নবম পে-স্কেলে বাড়িভাড়া ও নববর্ষ ভাতা কমছে, তবুও টাকার অঙ্কে বাড়তে পারে সুবিধা
নবম জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ ঘিরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে মূল বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি বিভিন্ন ভাতা পুনর্নির্ধারণ নিয়ে। নতুন কাঠামোয় একদিকে গ্রেডভেদে মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে বাড়িভাড়া ও বাংলা নববর্ষ ভাতার মতো কয়েকটি সুবিধার হার শতাংশের হিসাবে কমানো হয়েছে।
বিশেষ করে সিটি করপোরেশন ও সাভারের বাইরে কর্মরত সরকারি চাকরিজীবীদের বাড়িভাড়া ভাতার হার বিদ্যমান ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ থেকে ৪৫ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে। ফলে শতাংশের হিসাবে বাড়িভাড়া কমলেও মূল বেতন বড় আকারে বাড়ায় বাস্তবে মাসিক বাড়িভাড়ার টাকার অঙ্ক আগের তুলনায় বাড়তে পারে।
তিন ধরনের এলাকায় বাড়িভাড়ার নতুন হার
নতুন বেতন কাঠামোয় বাড়িভাড়া ভাতাকে মূল বেতনের নির্দিষ্ট শতাংশ হিসেবে পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদ্যমান ও নতুন হারের তুলনা করলে চিত্রটি দাঁড়ায়—
| কর্মস্থলের এলাকা | বর্তমান বাড়িভাড়া | নতুন কাঠামোর হার | ঢাকা সিটি করপোরেশন | ৫০%–৬৫% | ৪০%–৬০% | অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও সাভার | ৪০%–৫৫% | ৩০%–৫০% | সিটি করপোরেশন ও সাভারের বাইরে | ৩৫%–৫০% | ২৫%–৪৫% |
|---|
অর্থাৎ প্রতিটি শ্রেণির এলাকাতেই শতাংশের হিসাবে বাড়িভাড়ার হার কমানো হয়েছে। ঢাকায় সর্বনিম্ন হার ৫০ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ, অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও সাভারে ৪০ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশন ও সাভারের বাইরের এলাকায় ৩৫ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব রয়েছে।
হার কমলেও কেন বাড়তে পারে বাড়িভাড়ার টাকা?
এখানেই নতুন পে-স্কেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি রয়েছে। বাড়িভাড়া নির্ধারিত হয় মূল বেতনের শতাংশ হিসেবে। তাই শুধু শতাংশের হার দেখলে মনে হতে পারে সরকারি চাকরিজীবীদের বাড়িভাড়া কমে যাচ্ছে। কিন্তু মূল বেতন যদি একই সঙ্গে বড় পরিমাণে বাড়ে, তাহলে কম শতাংশ দিয়েও আগের চেয়ে বেশি টাকা পাওয়া সম্ভব।
উদাহরণ হিসেবে সিটি করপোরেশন ও সাভারের বাইরের এলাকার সর্বনিম্ন হার ধরা যাক।
বর্তমান কাঠামোয় কারও মূল বেতন যদি ৮ হাজার ২৫০ টাকা হয় এবং তিনি ৩৫ শতাংশ বাড়িভাড়া পান, তাহলে বাড়িভাড়া দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার ৮৮৮ টাকা।
অন্যদিকে নতুন কাঠামোয় একই উদাহরণে মূল বেতন ২০ হাজার টাকা হলে ২৫ শতাংশ বাড়িভাড়া হবে ৫ হাজার টাকা।
অর্থাৎ—
পুরোনো হিসাবে:
৮,২৫০ × ৩৫% ≈ ২,৮৮৮ টাকা
নতুন হিসাবে:
২০,০০০ × ২৫% = ৫,০০০ টাকা
এখানে শতাংশ কমেছে ১০ শতাংশীয় পয়েন্ট, কিন্তু মূল বেতন বৃদ্ধির কারণে বাড়িভাড়ার টাকার অঙ্ক প্রায় ২ হাজার ১১২ টাকা বেশি হচ্ছে।
তবে এটি একটি উদাহরণমাত্র। বাস্তবে প্রত্যেক কর্মচারীর বাড়িভাড়া নির্ভর করবে নতুন কাঠামোয় তার নির্ধারিত মূল বেতন, গ্রেড এবং কর্মস্থলের এলাকার ওপর।
মূল বেতন বৃদ্ধিই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু
নতুন জাতীয় বেতনস্কেলে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সিদ্ধান্তের কথা জানা গেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রেডভেদে মূল বেতন ১০০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করার কাঠামো রয়েছে।
ফলে বাড়িভাড়ার শতাংশ কমানোর প্রভাব বিশ্লেষণ করতে হলে শুধু পুরোনো ও নতুন শতাংশ তুলনা করলে হবে না। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গ্রেডের পুরোনো ও নতুন মূল বেতন হিসাব করতে হবে।
অর্থাৎ নতুন কাঠামোর বাস্তব প্রভাব হবে—
নতুন মূল বেতন × নতুন বাড়িভাড়ার হার = নতুন বাড়িভাড়া ভাতা।
এই কারণে কোনো কোনো গ্রেডে হার কমলেও বাড়িভাড়ার মোট টাকা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
বাংলা নববর্ষ ভাতাতেও পরিবর্তন
বাড়িভাড়ার পাশাপাশি বাংলা নববর্ষ ভাতার হারও কমানো হয়েছে। বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীরা মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বাংলা নববর্ষ বা বৈশাখী ভাতা পেয়ে থাকেন। নতুন জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এ এই হার কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। ১৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রজ্ঞাপন উদ্ধৃত করে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে সরাসরি ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমানো হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে, কারও মূল বেতন যদি ২০ হাজার টাকা হয়—
বর্তমান ২০% হারে:
২০,০০০ × ২০% = ৪,০০০ টাকা
নতুন ১৫% হারে:
২০,০০০ × ১৫% = ৩,০০০ টাকা
এখানে একই মূল বেতন ধরে হিসাব করলে নববর্ষ ভাতা ১ হাজার টাকা কমে যায়।
তবে নতুন পে-স্কেলে মূল বেতন বৃদ্ধি পাওয়ায় বাস্তবে নতুন বেতনের ওপর ১৫ শতাংশ হিসাব করলে ভাতার টাকার অঙ্ক আগের প্রাপ্ত ভাতার তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে বেশি বা কাছাকাছি হতে পারে। তাই পুরোনো মূল বেতন দিয়ে নতুন ভাতার সরাসরি তুলনা না করে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর নতুন নির্ধারিত মূল বেতন দিয়ে হিসাব করতে হবে।
শুধু ভাতা কমানো হয়নি, কিছু ভাতাও বাড়ছে
নতুন বেতন কাঠামোয় সব ভাতা কমানো হয়নি। বরং কয়েকটি ভাতা বাড়ানোর উদ্যোগও রয়েছে।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী যাতায়াত ভাতা ৩০০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা, টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা এবং ধোলাই ভাতা ১০০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা করার কথা বলা হয়েছে। চিকিৎসা ভাতাও বয়সভেদে বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। ৫০ বছর পর্যন্ত কর্মরতদের জন্য মাসিক চিকিৎসা ভাতা ৩ হাজার টাকা এবং ৫০ বছরের বেশি থেকে ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত ৪ হাজার টাকা করার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রথমবারের মতো ৬ষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত কর্মীদের জন্য মাসিক মোবাইল ভাতার ব্যবস্থার কথাও প্রতিবেদনে এসেছে।
অর্থাৎ নতুন পে-স্কেলে ভাতার ক্ষেত্রে একদিকে কমানো হয়েছে, অন্যদিকে কয়েকটি ভাতা বাড়ানো হয়েছে। ফলে সামগ্রিক আর্থিক সুবিধা বুঝতে হলে পুরো বেতন কাঠামো একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
নববর্ষ ভাতা কমানোর প্রভাব কী?
বাংলা নববর্ষ ভাতা মূল বেতনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হওয়ায় নতুন মূল বেতন যত বেশি হবে, ১৫ শতাংশ হিসাবেও প্রাপ্ত অর্থ তত বেশি হবে।
ধরা যাক, কোনো কর্মচারীর পুরোনো মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং নতুন মূল বেতন ৪০ হাজার টাকা হয়েছে।
পুরোনো হিসাবে ২০ শতাংশ নববর্ষ ভাতা ছিল—
২০,০০০ × ২০% = ৪,০০০ টাকা
নতুন হিসাবে ১৫ শতাংশ হলে—
৪০,০০০ × ১৫% = ৬,০০০ টাকা
অর্থাৎ হার ২০ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে নামলেও মূল বেতন দ্বিগুণ হওয়ার কারণে ভাতার প্রকৃত টাকার অঙ্ক ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকায় উঠতে পারে।
এ কারণেই নতুন পে-স্কেলের ভাতা বিশ্লেষণে শুধু শতাংশ কমেছে কি না, সেটি দেখার পাশাপাশি মূল বেতন কতটা বেড়েছে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
নতুন কাঠামোর মূল বার্তা
নবম জাতীয় পে-স্কেলের ভাতা কাঠামোর পরিবর্তনকে মোটামুটি তিনটি দিক থেকে দেখা যায়।
প্রথমত, মূল বেতনকে বড় ভিত্তি হিসেবে পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, বাড়িভাড়ার মতো কিছু শতাংশভিত্তিক ভাতার হার কমানো হয়েছে।
তৃতীয়ত, চিকিৎসা, যাতায়াত, টিফিন, ধোলাই ও মোবাইল ভাতার মতো কিছু সুবিধা বাড়ানো বা নতুন করে যুক্ত করার উদ্যোগ রয়েছে। একই সঙ্গে বাংলা নববর্ষ ভাতার হার ২০ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে।
ফলে নতুন কাঠামোয় কোনো কর্মচারী প্রকৃতপক্ষে কত টাকা বেশি বা কম পাবেন, তা জানতে হলে শুধু একটি ভাতার হার দেখা যথেষ্ট নয়। তাকে নতুন মূল বেতন, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, মোবাইল, যাতায়াত, টিফিন, নববর্ষ ও অন্যান্য প্রযোজ্য ভাতা—সবগুলো একসঙ্গে হিসাব করতে হবে।
কর্মচারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লে শতাংশের হার কমে যাওয়ার পরও বাড়িভাড়া ও অন্যান্য শতাংশভিত্তিক সুবিধার টাকার অঙ্ক বাড়তে পারে। আবার কোনো নির্দিষ্ট গ্রেডে নতুন মূল বেতন বৃদ্ধির তুলনায় ভাতার হার কমার প্রভাব বেশি হলে সেই ভাতার পৃথক আর্থিক সুবিধা কমও হতে পারে।
তাই ‘বাড়িভাড়া কমেছে’ কিংবা ‘বৈশাখী ভাতা কমেছে’—শুধু এই দুটি তথ্যের ভিত্তিতে একজন সরকারি কর্মচারীর মোট বেতন কমে যাবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
বরং নতুন পে-স্কেলে প্রত্যেক গ্রেডের পুরোনো মোট বেতন বনাম নতুন মোট বেতন এবং ভাতার হার বনাম প্রকৃত টাকার অঙ্ক পাশাপাশি তুলনা করলেই পরিবর্তনের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।
সারসংক্ষেপ
নবম জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এ সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামোয় বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। সিটি করপোরেশন ও সাভারের বাইরের এলাকায় বাড়িভাড়া ভাতার হার ৩৫–৫০ শতাংশ থেকে ২৫–৪৫ শতাংশে নামানোর কথা বলা হয়েছে। ঢাকা ও অন্যান্য সিটি করপোরেশন এবং সাভার এলাকার হারও আগের তুলনায় কমানো হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলা নববর্ষ ভাতা ২০ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে।
তবে মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর কারণে শতাংশের হার কমলেও অনেক ক্ষেত্রে বাড়িভাড়া ও অন্যান্য শতাংশভিত্তিক ভাতার প্রকৃত টাকার অঙ্ক আগের তুলনায় বাড়তে পারে। তাই নতুন পে-স্কেলের সুবিধা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শতাংশ নয়, বরং নতুন মূল বেতনসহ মোট প্রাপ্য বেতন-ভাতার হিসাবই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।



