নতুন পে স্কেলে বড় পরিবর্তন: ঊর্ধ্বতনদের ইনক্রিমেন্ট কমছে, কমছে বাড়িভাড়ার হার—তবে টাকার অঙ্কে বাড়বে সুবিধা
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল আলোচিত জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬-এ শুধু মূল বেতন বাড়ানোই নয়, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, মোবাইল, যাতায়াতসহ বিভিন্ন ভাতার কাঠামোতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বিশেষ করে নতুন ব্যবস্থায় সব গ্রেডে একই ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের পরিবর্তে উচ্চ গ্রেডে ধাপে ধাপে কম হারে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি নির্ধারণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর কারণে বাড়িভাড়া ভাতার শতাংশও কমানো হচ্ছে।
৩১ আগস্ট ২০২৬ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ এবং এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর নতুন বেতন নির্দেশাবলি অনুমোদনের খবর প্রকাশিত হয়েছে। অনুমোদিত কাঠামোয় বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণের তথ্য এসেছে।
তবে গেজেট প্রকাশের আগে কোনো কোনো হার বা বাস্তবায়ন-পদ্ধতিতে পরিবর্তন হতে পারে—তাই চূড়ান্ত কার্যকর বিধান জানতে সরকারি প্রজ্ঞাপনই চূড়ান্ত দলিল হিসেবে বিবেচিত হবে।
এক হারে ইনক্রিমেন্টের অবসান
২০১৫ সালের বেতন কাঠামোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল—গ্রেড নির্বিশেষে সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতনের ওপর ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট। নতুন কাঠামোয় এই অভিন্ন হার থাকছে না।
প্রস্তাবিত/অনুমোদিত কাঠামোসংক্রান্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী—
- ২০তম থেকে ৬ষ্ঠ গ্রেড: ৫ শতাংশ
- ৫ম গ্রেড: ৪ শতাংশ
- ৪র্থ ও ৩য় গ্রেড: ৩.৫ শতাংশ
- ২য় গ্রেড: ২.৭৫ শতাংশ
অর্থাৎ নতুন ব্যবস্থায় বেতন যত ওপরে উঠবে, বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের শতাংশ তত কমবে।
এর ফলে একজন নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীর মূল বেতন তুলনামূলকভাবে কম হলেও তিনি শতাংশের হিসাবে বেশি হারে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি পাবেন। অন্যদিকে উচ্চ গ্রেডের কর্মকর্তা বড় মূল বেতনের ওপর অপেক্ষাকৃত কম শতাংশে ইনক্রিমেন্ট পাবেন।
সশস্ত্র বাহিনীতেও একই ধরনের কাঠামো
সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষেত্রেও একই ধরনের গ্রেডভিত্তিক ইনক্রিমেন্ট কাঠামোর কথা বলা হয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ক্যাপ্টেন ও সমতুল্য এবং তার নিচের পদে ৫ শতাংশ, মেজর পদে ৪ শতাংশ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল ও কর্নেল পর্যায়ে ৩.৫ শতাংশ এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সমমানের পদে ২.৭৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট নির্ধারণের কথা রয়েছে।
এটি মূলত উচ্চ বেতনধারীদের বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির শতাংশ কমিয়ে গ্রেডভিত্তিক ইনক্রিমেন্টের একটি স্তরভিত্তিক কাঠামো তৈরির উদ্যোগ।
বাড়িভাড়ার শতাংশ কমছে, কিন্তু টাকার অঙ্কে বাড়তে পারে
নতুন বেতন কাঠামোর সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তনগুলোর একটি হলো বাড়িভাড়া ভাতার হার পুনর্বিন্যাস।
২০১৫ সালের কাঠামোয় ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় গ্রেডভেদে মূল বেতনের ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়া দেওয়া হতো। নতুন কাঠামোয় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী তা ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যায়ে নামিয়ে আনার প্রস্তাব রয়েছে।
অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও সাভার এলাকায় বর্তমান ৪০–৫৫ শতাংশের পরিবর্তে ৩০–৫০ শতাংশ এবং অন্যান্য এলাকায় বর্তমান ৩৫–৫০ শতাংশের পরিবর্তে ২৫–৪৫ শতাংশ করার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে।
শতাংশ কমলেও বাড়িভাড়া ভাতার প্রকৃত টাকার পরিমাণ কমবে—এমনটি সরাসরি বলা যায় না। কারণ বাড়িভাড়া হিসাব করা হয় মূল বেতনের ওপর। নতুন স্কেলে মূল বেতন অনেক বেশি হওয়ায় কম শতাংশ প্রয়োগ করেও আগের তুলনায় বেশি টাকা পাওয়া সম্ভব।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো কর্মচারীর মূল বেতন যদি ১০ হাজার টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা হয়, তাহলে ৬০ শতাংশের পরিবর্তে ৫০ শতাংশ বাড়িভাড়া হলেও ভাতার পরিমাণ ৬ হাজার থেকে বেড়ে ১০ হাজার টাকা হবে। অর্থাৎ হার কমেছে, কিন্তু ভিত্তি—মূল বেতন—বেশি হওয়ায় টাকার অঙ্ক বেড়েছে।
উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময় কমছে
নতুন কাঠামোয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে।
বর্তমানে একই গ্রেডে ১০ বছর চাকরি করার পর উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় সেটি কমিয়ে ৮ বছর করার প্রস্তাব রয়েছে।
অন্যদিকে পদোন্নতি ছাড়া দ্বিতীয়বার উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রে ৬ বছর একই গ্রেডে থাকার শর্ত বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে।
পদোন্নতিযোগ্য পদে কর্মরত কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী পদোন্নতি না পেলে চাকরিজীবনে এভাবে সর্বোচ্চ দুইবার উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ পাবেন। আর যেসব পদে পদোন্নতির সুযোগ নেই এবং ব্লকড পদ হিসেবে বিবেচিত, সেসব ক্ষেত্রে চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ তিনবার উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ব্যবস্থা রাখার তথ্য রয়েছে।
এখানে প্রথম উচ্চতর গ্রেড ৮ বছর পর, দ্বিতীয়টি পরবর্তী ৬ বছর পর এবং তৃতীয়টি তার পরবর্তী ৮ বছর পর পাওয়ার কাঠামোর কথা বলা হয়েছে।
চিকিৎসা ভাতায় বড় পরিবর্তন
বর্তমানে সরকারি কর্মচারীদের মাসিক চিকিৎসা ভাতা ১ হাজার ৫০০ টাকা। নতুন কাঠামোয় বয়সভেদে চিকিৎসা ভাতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী—
| শ্রেণি | প্রস্তাবিত চিকিৎসা ভাতা |
|---|---|
| ৫০ বছর পর্যন্ত চাকরিজীবী | ৩,০০০ টাকা |
| ৫০ বছরের বেশি–৬০ বছর | ৪,০০০ টাকা |
| ৬০–৭০ বছর বয়সী পেনশনার | ৫,০০০ টাকা |
| ৭০ বছরের বেশি বয়সী পেনশনার | ৬,০০০ টাকা |
অর্থাৎ চিকিৎসা ভাতা শুধু বাড়ানোই নয়, বয়সভিত্তিক কাঠামোও তৈরি করা হচ্ছে।
প্রথমবার সব গ্রেডে মোবাইল ভাতা
নতুন বেতন কাঠামোয় আরেকটি নতুন সুবিধা হলো সব স্তরের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য মোবাইল ফোন ভাতা।
বর্তমানে ১ম–৩য় গ্রেডে ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং ৪র্থ–৫ম গ্রেডে ১ হাজার টাকা মোবাইল বিলের সুবিধা রয়েছে। নতুন কাঠামোয় ১ম–৫ম গ্রেডের জন্য ৫০০ টাকা এবং ৬ষ্ঠ–২০তম গ্রেডের জন্য ১৫০ টাকা করে মাসিক মোবাইল ভাতার প্রস্তাব রয়েছে।
অর্থাৎ উচ্চ গ্রেডের বিদ্যমান মোবাইল সুবিধা কমলেও নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীরা প্রথমবারের মতো এই সুবিধার আওতায় আসবেন।
যাতায়াত, টিফিন ও ধোলাই ভাতা বাড়ছে
নতুন কাঠামোয় ছোট ছোট কয়েকটি ভাতাতেও বড় পরিবর্তন আসছে।
- যাতায়াত ভাতা: ৩০০ → ৬০০ টাকা
- টিফিন ভাতা: ২০০ → ৫০০ টাকা
- ধোলাই ভাতা: ১০০ → ৩০০ টাকা
অর্থাৎ দৈনন্দিন ব্যয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত এসব ভাতায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি রাখা হচ্ছে।
অন্যদিকে বাংলা নববর্ষ ভাতা বিদ্যমান মূল বেতনের ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে।
পাহাড়ি ভাতা এবং হাওর, দ্বীপ ও চর ভাতার ক্ষেত্রে মূল বেতনের ২০ শতাংশ হার বহাল রাখার কথা বলা হলেও সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।
২০২৪ সালের বিশেষ প্রণোদনা থাকবে না
নতুন পে স্কেল কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ২০২৪ সালে চালু হওয়া বিশেষ প্রণোদনা বাতিল হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এই প্রণোদনা প্রথমে মূল বেতনের ৫ শতাংশ হিসেবে চালু হলেও পরে তা ১০ শতাংশ করা হয়েছিল। ফলে নতুন বেতন কাঠামোয় মূল বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি আলাদা এই প্রণোদনা না রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়।
এ কারণে একজন চাকরিজীবীর প্রকৃত বেতন বৃদ্ধি হিসাব করতে শুধু নতুন মূল বেতন নয়, বর্তমান মূল বেতন + বিশেষ প্রণোদনা + বাড়িভাড়া + অন্যান্য ভাতা—সবগুলো একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
ঝুঁকি ও বিশেষ ভাতায় বাড়তি সুবিধা
নতুন কাঠামোয় ঝুঁকি ভাতাসহ বিভিন্ন বিশেষ ভাতা বিদ্যমান অর্থের ওপর প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর তথ্য এসেছে।
প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে প্রেষণ ভাতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের কথা রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন বিশেষ দায়িত্ব, ঝুঁকি ও দক্ষতাভিত্তিক ভাতায় পুনর্বিন্যাস আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে এসব ভাতার সুনির্দিষ্ট অঙ্ক ও যোগ্যতার শর্ত গেজেট প্রকাশের পরই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্যভাবে জানা যাবে।
সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কাঠামোয়ও বড় সমন্বয়
জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর জন্যও নতুন নির্দেশাবলি অনুমোদন করা হয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন পদকে জাতীয় বেতন স্কেলের গ্রেডের সঙ্গে সামঞ্জস্য করা হচ্ছে। এনসি (ই) ও সমতুল্য পদে প্রারম্ভিক মূল বেতন ২১ হাজার টাকা এবং মেজর জেনারেল ও সমমানের পদে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকার সমতুল্য নির্ধারিত বেতনের কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া ফ্লাইং পে, কমান্ড, স্টাফ, টিচিং, কোয়ালিফিকেশন, ডিস্টার্বেন্স ও বিশেষজ্ঞ ভাতাসহ বিভিন্ন সামরিক ভাতায় পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে।
সশস্ত্র বাহিনীর জন্য বিদ্যমান বহু ধরনের ভাতা পর্যালোচনা করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ, ১৫ শতাংশ কিংবা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে আরও বেশি বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাস্তবায়ন হবে ধাপে ধাপে
নতুন বেতন কাঠামো একবারে পুরোপুরি কার্যকর না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তের কথা সরকার জানিয়েছে। ৩১ আগস্টের মন্ত্রিসভা বৈঠকের পর প্রকাশিত প্রতিবেদনে মূল বেতন তিন ধাপে কার্যকর এবং সব ধরনের ভাতা পরবর্তী পর্যায়ে কার্যকর করার কথা এসেছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মূল বেতন ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। বাড়িভাড়াসহ সংশ্লিষ্ট অনেক ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
এর অর্থ হলো—নতুন পে স্কেল অনুমোদন পেলেই একজন চাকরিজীবী একই সঙ্গে নতুন মূল বেতন, নতুন বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, মোবাইল ও অন্যান্য সব ভাতা পাবেন না। কোন সুবিধা কখন কার্যকর হবে, সেটিই বাস্তব বেতন বৃদ্ধির হিসাব নির্ধারণ করবে।
সরকারের অতিরিক্ত ব্যয়ও বাড়বে
নতুন বেতন কাঠামোর সবচেয়ে বড় আর্থিক প্রভাব পড়বে সরকারের বাজেটে।
প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ফলে তিন বছরে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় ১ লাখ ৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এর মধ্যে চলতি বছরে অতিরিক্ত ব্যয় ৩৭ হাজার ৩৭২ কোটি, ২০২৭ সালে ৪৪ হাজার ৮৩৮ কোটি এবং ২০২৮ সালে ২৩ হাজার ১৭০ কোটি টাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সব ধরনের সুবিধা পুরোপুরি কার্যকর হলে বেতন, ভাতা, পেনশন, আনুতোষিক ও লাম্পগ্রান্ট বাবদ সরকারের মোট ব্যয় ২ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছানোর হিসাবও দেওয়া হয়েছে।
এখানে মূল বিষয় হলো, নতুন স্কেলের আর্থিক প্রভাব শুধু বর্তমান কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনে সীমাবদ্ধ নয়। পেনশন, আনুতোষিক, লাম্পগ্রান্টসহ সংশ্লিষ্ট ব্যয়ও বাড়বে।
সার্বিকভাবে কী বদলাচ্ছে?
নতুন বেতন কাঠামোর প্রস্তাবিত চিত্রকে কয়েকটি বড় পরিবর্তনে ভাগ করা যায়—
প্রথমত, নিম্ন গ্রেডে মূল বেতন তুলনামূলক বেশি হারে বাড়ানো হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, উচ্চ গ্রেডে বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার কমানো হচ্ছে।
তৃতীয়ত, বাড়িভাড়া ভাতার শতাংশ কমানো হলেও মূল বেতন বৃদ্ধির কারণে টাকার অঙ্কে বাড়িভাড়া ভাতা বাড়তে পারে।
চতুর্থত, চিকিৎসা, যাতায়াত, টিফিন ও ধোলাই ভাতায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি রাখা হচ্ছে।
পঞ্চমত, প্রথমবারের মতো ৬ষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডসহ সব স্তরের কর্মচারীদের মোবাইল ভাতার আওতায় আনা হচ্ছে।
ষষ্ঠত, বিশেষ প্রণোদনা বাতিল করে নতুন বেতন কাঠামোর মূল বেতন ও অন্যান্য ভাতার মাধ্যমে সুবিধা পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে।
সপ্তমত, একই গ্রেডে দীর্ঘদিন আটকে থাকা কর্মচারীদের জন্য উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময় ১০ বছর থেকে ৮ বছরে নামানোর প্রস্তাব গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—শতাংশ নয়, মোট প্রাপ্তি
নতুন পে স্কেল নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে মূল বেতন ও বাড়িভাড়ার শতাংশ। কিন্তু একজন চাকরিজীবীর প্রকৃত আর্থিক সুবিধা নির্ধারণ করতে শুধু কোনো একটি ভাতার হার দেখা যথেষ্ট নয়।
কারণ মূল বেতন, ইনক্রিমেন্ট, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, মোবাইল, যাতায়াত, টিফিন, ঝুঁকি ও অন্যান্য ভাতা—সব মিলিয়েই মোট মাসিক প্রাপ্তি তৈরি হবে।
তাই বাড়িভাড়ার হার ৬৫ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশে বা ৫০ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশে নামলে সেটিকে সরাসরি ‘ভাতা কমে গেছে’ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। একইভাবে উচ্চ গ্রেডে ইনক্রিমেন্টের হার কমলেও বড় মূল বেতনের ওপর কম শতাংশ প্রয়োগ হচ্ছে—ফলে প্রকৃত টাকার বৃদ্ধি আলাদাভাবে হিসাব করতে হবে।
সারকথা, জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ শুধু বেতন বাড়ানোর একটি সিদ্ধান্ত নয়; এটি সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন, ইনক্রিমেন্ট ও ভাতার কাঠামোকে নতুনভাবে সাজানোর একটি বড় পুনর্বিন্যাস। তবে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে কিছু হার ও বাস্তবায়নের সময়সূচিতে পার্থক্য রয়েছে। ফলে চূড়ান্ত হিসাবের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের সরকারি গেজেট/প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত হার ও কার্যকর তারিখই চূড়ান্ত ভিত্তি হিসেবে ধরা উচিত।


