দ্রুত ৯ম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের দাবি জানালো জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)
বাংলাদেশে সরকারি ও আধা-সরকারি বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত প্রায় ২৩ লক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারীর জীবনমান বিবেচনায় দ্রুত ৯ম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। বুধবার (১ এপ্রিল) দলের শিক্ষা ও গবেষণা সেল থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই দাবি জানানো হয়।
দীর্ঘ ১১ বছরের বঞ্চনা ও মূল্যস্ফীতি
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বশেষ বেতন স্কেল (৮ম পে-স্কেল) বাস্তবায়ন হয়েছিল ২০১৫ সালে। দীর্ঘ ১১ বছর পার হলেও নতুন কোনো পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়নি। অথচ গত এক দশকে দেশে ৫০ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতি হয়েছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় পূর্বের বেতন কাঠামো দিয়ে জীবন ধারণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
নবম বেতন কমিশনের প্রস্তাব ও স্থবিরতা
এনসিপি জানায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় সরকারি চাকুরিজীবীদের দাবির প্রেক্ষিতে একটি নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করা হয়েছিল। উক্ত কমিশন অংশীজনদের সাথে প্রায় ১৮টি সভা ও মতবিনিময় শেষে গত ২১ জানুয়ারি তাদের চূড়ান্ত প্রস্তাব প্রদান করে। তবে আড়াই মাস পার হলেও সেই প্রস্তাবনা এখনো বাস্তবায়ন না হওয়াকে ‘অপ্রত্যাশিত’ বলে অভিহিত করেছে দলটি।
জাতীয় সংসদে দাবি উত্থাপন
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, সরকারি চাকুরিজীবীদের এই ন্যায্য দাবি আদায়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি শুরু থেকেই সোচ্চার রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় দলের দক্ষিণ অঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য আজ মহান জাতীয় সংসদে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি উত্থাপন করে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান
সাধারণত প্রতি ৫ থেকে ৬ বছর অন্তর বাজারমূল্যের সাথে সমন্বয় করে বেতন কাঠামো সংস্কার করা হলেও দীর্ঘ ১১ বছর পর গৃহীত উদ্যোগ বাস্তবায়ন না হওয়া কাম্য নয় বলে মন্তব্য করেছে এনসিপি। বর্তমান প্রেক্ষাপট ও অর্থনৈতিক সংকট বিবেচনায় নিয়ে অতি দ্রুত ৯ম পে-স্কেল কার্যকর করতে সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন দলের পক্ষে স্বাক্ষরকারী ফয়সাল মাহমুদ শান্ত (যুগ্ম সদস্য সচিব এবং শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক)।
কেন বেতন বৃদ্ধি জরুরি হয়ে পড়েছে?
বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে সরকারি ও আধা-সরকারি চাকুরিজীবীদের জন্য বেতন বৃদ্ধি কেন জরুরি হয়ে পড়েছে, তার পেছনে কয়েকটি জোরালো কারণ রয়েছে:
১. আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি
বিগত এক দশকে বাংলাদেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে প্রতিটি মৌলিক পণ্যের দাম বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় নির্দিষ্ট বেতনে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত দশকে মুদ্রাস্ফীতি ৫০ শতাংশের বেশি হয়েছে, যা সাধারণ কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে।
২. জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি
বাড়ি ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, যাতায়াত খরচ এবং শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় বিগত কয়েক বছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বর্তমান বেতন কাঠামোটি ২০১৫ সালের বাজারমূল্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা ২০২৬ সালের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে একেবারেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
৩. দীর্ঘ ১১ বছরের ব্যবধান
সাধারণত প্রতি ৫ থেকে ৬ বছর অন্তর বেতন কাঠামো সংস্কার করার কথা থাকলেও, সর্বশেষ ৮ম পে-স্কেল ঘোষণার পর ১১ বছর পার হয়ে গেছে। এই দীর্ঘ সময়ে মানুষের জীবনযাত্রার মান ও চাহিদায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে, যা মেটাতে নতুন পে-স্কেল অপরিহার্য।
৪. নবম বেতন কমিশনের প্রস্তাবনা
ইতিমধ্যেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক গঠিত নবম বেতন কমিশন তাদের সুপারিশ জমা দিয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এই প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন না হওয়ায় কর্মচারীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে, যা তাদের কর্মস্পৃহা কমিয়ে দিতে পারে।
৫. সামাজিক ও মানসিক নিরাপত্তা
বেতন ও বাজারমূল্যের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে চাকুরিজীবীরা আর্থিক সংকটে ভোগেন, যা অনেক সময় দুর্নীতির পথ প্রশস্ত করে। একটি সম্মানজনক বেতন কাঠামো কর্মচারীদের সততা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং তাদের সামাজিক মর্যাদা রক্ষা করে।
সার্বিকভাবে, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত সরকারি কর্মচারীদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠতে দ্রুত ৯ম পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা সময়ের দাবি।



