সর্বজনীন পেনশন স্কিম ২০২৬

সর্বজনীন পেনশনে বড় পরিবর্তন: নমিনির সুবিধা ৮০ বছর, সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাও আসছেন

সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিকে আরও আকর্ষণীয় ও অংশগ্রহণবান্ধব করতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর তাঁর স্বামী বা স্ত্রীকে দেওয়া পেনশন সুবিধার বয়সসীমা ৭৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৮০ বছর করার সিদ্ধান্ত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

একই সঙ্গে সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এমন ব্যক্তিদের সর্বজনীন পেনশনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যারা প্রচলিত সরকারি পেনশন ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত নন। এসব কর্মীকে সর্বজনীন পেনশনের ‘প্রগতি’ স্কিমে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এ ছাড়া সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে শরিয়াহভিত্তিক বা ইসলামিক পেনশন ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাবও অনুমোদন করেছে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদ। ফলে কর্মসূচিটির আওতা ও বিনিয়োগ কাঠামোতে নতুন মাত্রা যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

নমিনির পেনশন সুবিধা ৮০ বছর পর্যন্ত

বর্তমান ব্যবস্থায় কোনো পেনশনভোগী মারা গেলে তাঁর স্বামী বা স্ত্রী—যাকে নমিনি হিসেবে বিবেচনা করা হয়—৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত পেনশন সুবিধা পেয়ে থাকেন।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নমিনির এই সুবিধা আজীবন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আপাতত সুবিধার বয়সসীমা বাড়িয়ে ৮০ বছর করা হয়েছে।

অর্থাৎ, পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর যোগ্য স্বামী বা স্ত্রী আগের তুলনায় আরও পাঁচ বছর বেশি সময় পেনশন সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। এতে কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা কিছুটা বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাও ‘প্রগতি’ স্কিমে

সর্বজনীন পেনশনের আওতা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের একটি অংশকে ‘প্রগতি’ স্কিমে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিশেষ করে যেসব রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা সরকারের সরাসরি প্রচলিত পেনশন ব্যবস্থার আওতায় নেই, তারা এই উদ্যোগের আওতায় আসবেন।

বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের অবসরকালীন সুবিধা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের চাকরিবিধি ও নিজস্ব ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। সরকারি সিভিল কর্মচারীদের মতো তারা রাষ্ট্রীয় পেনশন ও আনুতোষিক সুবিধা পান না।

তাই এই শ্রেণির কর্মীদের জন্য সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচির ‘প্রগতি’ স্কিম একটি অতিরিক্ত অবসরকালীন সুরক্ষা কাঠামো তৈরি করতে পারে।

তবে কোন কোন সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা এই সুবিধার আওতায় আসবেন এবং কীভাবে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তালিকা ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত কাঠামো নির্ধারণ করবে।

চালু হতে পারে শরিয়াহভিত্তিক পেনশন

সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব হলো শরিয়াহভিত্তিক বা ইসলামিক পেনশন ব্যবস্থা চালু করা

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদ এ সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। এর ফলে শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ ও পরিচালন কাঠামোর মাধ্যমে পেনশন সঞ্চয়ের সুযোগ তৈরির পথ খুলতে পারে।

ইসলামিক পেনশন চালু হলে প্রচলিত সুদভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে শরিয়াহ নীতিমালা অনুসরণ করে অবসরকালীন সঞ্চয়ে আগ্রহী ব্যক্তিদের জন্য একটি পৃথক বিকল্প তৈরি হবে।

তবে এই ব্যবস্থা কীভাবে পরিচালিত হবে, তহবিল কোথায় বিনিয়োগ করা হবে এবং মুনাফা কীভাবে নির্ধারিত হবে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত নীতিমালা ও বাস্তবায়ন কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

পেনশন তহবিলে মুনাফা বেড়েছে

সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচির তহবিলের বিনিয়োগ ও আয়-ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনা করে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মুনাফার হার নির্ধারণের প্রস্তাবও অনুমোদন করেছে পরিচালনা পর্ষদ

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ড. সুরাতুজ্জামানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য সর্বজনীন পেনশন তহবিলে ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।

এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সর্বোচ্চ মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৬১ শতাংশ

অর্থাৎ আগের অর্থবছরের সর্বোচ্চ হারের তুলনায় নতুন প্রস্তাবিত সর্বোচ্চ মুনাফার হার ০.১১ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি

কেন পরিবর্তনগুলো গুরুত্বপূর্ণ

সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য হলো কর্মজীবী মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অবসরকালীন আর্থিক নিরাপত্তা তৈরি করা। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের আগ্রহ বাড়ানো এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী সুবিধা সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ।

নমিনির সুবিধা ৭৫ বছর থেকে ৮০ বছর করা হলে পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর তাঁর স্বামী বা স্ত্রীর জন্য দীর্ঘ সময় আর্থিক সহায়তা অব্যাহত থাকবে।

অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কিন্তু প্রচলিত সরকারি পেনশনের বাইরে থাকা প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ‘প্রগতি’ স্কিমে আনার উদ্যোগ সর্বজনীন পেনশনের আওতা বাড়াতে পারে।

আর শরিয়াহভিত্তিক পেনশন চালুর উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ইসলামিক আর্থিক নীতিমালা অনুসরণ করতে আগ্রহী মানুষের জন্য নতুন একটি বিকল্প তৈরি হবে।

এর সঙ্গে তহবিলের মুনাফার হার ১১.৬৮–১১.৭২ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব অনুমোদনের বিষয়টিও অংশগ্রহণকারীদের জন্য আর্থিক রিটার্নের দিকটি সামনে আনছে।

সামনে যেসব বিষয় স্পষ্ট হওয়া বাকি

তবে সিদ্ধান্তগুলো ঘোষণার পরই এর সবকিছু তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হচ্ছে—এমনটি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ‘প্রগতি’ স্কিমে অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে যোগ্য প্রতিষ্ঠান, কর্মীর শ্রেণি, চাঁদার কাঠামো, প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ এবং বাস্তবায়ন পদ্ধতি নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

একইভাবে শরিয়াহভিত্তিক পেনশনের ক্ষেত্রে আলাদা পরিচালন ও বিনিয়োগ কাঠামো, শরিয়াহ নীতিমালা এবং মুনাফা বণ্টনের পদ্ধতি নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ হবে।

সব মিলিয়ে, নমিনির সুবিধার বয়সসীমা বৃদ্ধি, সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের নতুন কর্মীশ্রেণিকে অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ, ইসলামিক পেনশন চালুর প্রস্তাব এবং মুনাফার হার নির্ধারণ—এই চারটি সিদ্ধান্ত সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচির কাঠামোকে আরও বিস্তৃত করার একটি নতুন ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে চূড়ান্ত বিধিমালা, যোগ্যতার শর্ত ও বাস্তবায়ন পদ্ধতির ওপর।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *