মৃত্যুজনিত পেনশন ২০২৬: ১০ বছর চাকরি করে কেউ মারা গেলে কত হারে পেনশন পাবেন পরিবার?
সরকারি চাকরিতে কর্মরত অবস্থায় কোনো কর্মচারীর মৃত্যু হলে তাঁর পরিবার কী পরিমাণ পারিবারিক পেনশন পাবেন—এটি নিয়ে অনেকের মধ্যেই প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে ৫, ১০, ১৫ বা ২০ বছর চাকরি করার পর মৃত্যু হলে পেনশনের হার কী হবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা ধরনের বিভ্রান্তি। ২০২৬ সালের নতুন সরকারি প্রজ্ঞাপনে পেনশনযোগ্য চাকরিকাল ও গ্রস পেনশনের হার আগের কাঠামোতেই রাখা হয়েছে। ফলে ১০ বছর পেনশনযোগ্য চাকরিকাল পূর্ণ করে কেউ মারা গেলে সর্বশেষ আহরিত মূল বেতনের ৩৬ শতাংশ হারে গ্রস পেনশন নির্ধারণের ভিত্তি তৈরি হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের ২০২৬ সালের নতুন আদেশ অনুযায়ী, পেনশনযোগ্য চাকরিকাল ৫ বছর থেকে শুরু করে ২৫ বছর বা তার বেশি পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। চাকরিকাল যত বাড়বে, গ্রস পেনশনের হারও ধাপে ধাপে বাড়বে। ১০ বছর চাকরির ক্ষেত্রে এই হার ৩৬ শতাংশ।
১০ বছর চাকরি করে মারা গেলে পেনশনের হার কত?
কোনো সরকারি কর্মচারী ১০ বছর পেনশনযোগ্য চাকরিকাল পূর্ণ করার পর চাকরিরত অবস্থায় মারা গেলে, তাঁর সর্বশেষ আহরিত মূল বেতনের ভিত্তিতে পেনশনের হিসাব নির্ধারণ করা হবে।
১০ বছর চাকরির জন্য নির্ধারিত গ্রস পেনশনের হার:
সর্বশেষ আহরিত মূল বেতন × ৩৬% = গ্রস পেনশন
অর্থাৎ, মৃত্যুর সময় সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর সর্বশেষ মূল বেতন যদি ৩০,০০০ টাকা হয়, তাহলে—
৩০,০০০ × ৩৬% = ১০,৮০০ টাকা
এখানে ১০,৮০০ টাকা হলো হিসাবের ভিত্তিতে নির্ধারিত গ্রস পেনশন। তবে চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যু হলে পরিবার যে সুবিধা পাবে, সেটি পারিবারিক পেনশনের বিধান অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। তাই গ্রস পেনশনের ৩৬ শতাংশকে সরাসরি পরিবারের হাতে পাওয়া মাসিক অর্থ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
৫ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত পেনশনের হার
২০২৬ সালের প্রজ্ঞাপনে পেনশনযোগ্য চাকরিকালের সঙ্গে গ্রস পেনশনের হার নিম্নরূপ রাখা হয়েছে:
| পেনশনযোগ্য চাকরিকাল | সর্বশেষ মূল বেতনের হারে গ্রস পেনশন |
|---|---|
| ৫ বছর | ২১% |
| ৬ বছর | ২৪% |
| ৭ বছর | ২৭% |
| ৮ বছর | ৩০% |
| ৯ বছর | ৩৩% |
| ১০ বছর | ৩৬% |
| ১১ বছর | ৩৯% |
| ১২ বছর | ৪৩% |
| ১৩ বছর | ৪৮% |
| ১৪ বছর | ৫১% |
| ১৫ বছর | ৫৪% |
| ১৬ বছর | ৫৭% |
| ১৭ বছর | ৬৩% |
| ১৮ বছর | ৬৫% |
| ১৯ বছর | ৬৯% |
| ২০ বছর | ৭২% |
| ২১ বছর | ৭৫% |
| ২২ বছর | ৭৯% |
| ২৩ বছর | ৮৩% |
| ২৪ বছর | ৮৭% |
| ২৫ বছর বা তার বেশি | ৯০% |
অর্থাৎ ১০ বছর চাকরিতে ৩৬ শতাংশ, ১৫ বছরে ৫৪ শতাংশ, ২০ বছরে ৭২ শতাংশ এবং ২৫ বছর বা তার বেশি চাকরিকালে সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ হারে গ্রস পেনশন নির্ধারণের বিধান রয়েছে।
তাহলে ১০ বছর চাকরির পর মৃত্যুর ক্ষেত্রে পরিবার কী পাবে?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অবসর গ্রহণকারী কর্মচারীর নিজস্ব পেনশন এবং চাকরিরত অবস্থায় মারা যাওয়া কর্মচারীর পরিবারের পারিবারিক পেনশন এক বিষয় নয়।
সরকারি কর্মচারী চাকরিরত অবস্থায় মারা গেলে তাঁর পরিবার প্রচলিত পারিবারিক পেনশন বিধি অনুযায়ী সুবিধা পায়। সরকারি পেনশন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, পেনশন মঞ্জুরির আগেই কোনো সরকারি কর্মচারীর মৃত্যু হলে তাঁর পরিবারের জন্য পৃথক পারিবারিক পেনশন আবেদনের ব্যবস্থা রয়েছে।
অর্থাৎ, ১০ বছর চাকরি করেছেন বলে পরিবারকে সরাসরি ৩৬ শতাংশের সমপরিমাণ টাকা মাসে দেওয়া হবে—এমনভাবে বিষয়টি দেখা যাবে না। ৩৬ শতাংশ হলো পেনশন নির্ধারণের গ্রস হার; এরপর পারিবারিক পেনশনের বিধান অনুযায়ী প্রাপ্যতা নির্ধারণ করতে হবে।
১০ বছর চাকরিতে আনুতোষিক কত?
২০২৬ সালের নতুন আদেশে আনুতোষিকের হারও নির্ধারিত রয়েছে।
১০ বছর বা তদূর্ধ্ব কিন্তু ১৫ বছরের কম পেনশনযোগ্য চাকরিকালের ক্ষেত্রে প্রতি ১ টাকা পেনশনের বিপরীতে ২৬০ টাকা হারে আনুতোষিক নির্ধারিত হয়েছে।
অন্যদিকে—
- ৫ বছর বা তদূর্ধ্ব কিন্তু ১০ বছরের কম: প্রতি টাকায় ২৬৫ টাকা
- ১০ বছর বা তদূর্ধ্ব কিন্তু ১৫ বছরের কম: প্রতি টাকায় ২৬০ টাকা
- ১৫ বছর বা তদূর্ধ্ব কিন্তু ২০ বছরের কম: প্রতি টাকায় ২৪৫ টাকা
- ২০ বছর বা তদূর্ধ্ব: প্রতি টাকায় ২৩০ টাকা
২০২৬ সালের প্রজ্ঞাপনে এসব আনুতোষিকের হার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
একটি উদাহরণে পুরো বিষয়টি বোঝা যাক
ধরা যাক, একজন সরকারি কর্মচারী ১০ বছর চাকরি করার পর চাকরিরত অবস্থায় মারা গেলেন।
মৃত্যুর সময় তাঁর সর্বশেষ মূল বেতন ছিল ৩০,০০০ টাকা।
তাহলে ১০ বছরের জন্য গ্রস পেনশনের হার ৩৬ শতাংশ হওয়ায়:
৩০,০০০ × ৩৬% = ১০,৮০০ টাকা
এই ১০,৮০০ টাকা হবে পেনশন নির্ধারণের গ্রস ভিত্তি।
এরপর সংশ্লিষ্ট পারিবারিক পেনশন বিধি অনুযায়ী তাঁর স্ত্রী/স্বামী ও অন্যান্য যোগ্য উত্তরাধিকারীর প্রাপ্যতা নির্ধারণ করা হবে। ফলে পরিবারের হাতে বাস্তবে কত টাকা মাসিক যাবে, সেটি নির্ভর করবে প্রযোজ্য পারিবারিক পেনশন বিধান, উত্তরাধিকারীর অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট পেনশন অনুমোদনের হিসাবের ওপর।
৫ বছরের কম চাকরি হলে কী হবে?
এখানেও ২০২৬ সালের আদেশে গুরুত্বপূর্ণ বিধান রয়েছে।
কোনো সরকারি কর্মচারী চাকরির ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে মারা গেলে সাধারণ পেনশনযোগ্য চাকরিকালের আওতায় তাঁর নিয়মিত পেনশন নির্ধারণের পরিবর্তে বিশেষ আর্থিক সহায়তার বিধান প্রযোজ্য হতে পারে।
সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, চাকরির মেয়াদ ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে মৃত্যু বা স্বাস্থ্যগত কারণে অক্ষমতার ক্ষেত্রে চাকরির প্রতি বছর বা তার অংশবিশেষের জন্য শেষ আহরিত তিনটি মূল বেতনের সমপরিমাণ হারে এককালীন বিশেষ আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিধান রয়েছে।
অন্যদিকে, সরকারি পেনশন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ন্যূনতম পেনশনযোগ্য চাকরিকাল ৫ বছর।
১০ বছরের কম চাকরি হলেও মৃত্যুর ক্ষেত্রে পরিবার পেনশন পেতে পারে
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
সরকারি কর্মচারী চাকরিরত অবস্থায় মারা গেলে, শুধু চাকরির মেয়াদ ১০ বছরের কম—এই কারণে পরিবার পারিবারিক পেনশন থেকে বঞ্চিত হবে, এমন নয়। সরকারি পেনশন-সংক্রান্ত FAQ-তেও বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ কোনো কর্মচারী চাকরিরত অবস্থায় মারা গেলে তাঁর চাকরির মেয়াদ ১০ বছরের কম হলেও পরিবার পারিবারিক পেনশন পেতে পারে।
তাই ১০ বছরের নিয়মটি মূলত পেনশনযোগ্য চাকরিকালের ভিত্তিতে গ্রস পেনশন নির্ধারণের হারের সঙ্গে সম্পর্কিত। চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যুর ক্ষেত্রে পরিবারের পারিবারিক পেনশন প্রাপ্যতা আলাদা বিধি অনুযায়ী বিবেচনা করতে হবে।
বিধবা স্ত্রী বা বিপত্নীক স্বামীর আজীবন পারিবারিক পেনশন
২০২৬ সালের নতুন আদেশে মৃত সরকারি কর্মচারীর বিধবা স্ত্রী বা বিপত্নীক স্বামীর পারিবারিক পেনশনের বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিধান রাখা হয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পুনর্বিবাহ না করার শর্তে বিধবা স্ত্রী বা বিপত্নীক স্বামী আজীবন পারিবারিক পেনশন পাবেন। সাধারণ ক্ষেত্রে পুনর্বিবাহ না করার বিষয়ে বছরে একবার অঙ্গীকারনামা বা প্রত্যয়নপত্র সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয়ে দেওয়ার বিধান রয়েছে। ৫০ বছরের বেশি বয়সী বিধবার ক্ষেত্রে এই অঙ্গীকারনামা দেওয়ার শর্ত প্রযোজ্য নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৬ সালের নতুন পেনশন কাঠামোর কার্যকর তারিখ
অর্থ বিভাগের নতুন আদেশটি ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে। এতে পেনশনযোগ্য চাকরিকাল, গ্রস পেনশনের হার, আনুতোষিক, নিট পেনশন এবং অন্যান্য অবসরকালীন সুবিধা পুনর্নির্ধারণের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এখানে আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—২০২৬ সালের নতুন নিট পেনশন বৃদ্ধির যে হারগুলো ঘোষণা করা হয়েছে, সেগুলো মূলত বিদ্যমান পেনশনভোগীদের ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে পাওয়া নিট পেনশনের ভিত্তিতে নির্ধারণের জন্য। নতুন করে চাকরিরত অবস্থায় মারা যাওয়া কর্মচারীর পরিবারের পারিবারিক পেনশন হিসাবের সঙ্গে এই বিষয়টি এক করে দেখা যাবে না।
এক নজরে ১০ বছর চাকরি করে মৃত্যুর ক্ষেত্রে
চাকরিকাল: ১০ বছর
গ্রস পেনশনের নির্ধারিত হার: ৩৬%
হিসাবের ভিত্তি: সর্বশেষ আহরিত মূল বেতন
আনুতোষিকের হার: প্রতি ১ টাকা পেনশনের বিপরীতে ২৬০ টাকা
চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যু: পরিবার পারিবারিক পেনশন বিধি অনুযায়ী সুবিধা পাবে
বিধবা স্ত্রী/বিপত্নীক স্বামী: পুনর্বিবাহ না করার শর্তে আজীবন পারিবারিক পেনশনের বিধান রয়েছে
কার্যকর তারিখ: ১ জুলাই ২০২৬
শেষ কথা
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ১০ বছর চাকরি করে সরকারি কর্মচারী মারা গেলে ৩৬ শতাংশকে পরিবারের চূড়ান্ত মাসিক পেনশন হিসেবে সরাসরি ধরে নেওয়া যাবে না। ৩৬ শতাংশ হলো সংশ্লিষ্ট চাকরিকালের জন্য সর্বশেষ মূল বেতনের ওপর নির্ধারিত গ্রস পেনশনের হার। এরপর মৃত কর্মচারীর পরিবার/উত্তরাধিকারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য পারিবারিক পেনশন বিধান অনুযায়ী চূড়ান্ত প্রাপ্যতা নির্ধারণ করা হবে।
তাই ২০২৬ সালে কোনো কর্মচারী ১০ বছর চাকরি পূর্ণ করে মারা গেলে তাঁর পরিবার পারিবারিক পেনশন, আনুতোষিক এবং প্রযোজ্য অন্যান্য সুবিধা পাওয়ার অধিকারী হতে পারে; সঠিক অঙ্ক জানতে সর্বশেষ মূল বেতন, পেনশনযোগ্য চাকরিকাল এবং পরিবারের যোগ্য উত্তরাধিকারীদের তথ্য দিয়ে হিসাব করতে হবে।



