৯ম পে-স্কেলে বেতন বৈষম্য নিরসনের দাবি: ১১–১৪তম গ্রেডের ফিক্সেশন, বাড়িভাড়া ও ভাতায় পরিবর্তন চান কর্মচারীরা
নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার পর বিভিন্ন গ্রেডের বেতন নির্ধারণ, গ্রেডভিত্তিক আর্থিক ব্যবধান এবং সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ১১ থেকে ১৪তম গ্রেডের বেতন নির্ধারণে অসংগতি, ১১–১৩তম গ্রেডের মধ্যে আর্থিক ব্যবধান কম থাকা, বাড়িভাড়া ভাতার হার এবং শিক্ষা, টিফিন ও যাতায়াত ভাতা পুনর্নির্ধারণের দাবি সামনে এসেছে।
সরকারি কর্মচারীদের বিভিন্ন মতামত ও উত্থাপিত দাবিতে দেখা যাচ্ছে, শুধু মূল বেতন বৃদ্ধি নয়, বরং নতুন বেতন কাঠামোর প্রতিটি গ্রেডের মধ্যে যৌক্তিক ব্যবধান এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভাতা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
১১ ও ১৪তম গ্রেডের বেতন নির্ধারণে অসংগতির অভিযোগ
উত্থাপিত একটি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ জুন ১৪তম গ্রেডের মূল বেতন ছিল ২২ হাজার ৩৮০ টাকা। অন্যদিকে, একই তারিখে ১১তম গ্রেডের মূল বেতন ছিল ২২ হাজার ৫৩০ টাকা। অর্থাৎ পুরোনো বেতন কাঠামোয় ১১তম গ্রেডের মূল বেতন ১৪তম গ্রেডের চেয়ে ১৫০ টাকা বেশি ছিল।
কিন্তু নতুন বেতন কাঠামোয় ১০০ শতাংশ বৃদ্ধির হিসাব ধরে বেতন ফিক্সেশনের উদাহরণ তুলে ধরে বলা হচ্ছে, ১১তম গ্রেডের ক্ষেত্রে নির্ধারিত বেতন দাঁড়াচ্ছে ৩৮ হাজার ৮০০ টাকা এবং ১৪তম গ্রেডের ক্ষেত্রে ৪০ হাজার ২০০ টাকা। ফলে আগের কাঠামোয় বেশি মূল বেতন পাওয়া ১১তম গ্রেডের কর্মচারী নতুন ফিক্সেশনে ১৪তম গ্রেডের তুলনায় ১ হাজার ৪০০ টাকা পিছিয়ে পড়ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই হিসাবের সঠিক ভিত্তি, প্রযোজ্য ফিক্সেশন বিধি এবং ব্যক্তিগত বেতন নির্ধারণের শর্ত যাচাই করা প্রয়োজন। তবে অভিযোগটি যথাযথ হলে বিষয়টি নতুন বেতন কাঠামোর গ্রেডভিত্তিক সামঞ্জস্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে।
১১, ১২ ও ১৩তম গ্রেডের মধ্যে আর্থিক ব্যবধান বাড়ানোর দাবি
সরকারি কর্মচারীদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো ১১, ১২ ও ১৩তম গ্রেডের মধ্যে বেতন ও আর্থিক সুবিধার পার্থক্য যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসা।
কর্মচারীদের বক্তব্য, কয়েকটি গ্রেডের মধ্যে মূল বেতন ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধার ব্যবধান প্রত্যাশিত মাত্রায় নেই। ফলে পদমর্যাদা, দায়িত্ব, চাকরির অভিজ্ঞতা ও গ্রেডের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও প্রকৃত আর্থিক সুবিধায় যথেষ্ট ব্যবধান তৈরি হচ্ছে না।
তাদের মতে, নতুন বেতন কাঠামোয় প্রতিটি গ্রেডের মধ্যে এমন একটি যৌক্তিক পার্থক্য থাকা প্রয়োজন, যাতে উচ্চতর গ্রেডে পদোন্নতি বা নিয়োগের ক্ষেত্রে আর্থিক সুবিধার বিষয়টি যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়।
২০১৭ থেকে ২০২০ সালে নিয়োগপ্রাপ্তদের পে-স্কেল জটিলতা
নতুন করে আলোচনায় এসেছে ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণের বিষয়টিও।
উত্থাপিত অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময়ে নিয়োগ পাওয়া কিছু কর্মচারীর ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের নতুন পে-স্কেলে মূল বেতন একই ৩০ হাজার ৭০০ টাকা নির্ধারিত হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এতে চাকরিতে যোগদানের সময়, পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণ এবং নতুন স্কেলে ফিক্সেশনের মধ্যে সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
কর্মচারীদের দাবি, যারা ভিন্ন সময়ে চাকরিতে যোগদান করেছেন, তাদের ক্ষেত্রে চাকরির মেয়াদ, অর্জিত ইনক্রিমেন্ট এবং পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণের বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে একই পদে বা একই গ্রেডে কর্মরত কর্মচারীদের মধ্যে অযৌক্তিক বেতন-সমতা তৈরি হলে তা পর্যালোচনা করে সমাধানের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাড়িভাড়া ভাতা ৪০ শতাংশ করার প্রস্তাব
নতুন বেতন কাঠামোয় বাড়িভাড়া ভাতার হার নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। বিশেষ করে ১১ থেকে ১৫তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য বাড়িভাড়া ভাতা মূল বেতনের ৪০ শতাংশ নির্ধারণের দাবি উঠেছে।
কর্মচারীদের বক্তব্য, বর্তমান বাজারে বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও অন্যান্য আবাসন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়িভাড়া ভাতার হার নির্ধারণ করা না হলে প্রকৃত আর্থিক সুবিধা অনেকটাই কমে যায়।
তাই গ্রেডভিত্তিক বাড়িভাড়া ভাতার হার পুনর্বিবেচনা করে বিশেষ করে ১১–১৫তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য ৪০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
টিফিন ও যাতায়াত ভাতা সবার জন্য কার্যকরের দাবি
টিফিন ও যাতায়াত ভাতার ক্ষেত্রেও গ্রেডভিত্তিক বৈষম্য দূর করার দাবি জানিয়েছেন সরকারি কর্মচারীরা।
তাদের প্রশ্ন, ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা যদি টিফিন ও যাতায়াত ভাতার সুবিধা পান, তাহলে ৯ম ও ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কেন একই ধরনের সুবিধার বাইরে থাকবেন?
তাদের মতে, অফিসে যাতায়াত এবং কর্মঘণ্টায় খাবার গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য নয়। সব স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরই এসব প্রয়োজন রয়েছে।
এ কারণে ৯ম ও ১০ম গ্রেডের জন্যও টিফিন ও যাতায়াত ভাতা কার্যকর করার দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান টিফিন ভাতা সময়োপযোগী করার প্রস্তাবও রয়েছে।
মোবাইল ও শিক্ষা ভাতা পুনর্নির্ধারণের দাবি
নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে মোবাইল ভাতা এবং শিক্ষা ভাতার পরিমাণও সময়োপযোগী করার দাবি উঠেছে।
কর্মচারীদের মতে, বর্তমানে দাপ্তরিক যোগাযোগ, তথ্য আদান-প্রদান এবং বিভিন্ন অনলাইন সেবা ব্যবহারের জন্য মোবাইল ফোন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে দাপ্তরিক কাজেও ব্যক্তিগত মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হয়।
তাই নতুন নির্ধারিত মোবাইল ভাতা বর্তমান বাজারদর ও বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার দাবি জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, সন্তানদের শিক্ষা ব্যয়, বই-খাতা, শিক্ষা উপকরণ এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ বিবেচনায় শিক্ষা ভাতার পরিমাণ বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে।
এ ছাড়া বৈশাখী ভাতা বাড়ানোর দাবিও জানিয়েছেন কর্মচারীরা। তাদের মতে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এসব ভাতা পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
পাহাড়ি ভাতা নিয়ে বৈষম্যের অভিযোগ
পার্বত্য অঞ্চলে কর্মরত সরকারি কর্মচারীদের জন্য পাহাড়ি ভাতার হার নিয়েও নতুন করে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে।
কর্মচারীদের উত্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, আগের ব্যবস্থায় জেলা সদরে মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে সর্বোচ্চ ৩ হাজার টাকা এবং উপজেলায় ২০ শতাংশ হারে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা পাহাড়ি ভাতা দেওয়া হতো।
পরবর্তী সময়ে জেলা সদরের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ভাতার সীমা ৫ হাজার টাকা করা হলেও উপজেলা পর্যায়ে তা বাড়িয়ে ৫ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এতে উপজেলা পর্যায়ে কর্মরত কর্মচারীদের প্রত্যাশিত সুবিধা নিশ্চিত হয়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের বক্তব্য, পাহাড়ি জেলার বিভিন্ন উপজেলা জেলা সদর থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে যাতায়াতের দূরত্ব ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, যাতায়াত ব্যয় এবং জীবনযাত্রার বাড়তি খরচের কারণে উপজেলা পর্যায়ে কর্মরতদের আর্থিক চাপ তুলনামূলক বেশি।
এ পরিস্থিতিতে পাহাড়ি উপজেলা পর্যায়ে কর্মরত সরকারি কর্মচারীদের পাহাড়ি ভাতার সর্বোচ্চ সীমা ১০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে।
২০২৭ সালের ছুটির তালিকা ঘিরেও কর্মচারীদের আগ্রহ
সরকারি কর্মচারীদের আলোচনায় ২০২৭ সালের সম্ভাব্য ছুটির তালিকাও এসেছে। প্রকাশিত একটি তালিকায় শবে বরাত, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস, ঈদুল ফিতর, বাংলা নববর্ষ, মে দিবস, ঈদুল আজহা, জন্মাষ্টমী, দুর্গাপূজা, বিজয় দিবস ও বড়দিনসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতীয় দিবসের উল্লেখ রয়েছে।
তবে ধর্মীয় উৎসবের ছুটির তারিখ চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সংশ্লিষ্ট তারিখগুলো পরিবর্তিত হতে পারে। এ ধরনের তালিকাকে সরকারি প্রজ্ঞাপন বা চূড়ান্ত ছুটির তালিকা প্রকাশের আগ পর্যন্ত সম্ভাব্য তথ্য হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।
কী ধরনের সমাধান চান সরকারি কর্মচারীরা?
বিভিন্ন দাবি ও মতামত পর্যালোচনা করলে নতুন বেতন কাঠামোর ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে আসে।
1. ১১ থেকে ১৪তম গ্রেডের বেতন ফিক্সেশনের অসংগতি যাচাই ও প্রয়োজনীয় সংশোধন।
2. ১১, ১২ ও ১৩তম গ্রেডের মধ্যে যৌক্তিক আর্থিক ব্যবধান নিশ্চিত করা।
3. ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে নিয়োগপ্রাপ্তদের বেতন নির্ধারণের জটিলতা পর্যালোচনা।
4. ১১ থেকে ১৫তম গ্রেডের বাড়িভাড়া ভাতা ৪০ শতাংশ করার প্রস্তাব বিবেচনা।
5. ৯ম ও ১০ম গ্রেডের জন্য টিফিন ও যাতায়াত ভাতা কার্যকর করা।
6. বিদ্যমান টিফিন ভাতা সময়োপযোগী করা।
7. মোবাইল ও শিক্ষা ভাতার পরিমাণ পুনর্নির্ধারণ।
8. বৈশাখী ভাতা বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা।
9. পাহাড়ি উপজেলা পর্যায়ে কর্মরতদের ভাতা সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব পর্যালোচনা।
10. নতুন পে-স্কেলের অন্যান্য অসংগতি চিহ্নিত করে সমন্বিত সমাধান।
শেষ কথা
নতুন জাতীয় বেতন কাঠামোর মূল উদ্দেশ্য শুধু বেতন বৃদ্ধি নয়; বরং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে গ্রেডভিত্তিক ন্যায্যতা, আর্থিক সামঞ্জস্য এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা।
কর্মচারীদের উত্থাপিত দাবিগুলো থেকে স্পষ্ট, মূল বেতনের পাশাপাশি বাড়িভাড়া, টিফিন, যাতায়াত, শিক্ষা, মোবাইল ও বিশেষ ভাতার বিষয়গুলোও তাদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে ১১ থেকে ১৪তম গ্রেডের বেতন নির্ধারণে যে অসংগতির অভিযোগ উঠেছে, সেটি যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারীদের বেতন ফিক্সেশনে কোনো অযৌক্তিক বৈষম্য তৈরি হয়েছে কি না, তা পর্যালোচনা করা জরুরি।
এখন দেখার বিষয়, সরকারি কর্মচারীদের এসব দাবি ও প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় আসে কি না এবং নতুন বেতন কাঠামোর অসংগতিগুলো দূর করতে কোনো সংশোধনী বা সমন্বয়মূলক উদ্যোগ নেওয়া হয় কি না।


