সার্ভিস রুলস । নীতি । পদ্ধতি । বিধি

১৮ বছর পূর্তির আগে সরকারি চাকরিতে যোগদান: পেনশন নিয়ে হিসাব মহাপরিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত

১৮ বছর পূর্তির আগে চাকরিতে যোগদান করলেও পুরো চাকরি বাতিল নয়, তবে ওই সময় পেনশনযোগ্য চাকরিকাল হিসেবে গণ্য হবে না—জানিয়েছে হিসাব মহাপরিদপ্তর

সরকারি চাকরিতে যোগদানের সময় কর্মচারীর বয়স ১৮ বছর পূর্ণ না থাকলে সেই চাকরির ভবিষ্যৎ পেনশন, ইনক্রিমেন্ট ও চাকরিকাল গণনা নিয়ে অনেকের মধ্যেই প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে যেসব সরকারি কর্মচারীর জাতীয় পরিচয়পত্র, শিক্ষাগত সনদ এবং সার্ভিস বুক—সব নথিতেই একই জন্মতারিখ রয়েছে এবং হিসাব করে দেখা যায় যে চাকরিতে যোগদানের দিন তাদের বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হয়নি, তাদের ক্ষেত্রে কী হবে—এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিভ্রান্তি রয়েছে।

সম্প্রতি এমনই একটি বিষয়ে হিসাব মহাপরিদপ্তরের কার্যালয় থেকে দেওয়া একটি চিঠিতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে। চিঠিতে স্পষ্ট করা হয়েছে, ১৮ বছর বয়স পূর্তির আগে যে চাকরিকাল অতিবাহিত হয়েছে, তা পেনশনযোগ্য চাকরিকাল হিসেবে গণনা করা যাবে না। তবে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার পরের চাকরিকাল পেনশনযোগ্য চাকরি হিসেবে গণ্য হবে।

চিঠিতে কী বলা হয়েছে

প্রকাশিত চিঠিটির বিষয় হলো—“আঠারো (১৮) বছর পূর্তির পূর্বে বয়স সার্ভিস করা চাকরির ইনক্রিমেন্ট বাতিল ও অতিরিক্ত গৃহীত অর্থ কর্তন প্রসঙ্গে।”

চিঠিতে বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস (বিএসআর) পার্ট-১-এর বিধি ২৫(ক)-এর ব্যাখ্যার উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ১৮ বছর বয়সের পূর্বের চাকরি পেনশনযোগ্য চাকরি হিসেবে গণ্য হবে না। অন্যদিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সের পরবর্তী চাকরিকাল পেনশনযোগ্য চাকরি হিসেবে গণ্য হবে।

অর্থাৎ কোনো কর্মচারী যদি ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়ে থাকেন, তাহলে তার চাকরির শুরু থেকে ১৮ বছর পূর্তির আগ পর্যন্ত সময়কে পেনশনের জন্য যোগ করা যাবে না।

তাহলে ওই কর্মচারীর চাকরি কি অবৈধ হয়ে যাবে?

এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি বুঝতে হবে।

১৮ বছর পূর্তির আগে চাকরিতে যোগদান এবং ওই সময়কে পেনশনযোগ্য চাকরিকাল হিসেবে গণনা না করা—দুটি আলাদা বিষয়।

হিসাব মহাপরিদপ্তরের ওই চিঠিটি মূলত পেনশনযোগ্য চাকরিকাল ও ইনক্রিমেন্ট গণনা নিয়ে। চিঠিতে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর পুরো চাকরি বাতিল বা চাকরি অবৈধ ঘোষণার কথা বলা হয়নি। বরং ১৮ বছর পূর্তির আগের সময়কে পেনশনযোগ্য চাকরি হিসেবে না ধরার বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।

তাই কোনো কর্মচারী যদি বহু বছর ধরে নিয়মিত সরকারি চাকরি করে থাকেন এবং এখন অবসর-উত্তর ছুটি বা PRL-এ গিয়ে থাকেন, শুধু এই কারণে যে তার যোগদানের সময় বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হয়নি—তার পুরো চাকরি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে, এমন সিদ্ধান্ত এই চিঠি থেকে নেওয়া ঠিক হবে না।

তবে নিয়োগের সময় প্রযোজ্য নিয়োগ বিধি অনুযায়ী ওই পদের জন্য ন্যূনতম বয়সের শর্ত কী ছিল, সেটি আলাদাভাবে যাচাই করার বিষয়। সরকারি চাকরিতে সরাসরি নিয়োগের বয়সসীমা সংশ্লিষ্ট নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও প্রযোজ্য বিধি দ্বারা নির্ধারিত হয়।

ড্রাইভার পদে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ

প্রশ্নে উল্লেখ করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি একজন সরকারি ড্রাইভার। এ ক্ষেত্রে নিয়োগের পাশাপাশি ড্রাইভিং লাইসেন্সের বয়সসংক্রান্ত শর্তও আলাদা করে বিবেচনা করতে হবে।

বর্তমান সড়ক পরিবহন আইনে অপেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর এবং পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য ন্যূনতম বয়স ২১ বছর নির্ধারিত রয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির চাকরি যদি বহু পুরোনো হয়, তাহলে নিয়োগের তারিখে কার্যকর আইন ও বিধিমালা দেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বর্তমান আইনের বয়সসীমা সরাসরি অতীতের নিয়োগের ওপর প্রয়োগ করে সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক হবে না।

১৮ বছরের আগে করা চাকরির ইনক্রিমেন্টের কী হবে?

হিসাব মহাপরিদপ্তরের চিঠির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ইনক্রিমেন্ট সংক্রান্ত নির্দেশনা।

চিঠিতে বলা হয়েছে, ১৮ বছর পূর্তির আগে বয়স সার্ভিস করা চাকরির ইনক্রিমেন্ট গণনার কোনো সুযোগ নেই। ফলে ১৮ বছর পূর্তির আগে যে সময়ের জন্য ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হয়ে থাকলে তা পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজন হতে পারে।

অর্থাৎ কর্মচারীর সার্ভিস বুক ও অন্যান্য নথিতে যদি দেখা যায় যে তিনি ১৮ বছর পূর্তির আগেই চাকরিতে যোগ দিয়েছেন, তাহলে—

  • ১৮ বছর পূর্তির আগের চাকরিকাল পেনশনযোগ্য হবে না;
  • ওই সময়ের ইনক্রিমেন্ট পাওয়ার অধিকার নিয়ে পুনর্নির্ধারণ হতে পারে;
  • অতিরিক্ত বেতন গ্রহণ করা হয়ে থাকলে কর্তন বা সমন্বয়ের প্রশ্ন আসতে পারে;
  • ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার পরের চাকরিকাল পেনশনযোগ্য হিসেবে গণনা করা হবে।

PRL শুরু হয়ে গেলে এখন কী করণীয়?

যদি ওই কর্মচারীর PRL ইতোমধ্যে শুরু হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি এখন অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন।

প্রথমে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর—

  1. জাতীয় পরিচয়পত্রে থাকা জন্মতারিখ;
  2. এসএসসি/সমমানের সনদে থাকা জন্মতারিখ;
  3. সার্ভিস বুকে থাকা জন্মতারিখ;
  4. নিয়োগপত্র;
  5. যোগদানের তারিখ;
  6. নিয়োগের সময়কার বয়সসংক্রান্ত যোগ্যতা;
  7. ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার সঠিক তারিখ;
  8. ১৮ বছর পূর্তির আগের সময়ের বেতন ও ইনক্রিমেন্ট;
  9. ১৮ বছর পূর্তির পর থেকে বর্তমান PRL শুরুর তারিখ পর্যন্ত চাকরিকাল

একসঙ্গে যাচাই করা উচিত।

এরপর ১৮ বছর পূর্তির তারিখ থেকে PRL/অবসর পর্যন্ত পেনশনযোগ্য চাকরিকাল কত বছর হয়েছে, সেটিই মূল হিসাব হবে।

তাহলে কি তিনি পূর্ণ পেনশন পাবেন?

এখানেও একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি।

“১৮ বছর থেকে PRL পর্যন্ত চাকরিকাল গণনা হবে” মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সবাই পূর্ণ পেনশন পাবেন—এ কথা বলা ঠিক নয়।

পেনশন নির্ধারণের ক্ষেত্রে পেনশনযোগ্য চাকরিকাল, অবসরের ধরন, শেষ বেতন, প্রযোজ্য পেনশন বিধান এবং অন্যান্য শর্ত বিবেচনা করা হয়।

তবে যদি সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর ১৮ বছর পূর্তির পর থেকে PRL/অবসর পর্যন্ত পেনশনযোগ্য চাকরিকালই পূর্ণ পেনশনের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা পূরণ করে, তাহলে ১৮ বছরের আগের সময় বাদ দিয়েও তিনি বিধি অনুযায়ী পূর্ণ পেনশনের জন্য যোগ্য হতে পারেন।

অর্থাৎ এখানে মূল কথা হলো—চাকরিতে প্রথম যোগদানের তারিখ নয়, পেনশন হিসাবের ক্ষেত্রে ১৮ বছর পূর্তির তারিখ থেকে যোগ্য চাকরিকাল কত হয়েছে সেটি গুরুত্বপূর্ণ।

“তাহলে চাকরি হলো কীভাবে?”—এর উত্তর কী?

এটি স্বাভাবিকভাবেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

যদি সত্যিই এনআইডি, সার্টিফিকেট ও সার্ভিস বুক—তিন জায়গাতেই একই জন্মতারিখ থাকে এবং সেই জন্মতারিখ অনুযায়ী যোগদানের সময় কর্মচারীর বয়স ১৮ বছরের কম হয়, তাহলে নিয়োগের সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কীভাবে বয়স যাচাই করে নিয়োগ দিয়েছে—এটি একটি প্রশাসনিক প্রশ্ন।

কিন্তু বহু বছর চাকরি করার পর পেনশন নিষ্পত্তির পর্যায়ে এসে “১৮ বছর বয়সের আগের চাকরি পেনশনযোগ্য নয়”—এই বিধান প্রয়োগ করা এবং “নিয়োগই অবৈধ ছিল”—এই দুই সিদ্ধান্ত এক নয়।

নিয়োগ বৈধ ছিল কি না, তা নির্ধারণ করতে হলে সংশ্লিষ্ট সময়কার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, নিয়োগ বিধি, বয়সের শর্ত, নিয়োগ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন, নিয়োগপত্র এবং যোগদানের সময় দাখিল করা কাগজপত্র পরীক্ষা করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর জন্য বাস্তব করণীয়

PRL শুরু হয়ে থাকলে কর্মচারীকে বিষয়টি মৌখিকভাবে রেখে না দিয়ে লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিস/পেনশন মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষের কাছে পরিষ্কার হিসাব চাওয়া উচিত।

বিশেষ করে লিখিতভাবে জানতে চাওয়া যেতে পারে—

“১৮ বছর পূর্তির তারিখ থেকে অবসর/PRL শুরুর তারিখ পর্যন্ত চাকরিকাল পেনশনযোগ্য হিসেবে গণনা করে পেনশন নির্ধারণ করা হবে কি না এবং ১৮ বছর পূর্তির পূর্ববর্তী সময়ের ইনক্রিমেন্ট ও অতিরিক্ত গৃহীত বেতন কীভাবে সমন্বয় করা হবে।”

এতে ভবিষ্যতে পেনশন, আনুতোষিক বা বেতন সমন্বয় নিয়ে কোনো জটিলতা তৈরি হলে তার লিখিত ভিত্তি থাকবে।

শেষ কথা

হিসাব মহাপরিদপ্তরের প্রকাশিত চিঠিটি থেকে যে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে পাওয়া যায় তা হলো—১৮ বছর বয়স পূর্তির পূর্বের সরকারি চাকরিকাল পেনশনযোগ্য চাকরিকাল হিসেবে গণনা করা যাবে না; ১৮ বছর পূর্তির পরের চাকরিকাল পেনশনযোগ্য হিসেবে গণনা করা হবে।

তাই কোনো সরকারি ড্রাইভার বা অন্য কর্মচারী ১৮ বছর পূর্তির আগে চাকরিতে যোগ দিয়ে থাকলেও, শুধু এই কারণে তার পুরো চাকরি বা অবসর সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়—এমনটি বলা যাবে না। বরং তার পেনশনযোগ্য চাকরিকাল নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে এবং ১৮ বছর পূর্তির পরের চাকরিকাল দিয়ে তিনি পেনশনের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা পূরণ করেছেন কি না, সেটিই হবে মূল বিষয়।

আর “১৮ বছর বয়স না হলে কর্তৃপক্ষ চাকরি দিল কীভাবে?”—এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে নিয়োগের সময়কার বিধি ও নিয়োগ নথি পরীক্ষা করা জরুরি। পেনশন হিসাবের নিয়ম থেকে সরাসরি নিয়োগ অবৈধ ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো আইনগতভাবে নিরাপদ নয়।

সুতরাং PRL শুরু হওয়া কর্মচারীর ক্ষেত্রে আতঙ্কিত না হয়ে প্রথমে ১৮ বছর পূর্তির তারিখ নির্ধারণ, এরপর ওই তারিখ থেকে পেনশনযোগ্য চাকরিকাল হিসাব এবং প্রয়োজনে ইনক্রিমেন্ট/অতিরিক্ত বেতন সমন্বয়ের লিখিত আদেশ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পদক্ষেপ।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *