আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও নিজেদের স্বার্থের বলি: ১১ বছর ধরে কেন আটকে রইল সরকারি কর্মচারীদের পে-স্কেল?
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আলোর মুখ দেখেনি। ২০১৫ সালে সর্বশেষ অষ্টম পে-স্কেল ঘোষণার পর নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ৫ বছর পর পর নতুন বেতন কাঠামো আসার কথা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। সংশ্লিষ্ট তথ্য ও মাঠপর্যায়ের কর্মচারীদের অভিযোগ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিগত সরকারের শীর্ষ আমলা ও সচিবদের উদাসীনতা, নিজেদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে চুপ থাকা এবং গভীর আমলাতান্ত্রিক জটিলতাই ছিল এই দীর্ঘ বিলম্বের মূল কারণ।
২০২০ সালেই হতে পারত পে-স্কেল, কেন করা হলো না?
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০ সালেই সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল ঘোষণার সমস্ত যৌক্তিক কারণ ও সময় তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন সরকারের শীর্ষ আমলারা নিজেদের পদ-পদবি, বিশেষ গাড়ি সুবিধা, সুদযুক্ত ও সুদমুক্ত ঋণসহ সরকারের কাছ থেকে নানাবিধ ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা আদায় করে নিয়েছিলেন। সাধারণ কর্মচারীদের অভিযোগ, শীর্ষ সচিবরা নিজেদের আখের গুছিয়ে নেওয়ার পর সামগ্রিক বেতন কাঠামোর সংস্কার নিয়ে সম্পূর্ণ নীরব ভূমিকা পালন করেন। তারা যদি চাইতেন, তবে ২০২০ সালেই সরকারের উচ্চপর্যায়ে চাপ সৃষ্টি করে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করতে পারতেন। কিন্তু নিজেদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কায় কিংবা সরকারের সুনজরে থাকার কৌশল হিসেবে তারা সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এই ন্যায্য দাবিটিকে ফাইলবন্দি করে রেখেছিলেন।
নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের চরম দুর্ভোগ
বিগত বছরগুলোতে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে, তার বিপরীতে ২০১৫ সালের পুরনো বেতন কাঠামো দিয়ে বিশেষ করে ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীদের সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। দীর্ঘ ১১ বছর ধরে পে-স্কেল না পাওয়ায় লক্ষ লক্ষ নিম্ন আয়ের সরকারি কর্মচারী ও শিক্ষক সমাজ ঋণের জালে জর্জরিত হয়েছেন। অথচ আমলারা সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার অজুহাত দেখিয়ে বছরের পর বছর পে-স্কেলের ফাইল আটকে রেখেছেন, যা চরম বৈষম্যের জন্ম দিয়েছে।
বর্তমান সময়ে আমলাতান্ত্রিক আর কোনো আচরণ দেখতে চায় না সাধারণ মানুষ
পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং বর্তমান সরকারের সময়ে কর্মচারীরা আর কোনো ধরনের আমলাতান্ত্রিক টালবাহানা বা পক্ষপাতমূলক আচরণ দেখতে চান না। সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠন তাদের দেওয়া দাবিতে স্পষ্ট করেছে যে, পূর্ববর্তী সরকারের আমলারা যে বৈষম্য তৈরি করে গেছেন, তা দ্রুত দূর করতে হবে।
২০২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপট ও আশার আলো
দীর্ঘদিনের এই অচলাবস্থা কাটাতে বর্তমান সরকারের আমলে একটি বিশেষ সচিব কমিটি গঠিত হয়েছে, যারা নতুন পে-স্কেলের রূপরেখা নিয়ে কাজ করছেন। চলতি ২০২৬ সালের জুলাই মাস থেকেই নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে কার্যকর করার বিষয়ে পর্যালোচনা চলছে, যেখানে ১১-২০ গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন প্রায় ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০,০০০ টাকা করার প্রস্তাবনা রয়েছে।
সরকারি কর্মচারীদের সাধারণ মতামত হলো, নতুন বাংলাদেশ গড়ার এই সময়ে আমলাদের আর কোনো ধরনের স্বার্থান্বেষী নীরবতা বরদাশ করা হবে না। দেশের সার্বিক অর্থনীতি সচল রাখতে এবং মেহনতি সরকারি কর্মচারীদের মুখে হাসি ফোটাতে কোনো আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য ছাড়াই দ্রুত নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।



