নিয়োগ । বদলি । পদোন্নতি । জ্যেষ্ঠতা

গ্রেড বনাম শ্রেণী বিভাজন ২০২৬ : সরকারি চাকরিতে সমন্বিত জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে চরম জটিলতা, সমাধানের খোঁজে জনপ্রশাসন

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নন-ক্যাডার কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পারস্পরিক ও সমন্বিত জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ নিয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে চরম হট্টগোল ও জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। ২০১১ সালের নন-ক্যাডার বিধিমালা এবং ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেলের আদেশ—এই দুইয়ের আইনি গ্যাঁড়াকলে পড়ে মাঠ প্রশাসন থেকে শুরু করে সচিবালয় পর্যন্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতি ও গ্রেডেশন তালিকা প্রণয়ন থমকে দাঁড়িয়েছে।

সম্প্রতি একটি স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি সংস্থা এই আইনি জটিলতার স্থায়ী সমাধান চেয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন দপ্তরের তথ্যাদি ও সরকারি নথিপত্র বিশ্লেষণে এক চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে।

আইনি দ্বন্দ্ব: বিধিমালা ২০১১ বনাম পে স্কেল ২০১৫

জটিলতার মূল উৎস লুকিয়ে আছে দুটি প্রধান সরকারি আদেশের পরস্পরবিরোধী ব্যাখ্যার মধ্যে।

১. নন-ক্যাডার কর্মকর্তা ও কর্মচারী (জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি) বিধিমালা, ২০১১-এর বিধি ৪(২)-এ বলা হয়েছে:

“বিভিন্ন পদের সমন্বিত জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শ্রেণীর প্রারম্ভিক পদে নিয়মিত যোগদানের তারিখের ভিত্তিতে সমন্বিত জ্যেষ্ঠতা নির্ধারিত হইবে।”

২. অপরদিকে, চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০১৫-এর অনুচ্ছেদ ৮-এ স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে:

“আপাতত বলবৎ এতসংক্রান্ত অন্য কোন বিধি বিধানে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, কর্মচারীগণ ১ম, ২য়, ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীতে বিভাজনের বিদ্যমান ব্যবস্থার পরিবর্তে বেতনস্কেলের গ্রেড ভিত্তিক পরিচিত হইবেন।”

পূর্বে যখন শ্রেণীভিত্তিক (১ম, ২য়, ৩য়, ৪র্থ শ্রেণী) পরিচিতি ছিল, তখন ভিন্ন ভিন্ন পদ বা ভিন্ন ভিন্ন বেতন গ্রেড হওয়া সত্ত্বেও একই ‘শ্রেণী’ ভুক্ত হওয়ার কারণে প্রারম্ভিক পদে নিয়মিত যোগদানের তারিখ অনুযায়ী সমন্বিত জ্যেষ্ঠতা (Combined Seniority) নির্ধারণ করা সহজ হতো। কিন্তু ২০১৫ সালের পর থেকে ‘শ্রেণী বিভাজন’ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে ২০টি গ্রেডে রূপান্তর করা হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—আইনত যখন কোনো ‘শ্রেণী’ অস্তিত্বশীলই নেই, তখন ২০১১ সালের বিধিমালার ‘সংশ্লিষ্ট শ্রেণী’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে কীভাবে সমন্বিত জ্যেষ্টতা তালিকা তৈরি করা সম্ভব?

মাঠ পর্যায়ের বাস্তব উদাহরণ ও চরম বৈষম্য

সমন্বিত জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দপ্তরে যে কী পরিমাণ গড়মিল ও বিশৃঙ্খলা চলছে, তা একটি বাস্তব উদাহরণ দিলে স্পষ্ট হবে।

ধরা যাক, একই সরকারি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দু’জন কর্মচারী নিয়োগ পেলেন। এদের মধ্যে একজন ১৪তম গ্রেডের পদে এবং অন্যজন ১১তম গ্রেডের পদে নিয়োগ পেলেন। ১৪তম গ্রেডের কর্মচারীটি ১১তম গ্রেডের কর্মচারীর চেয়ে মাত্র ১০ দিন আগে চাকরিতে যোগদান করলেন।

  • ১৪তম গ্রেডের কর্মচারীর ফিডার টাইম (পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জনের সময়কাল) ১০ বছর।

  • ১১তম গ্রেডের কর্মচারীর ফিডার টাইম ৪ বছর।

এখন যদি ২০১১ সালের বিধিমালা অনুযায়ী শুধুমাত্র ‘যোগদানের তারিখ’-কে মূল ভিত্তি ধরা হয়, তবে ১৪তম গ্রেডের কর্মচারীটি ১০ দিন আগে যোগদানের সুবাদে জ্যেষ্ঠতা তালিকায় উপরে চলে আসবেন। এর ফলে ১১তম গ্রেডে থাকা সত্ত্বেও ওই উচ্চতর গ্রেডের কর্মকর্তা নিচের গ্রেডের কর্মকর্তার পেছনে পড়ে যাচ্ছেন। উচ্চতর স্কেল বা গ্রেডে থেকেও স্রেফ কয়েকদিন পরে যোগদানের কারণে জ্যেষ্ঠতা হারানো এবং ফিডার টাইম বা শিক্ষাগত যোগ্যতার সঠিক মূল্যায়ন না হওয়া নিয়ে কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, “২০১৫ সালের পে স্কেলের শ্রেণী বিলুপ্তির ঘোষণা কেবলই কথার কথা, কাজের বেলায় আগের নিয়মই রয়ে গেছে।”

সরকারি নথিপত্র ও চিঠিপত্রের বিশ্লেষণ

সংযুক্ত বিভিন্ন দাপ্তরিক চিঠি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এই জটিলতাটি সম্প্রতি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের (MoPME) অধীন পিটিআই (PTI) ইন্সট্রাক্টরদের সমন্বিত গ্রেডেশন তালিকা তৈরি করতে গিয়েও প্রকট আকার ধারণ করেছিল।

  • মন্ত্রণালয়ের পত্র : প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-১ শাখার স্মারক নং-৩৮.০০.০০০০.০০১.১৮.০০৫.২৩.১৩৬ (তারিখ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫) পত্রে বলা হয়েছিল যে, পিটিআই ইন্সট্রাক্টরদের ৭টি ক্যাটাগরির পদ রয়েছে। নন-ক্যাডার বিধিমালা ২০১১-এর ৪(২) বিধি অনুযায়ী কেবল যোগদানের তারিখ বিবেচনা করলে পিএসসি (BPSC) কর্তৃক মেধা তালিকায় এগিয়ে থাকা প্রার্থীরাও পেছনে পড়ে যাচ্ছেন, যা কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করছে।

  • পিএসসি-র অবস্থান : বাংলাদেশ সরকারী কর্ম কমিশন সচিবালয় (নন-ক্যাডার গোপনীয় শাখা) তাদের ইইউ নোট নং- ৮০.০০.০০০০.৩০৩(গোপনীয়).১২.০০৩.২০২৩-৬২ (তারিখ: ১৪.০৩.২০২৩) এর মাধ্যমে স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্নে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধা তালিকা প্রস্তুত করা সঠিক হবে না। তবে একই প্রশ্নে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা যারা দিয়েছেন, কেবল তাদের ক্ষেত্রেই সম্মিলিত মেধা তালিকা প্রযোজ্য।

  • জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ঐতিহাসিক নির্দেশনা : এই জটিলতা নিরসনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি-২ শাখা গত ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ (১১ ফাল্গুন, ১৪৩১) তারিখে স্মারক নং- ০৫.০০.০০০০.১৭১.০৪.০৫১.২৪-৪০ এর মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ মতামত প্রদান করে। উপ-সচিব রোকসানা রহমান স্বাক্ষরিত ওই পত্রে বলা হয়, ভিন্ন ভিন্ন মেধা তালিকা থাকায় শুধুমাত্র বয়সের জ্যেষ্ঠতা বা যোগদানের ভিত্তিতে সমন্বিত জ্যেষ্ঠতা করা সমীচীন হবে না। এতে ক্যাটাগরি ভিত্তিক কর্মচারীদের পারস্পরিক জ্যেষ্ঠতা বিনষ্ট হবে।

জনপ্রশাসনের ফর্মুলা: জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সমাধান হিসেবে জানায়, প্রতিটি ক্যাটাগরি হতে মেধাক্রম অনুযায়ী ১ম স্থানে অবস্থানকারীদের নিয়ে একটি গুচ্ছ (Cluster) করে তাদের মধ্য হতে বয়সের জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে সমন্বিত জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করতে হবে। একইভাবে ২য়, ৩য় বা পরবর্তী can-অবস্থানকারীদের নিয়ে পর্যায়ক্রমে গুচ্ছ তৈরি করে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করাই সমীচীন হবে।

অভিজ্ঞ মহলের মতামত ও সমাধানের পথ

প্রশাসনের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের মতে, বিধিমালা ২০১১-এর কোনো সুস্পষ্ট ও সর্বজনীন সংশোধনী বা গেজেট না হওয়ায় বিভিন্ন দপ্তর নিজেদের মতো করে জ্যেষ্টতা নির্ধারণ করছে, যার ফলে মাঠ পর্যায়ে তীব্র বৈষম্য তৈরি হচ্ছে এবং আদালতে মামলার সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য দুটি পদক্ষেপ জরুরি:

১. নন-ক্যাডার বিধিমালা, ২০১১-এর দ্রুত সংশোধন: বিধিমালার ৪(২) উপ-বিধিতে থাকা ‘সংশ্লিষ্ট শ্রেণী’-র পরিবর্তে ‘সংশ্লিষ্ট গ্রেড বা সমমানের পদগুচ্ছ’ শব্দস্থাপন করে বর্তমান গ্রেড ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা।

২. জনপ্রশাসনের স্পষ্টীকরণ পরিপত্র: সামগ্রিক নন-ক্যাডার কর্মচারীদের জন্য একটি সার্বজনীন স্পষ্টীকরণ পরিপত্র জারি করা, যেখানে ভিন্ন ভিন্ন গ্রেড থেকে একটি সাধারণ উচ্চতর গ্রেডে পদোন্নতির ক্ষেত্রে ফিডার পদ, শিক্ষাগত যোগ্যতা, মেধা তালিকা এবং যোগদানের তারিখের একটি সুষম ও গাণিতিক অনুপাত (Weightage) নির্ধারণ করে দেওয়া থাকবে।

ততদিন পর্যন্ত, এই সমন্বিত জ্যেষ্ঠতার গোলকধাঁধায় পড়ে হাজারো নন-ক্যাডার কর্মচারীর পদোন্নতি ঝুলে থাকবে এবং দাপ্তরিক গড়মিল বাড়তেই থাকবে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সোর্স

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *