সার্ভিস রুলস । নীতি । পদ্ধতি । বিধি

আয়ন ও ব্যয়ন কর্মকর্তার দায়িত্ব-কর্তব্য: সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা নিশ্চিতের কঠোর বিধান

সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং আর্থিক অনিয়ম প্রতিরোধে আয়ন ও ব্যয়ন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে বিস্তারিত নির্দেশনা রয়েছে সরকারি আর্থিক বিধিমালায়। এসব বিধান অনুযায়ী, সরকারি তহবিল ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কর্মকর্তাদের প্রতিটি ব্যয়, বিল প্রস্তুত, অর্থ উত্তোলন ও পরিশোধের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম অনুসরণ করতে হয়।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার মূল ভিত্তি হলো স্বচ্ছতা, নির্ভুল হিসাব সংরক্ষণ এবং অনুমোদিত খাতে ব্যয় নিশ্চিত করা। কোনো ব্যয় যেন প্রয়োজনের অতিরিক্ত না হয় এবং ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের উদ্দেশ্যে সরকারি অর্থ ব্যবহার না হয়, সে বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা আরোপ করা হয়েছে।

আয়ন ও ব্যয়ন কর্মকর্তার মূল দায়িত্ব

সরকারি তহবিল থেকে অর্থ উত্তোলন ও প্রাপকের কাছে পরিশোধের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকেই আয়ন ও ব্যয়ন কর্মকর্তা হিসেবে গণ্য করা হয়। অফিস প্রধান চাইলে অধীনস্থ কোনো গেজেটেড কর্মকর্তাকে এ দায়িত্ব অর্পণ করতে পারেন। তবে দায়িত্ব অর্পণ করলেও অফিস প্রধানের সামগ্রিক দায়-দায়িত্ব বহাল থাকে।

বিধিমালা অনুযায়ী আয়ন ও ব্যয়ন কর্মকর্তাকে নিশ্চিত করতে হবে—

  • বরাদ্দকৃত অর্থ নির্ধারিত উদ্দেশ্যেই ব্যয় হচ্ছে।
  • অনুমোদিত বাজেটের মধ্যে ব্যয় সীমাবদ্ধ থাকছে।
  • সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে কোনো আর্থিক অনিয়ম না ঘটছে।
  • প্রতিটি বিল ও ভাউচারের তথ্য সঠিক এবং যাচাইকৃত।

বাজেট ও ব্যয় ব্যবস্থাপনায় করণীয়

সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে কেবল বাজেট বরাদ্দ থাকাই যথেষ্ট নয়; বরং সংশ্লিষ্ট খাতে ব্যয়ের বৈধতা এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদনও থাকতে হবে।

বিধান অনুযায়ী—

  • বাজেট বরাদ্দের আওতায় থাকা অর্থ নির্ধারিত অর্থবছরের মধ্যেই ব্যয় করতে হবে।
  • অর্থবছর শেষে অব্যয়িত অর্থ সরকারি কোষাগারে সমর্পণ করতে হবে।
  • বাজেট বরাদ্দের অতিরিক্ত ব্যয় অনুমোদন ছাড়া করা যাবে না।
  • বিল দাখিলের সময় সংশ্লিষ্ট খাতভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস উল্লেখ করতে হবে।

সরকারি হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলনের নিয়ম

কোনো সরকারি কর্মচারী সরকারি প্রয়োজনে ব্যয় করলে নির্ধারিত নিয়মে বিল ও ভাউচার দাখিলের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন।

নিরীক্ষা অফিসে উপস্থাপিত বিলের ক্ষেত্রে—

  • বিলের গ্রহণযোগ্যতা,
  • দাবির বৈধতা,
  • স্বাক্ষরের সত্যতা,
  • গাণিতিক নির্ভুলতা

যাচাই করে তবেই অর্থ পরিশোধের অনুমোদন দেওয়া হবে।

বেতন-ভাতা প্রদানে বিশেষ নির্দেশনা

সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা সাধারণত হিসাবরক্ষণ অফিসের আওতাধীন এলাকায় পরিশোধ করা হয়।

বদলিজনিত ক্ষেত্রে পুরোনো কর্মস্থলের বেতন নতুন কর্মস্থল থেকে উত্তোলন করা যায়, তবে এ জন্য নিরীক্ষা অফিসের ‘নন-ড্রয়াল সার্টিফিকেট’ প্রয়োজন হয়।

কর্মচারী চাকরি ত্যাগ, অবসর গ্রহণ বা মৃত্যুবরণ করলে সর্বশেষ বেতন বিল পরিশোধের আগে নিশ্চিত হতে হবে যে তার বিরুদ্ধে কোনো সরকারি পাওনা বকেয়া নেই।

বিল প্রস্তুত ও উপস্থাপনের বিধান

বিল প্রস্তুতের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফরম ব্যবহার বাধ্যতামূলক। বিলে কোনো কাটাছেঁড়া বা সংশোধন হলে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে তারিখসহ স্বাক্ষর করতে হবে।

গুরুত্বপূর্ণ বিধানসমূহ হলো—

  • একই বিল দ্বিতীয়বার পরিশোধ করা যাবে না।
  • বিল হারিয়ে গেলে ডুপ্লিকেট বিল প্রদানের আগে নিশ্চিত হতে হবে যে মূল বিল পরিশোধ হয়নি।
  • বকেয়া বিল নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে দাখিল করতে হবে।
  • মাসিক বেতন বিলের সঙ্গে বকেয়া বিল একত্রে উপস্থাপন করা যাবে না।

চেক ও নগদ লেনদেন সংক্রান্ত নির্দেশনা

সরকারি চেক ব্যবস্থাপনায়ও রয়েছে কঠোর নিয়ম।

চেক বই ব্যক্তিগত হেফাজতে রাখতে হবে এবং চেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সঠিকভাবে পূরণ করতে হবে। চেকে কোনো সংশোধন প্রয়োজন হলে তা সংশ্লিষ্ট আয়ন কর্মকর্তার পূর্ণস্বাক্ষরে সত্যায়িত করতে হবে।

অন্যদিকে নগদ লেনদেনের ক্ষেত্রে—

  • প্রতিটি অফিসে ক্যাশ বুক সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক।
  • সকল আয়-ব্যয় তাৎক্ষণিকভাবে ক্যাশ বুকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
  • প্রতিদিন ক্যাশ বুক বন্ধ ও ব্যালেন্স মিলিয়ে দেখতে হবে।
  • মাস শেষে অফিস প্রধানকে ক্যাশ ব্যালেন্স যাচাই করতে হবে।
  • সরকারি অর্থ ও ব্যক্তিগত অর্থ কখনো একসঙ্গে রাখা যাবে না।

ব্যক্তিগত দায় ও জবাবদিহিতা

সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত দায়-দায়িত্বও স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো কর্মকর্তা তার স্বাক্ষরিত বিলের অর্থ যথাযথ প্রাপকের হাতে পৌঁছানোর বিষয়ে দায়ী থাকবেন। একই সঙ্গে সরকারি অর্থের অপচয়, অনিয়ম বা অব্যবস্থাপনার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।

স্বচ্ছতা নিশ্চিতই মূল লক্ষ্য

আর্থিক বিধিমালার এসব নির্দেশনা পর্যালোচনায় দেখা যায়, সরকারি অর্থের সুরক্ষা, অপচয় রোধ, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং জনস্বার্থে অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করাই আয়ন ও ব্যয়ন কর্মকর্তার দায়িত্ব-কর্তব্য সংক্রান্ত বিধানগুলোর প্রধান উদ্দেশ্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হলে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আরও শক্তিশালী হবে।

Source

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *