জুনের মধ্যেই নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট, জুলাই থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তুতি
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, নতুন পে-স্কেল কার্যকর করতে চলতি জুন মাসের মধ্যেই গেজেট প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে। সরকারের লক্ষ্য হলো ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরু থেকে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য আসন্ন জাতীয় বাজেটে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ থোক বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে পে-স্কেল কমিশনের পূর্ণাঙ্গ সুপারিশ একযোগে বাস্তবায়ন করতে এক লাখ কোটি টাকারও বেশি অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। এ কারণে সরকার আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বেতনের কাঠামোয় বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব
প্রস্তাবিত নবম জাতীয় পে-স্কেল অনুযায়ী সরকারি চাকরিজীবীদের বর্তমান ২০টি গ্রেড বহাল থাকবে। তবে বেতন কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
প্রস্তাবে সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন বর্তমান ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রথম গ্রেডের সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এতে নিম্ন ও উচ্চ উভয় পর্যায়ের সরকারি কর্মচারীদের বেতনে বড় ধরনের বৃদ্ধি ঘটবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা
সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নতুন পে-স্কেল একবারে বাস্তবায়ন না করে তিন ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে আগামী ১ জুলাই থেকে মূল বেতনের প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি কার্যকর হতে পারে। এরপর পরবর্তী দুই বছরের মধ্যে বাকি অংশ সমন্বয়ের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্পন্ন করা হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, রাজস্ব আদায় এবং সরকারি ব্যয়ের চাপ বিবেচনায় নিয়ে এই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।
পেনশনভোগীরাও পাবেন সুবিধা
নতুন পে-স্কেলের আওতায় প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগীকেও অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে যেসব অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী বর্তমানে তুলনামূলক কম পেনশন পাচ্ছেন, তাদের জন্য পেনশন বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে পেনশন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুযোগ রাখা হতে পারে। ফলে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবীদের একটি বড় অংশ সরাসরি উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কর্মচারীদের একাংশের অসন্তোষ
তবে সরকারের ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনায় সন্তুষ্ট নন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ। বিভিন্ন কর্মচারী সংগঠনের নেতারা বলছেন, বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ধাপে ধাপে বেতন বৃদ্ধি বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তাদের দাবি, নতুন পে-স্কেল এক ধাপেই বাস্তবায়ন করতে হবে এবং শতভাগ বেতন বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে। কর্মচারী সংগঠনগুলোর মতে, দীর্ঘদিন ধরে বেতন কাঠামো পুনর্বিবেচনার দাবি থাকলেও বাস্তবায়নে বিলম্ব হওয়ায় সরকারি চাকরিজীবীদের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়িত হলে সরকারি চাকরিজীবী ও পেনশনভোগীদের আয় বাড়বে, যা বাজারে ভোগব্যয় বৃদ্ধি করতে পারে। তবে একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব ও ব্যয় ব্যবস্থাপনার ওপর অতিরিক্ত চাপও তৈরি হবে।
এ কারণে সরকার একদিকে সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান উন্নয়নের উদ্যোগ নিচ্ছে, অন্যদিকে সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
সবকিছু ঠিক থাকলে জুনের মধ্যেই নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ হবে এবং আগামী ১ জুলাই থেকে এর প্রথম ধাপের বাস্তবায়ন শুরু হতে পারে। এতে দেশের লাখো সরকারি চাকরিজীবী ও পেনশনভোগীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটবে।



