, ২০২০-এর ইস্যু তারিখ ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দেখানো হয়েছে; অর্থ মন্ত্রণালয়ের নোটিশ পেজে আবার নোটিশ প্রকাশের তারিখ ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দেখানো হয়েছে। তাই প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট তারিখ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মূল আদেশের কপি অনুসরণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ।

Source File

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *