বিদেশি বেসরকারি চাকরিতে লিয়েন সুবিধা: কঠোর শর্তের পাশাপাশি রয়েছে সরকারি কোষাগারে চাঁদা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা
সরকারি কর্মচারীদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অভিজ্ঞতা অর্জনের লক্ষ্যে বিদেশি সুপ্রতিষ্ঠিত বেসরকারি বা আন্তর্জাতিক সংস্থায় চাকরির জন্য ‘লিয়েন’ (Lien) সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে ‘সরকারি কর্মচারী লিয়েন বিধিমালা, ২০২১’ অনুযায়ী এই সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে রয়েছে বেশ কিছু কঠোর শর্ত ও আইনি বাধ্যবাধকতা। একই সঙ্গে লিয়েনকালীন সময়ে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিজের জ্যেষ্ঠতা ও পেনশন সুবিধা বহাল রাখতে সরকারি কোষাগারে নিয়মিত নির্দিষ্ট হারে চাঁদা (কন্ট্রিবিউশন) জমা দিতে হয়।
সম্প্রতি লিয়েন সংক্রান্ত বিভিন্ন বিধিমালা বিশ্লেষণ করে এর শর্ত, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং সরকারি কোষাগারে টাকা জমা দেওয়ার নিয়মাবলী স্পষ্ট করা হয়েছে।
লিয়েনে যাওয়ার মূল শর্তাবলী:
বিধিমালা অনুযায়ী, যেকোনো সরকারি কর্মচারী চাইলেই লিয়েন সুবিধা পাবেন না। এর জন্য প্রধান শর্ত হলো—প্রজাতন্ত্রের কর্মে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর চাকরি অবশ্যই স্থায়ী হতে হবে এবং স্থায়ী পদে যোগদানের পর ন্যূনতম ৫ (পাঁচ) বছরের বাস্তব চাকুরিকাল পূর্ণ হতে হবে।
সমগ্র চাকরিবাজারে একজন কর্মচারী বিচ্ছিন্ন বা ধারাবাহিকভাবে সর্বোচ্চ ৫ বছর পর্যন্ত লিয়েন সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। তবে বিশেষ ও যৌক্তিক কারণে সরকারের পূর্বানুমতি সাপেক্ষে এটি আরও ২ বছর বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ৭ বছর করা সম্ভব।
লিয়েন অনুমোদনের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় শর্ত হলো—আবেদনকারী কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় মামলা প্রক্রিয়াধীন বা চলমান থাকা চলবে না এবং কোনো ফৌজদারী মামলা দায়ের হওয়া থাকবে না। এছাড়া, বৈদেশিক প্রশিক্ষণ, উচ্চশিক্ষার প্রেষণ (Deputation), শিক্ষাছুটি কিংবা বহিঃবাংলাদেশ ছুটির ধারাবাহিকতায় সরাসরি লিয়েন মঞ্জুর বা সংরক্ষণ করা যায় না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সরকারি আদেশ (G.O.) জারি হওয়ার আগে কোনোভাবেই কর্মস্থল ত্যাগ করা বা বিদেশি চাকরিতে যোগ দেওয়া যাবে না; কারণ লিয়েন কখনো ভূতাপেক্ষভাবে (আগের তারিখ দিয়ে) মঞ্জুর হয় না।
লিয়েন থাকাকালীন সময়ে কর্মচারী বাংলাদেশ সরকার থেকে কোনো বেতন, ভাতা বা ছুটি পাবেন না। তবে এই সময়কালটি তার চাকরির জ্যেষ্ঠতা (Seniority), বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি (Increment) এবং অবসর ভাতার (Pension) জন্য গণনাযোগ্য হবে।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র:
লিয়েন সুবিধার আবেদনটি নিয়ন্ত্রণকারী অফিসের মাধ্যমে প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হয়। আবেদনের সাথে সাধারণত নিম্নলিখিত কাগজপত্রগুলো জমা দিতে হয়: ১. নির্ধারিত ফরমে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে (Through Proper Channel) আবেদনপত্র। ২. নিয়োগকারী বিদেশি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মূল নিয়োগপত্র (Offer/Appointment Letter), যেখানে পদের নাম, চাকরির মেয়াদ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার স্পষ্ট বিবরণ থাকবে। ৩. চাকরি স্থায়ীকরণ ও সন্তোষজনক সেবার অফিস আদেশ। ৪. কোনো বিভাগীয় মামলা বা অডিট আপত্তি নেই মর্মে হালনাগাদ প্রত্যয়নপত্র। ৫. সার্ভিস বুকের প্রথম অংশের কপি বা চাকুরির বিবরণী (Service Statement) এবং হালনাগাদ পাসপোর্টের অনুলিপি।
সরকারি কোষাগারে কন্ট্রিবিউশন ও জমার নিয়ম:
লিয়েন থাকাকালীন সরকারি চাকরির ধারাবাহিকতা ও অবসরোত্তর সুবিধা (পেনশন) অক্ষুণ্ণ রাখতে কর্মচারীকে নিয়মিত সরকারি কোষাগারে নির্দিষ্ট কিছু চাঁদা বা কন্ট্রিবিউশন পরিশোধ করতে হয়।
এর মধ্যে রয়েছে—মূল বেতনের ওপর নির্ধারিত হারে পেনশন কন্ট্রিবিউশন ও লিভ স্যালারি কন্ট্রিবিউশন। এছাড়া সাধারণ ভবিষ্যৎ তহবিল বা জিপিএফ (GPF) চাঁদা, কল্যাণ তহবিল ও যৌথবীমা প্রিমিয়ামের নির্ধারিত অংশও পরিশোধ করতে হয়। কর্মচারীর নামে কোনো সরকারি ঋণ (যেমন: গৃহনির্মাণ বা মোটরযান ঋণ) থাকলে লিয়েনকালীন সময়েও তার মাসিক কিস্তি নিয়মিত পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
এই সমস্ত চাঁদা ও কন্ট্রিবিউশন সরাসরি ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে অথবা বর্তমানে প্রচলিত iBAS++ (Integrated Budget and Accounting System) চালানের মাধ্যমে নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক কোড উল্লেখ করে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হয়। বিদেশে অবস্থানকালে কর্মচারীরা বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত চ্যানেলের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রায় অথবা দেশে তাদের মনোনীত প্রতিনিধি বা পাওয়ার অব অ্যাটর্নি প্রাপকের মাধ্যমে এই চালান জমা দিতে পারবেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, লিয়েন শেষে পুনরায় কর্মে যোগদানের সময় এই জমাকৃত চালানের কপিগুলো হিসাবরক্ষণ অফিসে (CAO/DAO) দাখিল করে সার্ভিস বুকে অন্তর্ভুক্ত করতে হয়। লিয়েনের মেয়াদ শেষ হওয়ার কমপক্ষে ৪ সপ্তাহ আগে প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়কে যোগদানের বিষয়ে অবহিত না করলে অননুমোদিত অনুপস্থিতির দায়ে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণেরও বিধান রয়েছে।



