শতাংশের মারপ্যাঁচে নতুন বেতন কাঠামো: কর্মচারীদের ক্ষোভ, আড়ালে বাড়ছে দ্বিগুণ বৈষম্য
সরকারি চাকরিতে নতুন পে-স্কেল বা বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা সাধারণ কর্মচারীদের মাঝে আনন্দের বার্তা নিয়ে আসার কথা থাকলেও, ভেতরের হিসাব-নিকাশে দেখা দিয়েছে চরম অসন্তোষ ও বৈষম্যের চিত্র। আপাতদৃষ্টিতে সবার জন্য সমান হারে বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়া হলেও, পূর্বের বিশেষ সুবিধা বাতিলের মারপ্যাঁচে কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের প্রকৃত প্রাপ্তির ব্যবধান আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, এই নীতি কার্যকর হলে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা এক প্রকার ‘দ্বিগুণ বৈষম্যের’ শিকার হবেন।
১. শতাংশের মারপ্যাঁচ: সমান ঘোষণার আড়ালে ভিন্ন হিসাব
প্রস্তাবিত বা আলোচিত নতুন বেতন নীতিতে যদি পূর্বের বিশেষ সুবিধা (যেমন: কর্মচারীদের ১৫% এবং কর্মকর্তাদের ১০% বিশেষ ভাতা) সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে সামগ্রিকভাবে ৫০% বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়া হয়, তবে কাগজ-কলমের এই ৫০% বৃদ্ধি সবার জন্য সমান সুফল আনছে না। পূর্বের সুবিধা কেটে নেওয়ার পর প্রকৃত (Net) বৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে নিম্নরূপ:
১০-২০ গ্রেডের কর্মচারী: 50% – 15% = 35% (প্রকৃত বৃদ্ধি)
১-৯ গ্রেডের কর্মকর্তা: 50% – 10% = 40% (প্রকৃত বৃদ্ধি)
বিশ্লেষণে দেখা যায়, পূর্বের বিশেষ সুবিধা প্রত্যাহারের কারণে কর্মকর্তাদের তুলনায় কর্মচারীদের প্রকৃত বেতন বৃদ্ধির হার সরাসরি ৫% কমে যাচ্ছে। ফলে ঢালাওভাবে ৫০% বৃদ্ধির যে প্রচার চালানো হচ্ছে, তা আদতে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য এক ধরনের শুভঙ্করের ফাঁকি।
২. মূল বেতনের বিশাল ব্যবধান: টাকার অঙ্কে দ্বিগুণ বৈষম্য
শতাংশের এই বৈষম্যটি যখন মূল বেতনের (Basic Salary) ওপর প্রয়োগ করা হয়, তখন টাকার অঙ্কের ব্যবধানটি আকাশচুম্বী রূপ নেয়।
| পদমর্যাদা | মূল বেতন (কাল্পনিক) | প্রকৃত বৃদ্ধির হার (%) | টাকার অঙ্কে বৃদ্ধি (আনুমানিক) |
| ১-৯ গ্রেডের কর্মকর্তা | উচ্চ (যেমন: ৫০,০০০ টাকা) | ৪০% | ২০,০০০ টাকা |
| ১০-২০ গ্রেডের কর্মচারী | নিম্ন (যেমন: ১৫,০০০ টাকা) | ৩৫% | ৫,২৫০ টাকা |
কর্মকর্তাদের মূল বেতন এমনিতেই কর্মচারীদের তুলনায় অনেক বেশি। একজন কর্মকর্তার উচ্চ মূল বেতনের ওপর ৪০% প্রকৃত বৃদ্ধি মানে টাকার অঙ্কে বিশাল অঙ্কের প্রাপ্তি। অন্যদিকে, একজন কর্মচারীর কম মূল বেতনের ওপর মাত্র ৩৫% প্রকৃত বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের পকেটে ঢুকবে একেবারেই সীমিত অর্থ।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে: “বিশেষ সুবিধা প্রত্যাহারের এই নীতি কার্যকর হলে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা দ্বিগুণ বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। প্রথমত, তারা শতাংশের হারে কর্মকর্তাদের চেয়ে ৫% কম পাচ্ছেন; দ্বিতীয়ত, কম মূল বেতনের কারণে টাকার অঙ্কেও তারা বহুদূর পিছিয়ে পড়ছেন।”
৩. বাজারদরের বাজারে পিষ্ট নিম্ন আয়ের কর্মচারীরা
বেতন বৃদ্ধির এই অসম নীতি সবচেয়ে বড় আঘাত হানবে কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মানের ওপর। বাজারের মূল্যস্ফীতি বা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম যখন বাড়ে, তখন তা কর্মকর্তা বা কর্মচারী ভেদে আলাদা হয় না। চাল, ডাল, তেল, ওষুধ বা যাতায়াত খরচ সবার জন্যই সমান হারে বাড়ে।
একজন কর্মকর্তার জন্য যে চালের কেজি ৭০ টাকা, একজন কর্মচারীর জন্যও তা-ই। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের প্রকৃত বৃদ্ধির হার (৩৫%) কর্মকর্তাদের (৪০%) চেয়ে কম হওয়া মানে— প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকা জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে টিকে থাকার লড়াইয়ে কর্মচারীদের আরও অসহায় করে তোলা।
ক্ষোভ ও পুনর্বিবেচনার দাবি
সাধারণ কর্মচারীদের পক্ষ থেকে দাবি উঠেছে, নতুন পে-স্কেল বা বেতন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে যেন এই ধরনের গাণিতিক বৈষম্য দূর করা হয়। নিম্ন আয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিশেষ সুবিধা বহাল রেখে কিংবা গ্রেডভিত্তিক আনুপাতিক হারে বেতন বৃদ্ধি না করলে এই বৈষম্য দূর করা সম্ভব নয়। অন্যথায়, এই বেতন বৃদ্ধি নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য স্বস্তির বদলে অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।



