বৈষম্য । দাবীর খতিয়ান । পুন:বিবেচনা

৯ম জাতীয় পে-স্কেলে বাড়িভাড়া ভাতা নিয়ে নতুন বিতর্ক, গ্রেডভিত্তিক অসংগতি সংশোধনের দাবি

৯ম জাতীয় পে-স্কেলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাড়িভাড়া ভাতার হিসাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। ঢাকা সিটি এলাকার জন্য উল্লেখ করা বাড়িভাড়া ভাতার বিভিন্ন অঙ্ক বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, কিছু ক্ষেত্রে উচ্চতর গ্রেডে কর্মরত কর্মচারীদের তুলনায় নিম্নতর গ্রেডের কর্মচারীরা কম বাড়িভাড়া ভাতা পাচ্ছেন। আবার ১৬তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের বাড়িভাড়া ভাতার অঙ্ক ১১তম থেকে ১৫তম গ্রেডের কয়েকটি পদের তুলনায় বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে বাড়িভাড়া ভাতার হিসাবের অসংগতি দূর করে গ্রেডভিত্তিক বেতন কাঠামোর মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠার দাবি উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো গ্রেডের কর্মচারীর বিদ্যমান সুবিধা কমিয়ে নয়, বরং যৌক্তিক সমন্বয়ের মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির সভাপতি আব্দুল মালেকও বাড়িভাড়া ভাতার অসংগতি দ্রুত সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন বলে প্রদত্ত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঢাকা সিটি এলাকায় কোন গ্রেডে কত বাড়িভাড়া ভাতা?

প্রদত্ত হিসাব অনুযায়ী, ১১তম থেকে ১৫তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য ঢাকা সিটি এলাকার বাড়িভাড়া ভাতার পরিমাণ নিম্নরূপ—

গ্রেডউল্লেখিত বাড়িভাড়া ভাতা
১১তম গ্রেড১২,৫০০ টাকা
১২তম গ্রেড১২,১৫০ টাকা
১৩তম গ্রেড১২,০০০ টাকা
১৪তম গ্রেড১১,৭৫০ টাকা
১৫তম গ্রেড১১,৪০০ টাকা

এই তালিকায় দেখা যাচ্ছে, ১১তম গ্রেড থেকে ১৫তম গ্রেড পর্যন্ত বাড়িভাড়া ভাতার অঙ্ক ক্রমান্বয়ে কমেছে। অর্থাৎ, উল্লেখিত হিসাব অনুসারে ১১তম গ্রেডের কর্মচারী ১৫তম গ্রেডের কর্মচারীর তুলনায় মাসে ১ হাজার ১০০ টাকা বেশি বাড়িভাড়া ভাতা পাচ্ছেন।

তবে এসব অঙ্কের ভিত্তি, সংশ্লিষ্ট মূল বেতন এবং প্রযোজ্য সরকারি আদেশ যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ, কেবল গ্রেডের নামের ভিত্তিতে নয়, বাড়িভাড়া ভাতার প্রকৃত হিসাব নির্ধারণে প্রযোজ্য বিধানও গুরুত্বপূর্ণ।

১৬তম থেকে ২০তম গ্রেডের বাড়িভাড়া ভাতার চিত্র

অন্যদিকে, প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৬তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের বাড়িভাড়া ভাতার পরিমাণ নিচে তুলে ধরা হলো—

গ্রেডউল্লেখিত বাড়িভাড়া ভাতা
১৬তম গ্রেড১৩,১৪০ টাকা
১৭তম গ্রেড১২,৮৪০ টাকা
১৮তম গ্রেড১২,৬০০ টাকা
১৯তম গ্রেড১২,৩০০ টাকা
২০তম গ্রেড১২,০০০ টাকা

এই তালিকায় ১৬তম গ্রেডের কর্মচারীর বাড়িভাড়া ভাতা ১৩ হাজার ১৪০ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, ১১তম গ্রেডের কর্মচারীর জন্য উল্লেখিত বাড়িভাড়া ভাতা ১২ হাজার ৫০০ টাকা।

অর্থাৎ, তালিকাভুক্ত অঙ্ক অনুযায়ী ১৬তম গ্রেডের কর্মচারী ১১তম গ্রেডের কর্মচারীর তুলনায় মাসে ৬৪০ টাকা বেশি বাড়িভাড়া ভাতা পাচ্ছেন।

একইভাবে, ২০তম গ্রেডের কর্মচারীর জন্য বাড়িভাড়া ভাতা উল্লেখ করা হয়েছে ১২ হাজার টাকা। অথচ ১৫তম গ্রেডের কর্মচারীর ক্ষেত্রে এ অঙ্ক ১১ হাজার ৪০০ টাকা। ফলে প্রদত্ত হিসাব অনুযায়ী, ২০তম গ্রেডের কর্মচারী মাসে ৬০০ টাকা বেশি বাড়িভাড়া ভাতা পাচ্ছেন।

এই পার্থক্যই মূলত বাড়িভাড়া ভাতার গ্রেডভিত্তিক সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

কেন বাড়িভাড়া ভাতার হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে?

সরকারি চাকরিতে গ্রেডভিত্তিক বেতন কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো দায়িত্ব, পদমর্যাদা ও নির্ধারিত বেতনধাপের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখা। যদিও বাড়িভাড়া ভাতা মূল বেতনের মতো সরাসরি গ্রেডের ক্রমানুসারে নির্ধারিত নাও হতে পারে, তবু একই কর্মস্থল বা একই ভৌগোলিক এলাকার জন্য প্রযোজ্য ভাতার অঙ্কে অসামঞ্জস্য দেখা গেলে তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন।

বিশেষ করে, উচ্চতর গ্রেডে কর্মরত একজন কর্মচারী যদি নিম্নতর গ্রেডের কর্মচারীর তুলনায় কম বাড়িভাড়া ভাতা পান, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের মধ্যে বেতন-সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—

প্রথমত, মূল বেতনের সঙ্গে সামঞ্জস্য: বাড়িভাড়া ভাতার হিসাব নির্ধারণে মূল বেতন বা বেতনধাপের ভূমিকা থাকলে সংশ্লিষ্ট গ্রেডগুলোর হিসাব পাশাপাশি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, একই এলাকার জন্য অভিন্ন নীতিমালা: ঢাকা সিটি এলাকার কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বাড়িভাড়া ভাতা নির্ধারণের নিয়ম স্পষ্ট ও সহজবোধ্য হওয়া জরুরি, যাতে একই ধরনের পরিস্থিতিতে কর্মরত কর্মচারীরা নিজেদের প্রাপ্য সুবিধা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেন।

তৃতীয়ত, গ্রেডভিত্তিক বৈষম্য নিরসন: বেতন কাঠামোর একাধিক গ্রেডের মধ্যে সুবিধার পার্থক্য থাকলে তার পেছনে নির্ধারিত নীতিগত কারণ রয়েছে কি না, তা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।

তবে শুধু বাড়িভাড়া ভাতার অঙ্ক তুলনা করেই কোনো বিধিগত বৈষম্য চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করা যায় না। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি আদেশ, ভাতার নির্ধারিত হার এবং হিসাবের ভিত্তি যাচাই করা জরুরি।

কোনো গ্রেডের সুবিধা কমিয়ে নয়, সমন্বয়ের মাধ্যমে সমাধানের দাবি

বাড়িভাড়া ভাতা নিয়ে আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো, অসংগতি দূর করতে গিয়ে কোনো গ্রেডের কর্মচারীর বিদ্যমান সুবিধা কমিয়ে দেওয়া উচিত হবে না।

কর্মচারীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট এ দাবির মূল বক্তব্য হচ্ছে, যদি প্রচলিত হিসাবের মধ্যে প্রকৃত অসামঞ্জস্য থেকে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট বিধান পর্যালোচনা করে এমন একটি সমাধান বের করতে হবে, যাতে কর্মচারীদের মধ্যে অযৌক্তিক সুবিধার পার্থক্য কমে আসে।

এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চাইলে গ্রেডভিত্তিক বাড়িভাড়া ভাতার হিসাব পুনর্মূল্যায়ন, প্রযোজ্য হার স্পষ্ট করা এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনী জারির বিষয় বিবেচনা করতে পারে।

তবে এ ধরনের কোনো পরিবর্তন বাস্তবায়নের আগে আর্থিক প্রভাব, প্রচলিত বিধান এবং বিভিন্ন গ্রেডের কর্মচারীদের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

কল্যাণ সমিতির সভাপতির দাবি ও উদ্যোগ

প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির সভাপতি আব্দুল মালেক বাড়িভাড়া ভাতার অসংগতি দ্রুত সংশোধন ও সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।

এ ছাড়া তিনি সচিবালয়ে মন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিষয়টি তুলে ধরেছেন বলে তথ্যটিতে উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি বেতন কাঠামোর বিভিন্ন ধরনের বৈষম্য ও অসংগতি দূর করার লক্ষ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঐক্যবদ্ধভাবে দাবি জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

এ উদ্যোগের মাধ্যমে বাড়িভাড়া ভাতাসহ বেতন-সুবিধার বিভিন্ন বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়।

তবে এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, কোনো সিদ্ধান্ত কিংবা সংশোধিত প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করার মতো তথ্য এখানে পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টিকে আপাতত দাবি ও আলোচনার পর্যায়ে থাকা বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

কীভাবে সমাধান হতে পারে?

বাড়িভাড়া ভাতা নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করতে প্রথমেই সংশ্লিষ্ট বেতন কাঠামো ও সরকারি আদেশের ভিত্তিতে প্রতিটি গ্রেডের হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন। এরপর প্রকৃত অসংগতি শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

সমাধানের ক্ষেত্রে কয়েকটি পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে—

১. ঢাকা সিটি এলাকার জন্য প্রতিটি গ্রেডের বাড়িভাড়া ভাতার হিসাব পুনরায় যাচাই করা।

২. কোন মূল বেতন বা কোন নির্ধারিত হারের ভিত্তিতে ভাতার অঙ্ক নির্ধারণ করা হয়েছে, তা স্পষ্ট করা।

৩. একই ধরনের পরিস্থিতিতে বিভিন্ন গ্রেডের কর্মচারীদের প্রাপ্য সুবিধার মধ্যে অযৌক্তিক পার্থক্য রয়েছে কি না, তা পর্যালোচনা করা।

৪. প্রকৃত অসংগতি পাওয়া গেলে কোনো গ্রেডের কর্মচারীর সুবিধা অযৌক্তিকভাবে কমিয়ে না দিয়ে নীতিগতভাবে গ্রহণযোগ্য সমাধান নির্ধারণ করা।

৫. সংশোধিত হিসাব বা সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা সরকারি আদেশের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে জানানো।

এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলে কর্মচারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি কমতে পারে এবং বেতন কাঠামো সম্পর্কে স্বচ্ছতা বাড়তে পারে।

সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাশা এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের দিকে

৯ম জাতীয় পে-স্কেলে বাড়িভাড়া ভাতার হিসাব নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্নের সমাধান চান সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মচারীরা। তাঁদের প্রত্যাশা, বেতন কাঠামোর প্রতিটি গ্রেডের জন্য ভাতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে যৌক্তিকতা ও সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা হবে।

বিশেষ করে, ঢাকা সিটি এলাকার বাড়িভাড়া ভাতার যে অঙ্কগুলো সামনে এসেছে, সেগুলোর সঠিকতা যাচাই করে প্রকৃত অসংগতি থাকলে দ্রুত সংশোধনের দাবি উঠেছে।

তবে প্রদত্ত অঙ্কগুলো সংশ্লিষ্ট সরকারি আদেশের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই না করা পর্যন্ত এগুলোকে চূড়ান্ত বা সরকারিভাবে অনুমোদিত হার হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। একইভাবে, বাড়িভাড়া ভাতা সংশোধনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা নতুন প্রজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়েছে—এমন দাবিও নির্ভরযোগ্য সরকারি সূত্র ছাড়া করা সমীচীন নয়।

সব মিলিয়ে, ৯ম জাতীয় পে-স্কেলে বাড়িভাড়া ভাতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, যৌক্তিকতা ও গ্রেডভিত্তিক সামঞ্জস্য নিশ্চিত করাই এখন মূল দাবি। কোনো গ্রেডের কর্মচারীর প্রাপ্য সুবিধা কমিয়ে নয়, বরং নিয়মতান্ত্রিক ও ন্যায়সংগত সমন্বয়ের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা হলে তা সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে আস্থা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *