নতুন পে-স্কেলে শেষ ধাপের কর্মচারীদের ইনক্রিমেন্ট: একটি বিশদ বিশ্লেষণ
দীর্ঘ ১১ বছর পর দেশে নতুন বেতন কাঠামো বা পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা আসার পর সারা দেশের সরকারি কর্মচারীদের মাঝে যেমন আনন্দ বিরাজ করছে, তেমনি কিছু কারিগরি বিষয়ে ধোঁয়াশাও তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যারা বর্তমান বেতন কাঠামোর (২০১৫) শেষ ধাপে বা সিলিংয়ে পৌঁছে গেছেন, নতুন পে-স্কেলে তাদের বেতন নির্ধারণ (ফিক্সেশন) এবং ১ জুলাইয়ের ইনক্রিমেন্ট কীভাবে হিসাব করা হবে—তা নিয়ে চলছে নানা চুলচেরা বিশ্লেষণ।
১. ধারণা বনাম বাস্তব বিধিমালা: ৩০ জুনের বেসিক বনাম ১ জুলাইয়ের ইনক্রিমেন্ট
সরকারি চাকরিজীবীদের একটি বড় অংশের ধারণা, ৩০ জুনের পর পুরনো স্কেলে ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার সুযোগ থাকে না এবং ৩০ জুনের বেসিক ধরেই নতুন স্কেলের ‘পে-ফিক্সেশন’ বা বেতন নির্ধারণ হবে। এই ধারণাটি আংশিক সত্য। নিয়ম অনুযায়ী, নতুন পে-স্কেল যখনই কার্যকর হোক না কেন, তা সাধারণত পূর্ববর্তী ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হয়।
যদি নতুন পে-স্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়, তবে চাকরিজীবীরা ওই দিনই নতুন স্কেলে প্রবেশ করবেন। ফলে পুরনো স্কেলের শেষ ধাপে আটকে থাকা কর্মচারীরা নতুন স্কেলের কারণে একটি বর্ধিত ও বিস্তৃত বেতনসীমা (Slab) পাবেন। অর্থাৎ, তাদের বেতন আর “স্থির” বা ব্লক থাকবে না।
২. বেতন নির্ধারণে নতুন ‘ইনক্রিমেন্ট ফ্যাক্টর’ পদ্ধতি
নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং প্রশাসনিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এবারের পে-স্কেলে বেতন নির্ধারণে একটি বড় পরিবর্তন আসতে পারে, যা হলো ‘ইনক্রিমেন্ট ফ্যাক্টর পদ্ধতি’। এই পদ্ধতিতে একজন কর্মচারীর বর্তমান মূল বেতনকে তার গ্রেডের শুরুর বেসিক দিয়ে ভাগ করে একটি গুণক বা ফ্যাক্টর বের করা হয়। এরপর নতুন পে-স্কেলের প্রারম্ভিক বেতনের সাথে সেই ফ্যাক্টর গুণ করে নতুন মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়।
এর সুফল: এই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির কারণে যারা দীর্ঘ সময় একই গ্রেডে চাকরি করে শেষ ধাপে পৌঁছেছেন, তারা তাদের পুরো চাকরির অভিজ্ঞতা ও সিনিয়রটির প্রতিফলন নতুন স্কেলের উচ্চতর ধাপে দেখতে পাবেন। ফলে শেষ ধাপে থাকা কর্মচারীরা নতুন স্কেলের উচ্চতর কোনো ধাপে ফিক্সেশন পাবেন এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবেই ১ জুলাইয়ের নতুন ইনক্রিমেন্ট সুবিধা ভোগ করতে পারবেন।
৩. ইতিহাস কী বলে? (২০০৯ বনাম ২০১৫ বিধি)
সরকারি বেতন কাঠাামোর ইতিহাসে দেখা যায়:
জাতীয় বেতন স্কেল ২০০৯: এই বিধিমালায় কোনো কর্মচারী স্কেলের শেষ ধাপে পৌঁছালে তাকে পরবর্তী উচ্চতর স্কেলে বা টাইমস্কেলে বেতন দেওয়ার সুযোগ ছিল।
জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫: এই স্কেলে টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাতিল করা হয় এবং অনুচ্ছেদ ৬ অনুযায়ী, সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছানোর পর ইনক্রিমেন্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ার নিয়ম চালু হয়। ফলে অনেক কর্মচারী বিগত কয়েক বছর ধরে একই বেতনে স্থবির হয়ে আছেন।
তবে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের মূল উদ্দেশ্যই হলো বিগত বছরগুলোর বৈষম্য দূর করা। তাই নতুন স্কেলের গেজেটে এই স্থবিরতা কাটানোর স্পষ্ট নির্দেশনা থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
৪. ইবি ক্রস (EB Cross) এবং কর্মচারীদের দাবি
চাকরিজীবীদের একাংশের দাবি, যদি ২০১৫ সালের আগের নিয়ম অনুযায়ী ইবি ক্রস (Efficiency Bar Cross) বা দক্ষতা সীমা অতিক্রমের নিয়ম বহাল রাখা হতো, তবে কোনো শাস্তি ছাড়া কারও ইনক্রিমেন্ট বন্ধ হতো না। বর্তমানে কর্মচারীদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে জোরালো দাবি জানানো হচ্ছে যেন—কারও বেতন সর্বোচ্চ সিলিংয়ে পৌঁছালেও প্রতি বছর অন্তত ৩% বা ৪% হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট চালু রাখার একটি স্থায়ী রুল বা বিধি জারি করা হয়।
৫. ‘বিশেষ সুবিধা’ বা স্পেশাল ইনক্রিমেন্ট বাতিল ও নতুন পে-স্কেল
সাম্প্রতিক বাজেট ঘোষণা অনুযায়ী, ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন পে-স্কেল ধাপে ধাপে (৩টি অর্থবছরে) বাস্তবায়ন শুরু হবে। প্রথম ধাপে মূল বেতনের (Basic Pay) ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে। তবে নতুন পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার সাথে সাথেই বর্তমানে চালু থাকা ১০% থেকে ১৫% হারে সরকারি কর্মচারীদের ‘বিশেষ সুবিধা’ বা বিশেষ ইনক্রিমেন্ট বাতিল হয়ে যাবে। কারণ মূল বেতন একবারে বড় অংকে বৃদ্ধি পাওয়ায় এই অন্তর্বর্তীকালীন সুবিধাটি নতুন স্কেলের সাথে সমন্বয় করে নেওয়া হবে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও সর্বশেষ পরিস্থিতি
ইনক্রিমেন্ট কি বকেয়াসহ পাওয়া যাবে?
নতুন পে-স্কেল ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হওয়ায় কর্মচারীরা নতুন স্কেলের সুবিধা ওই তারিখ থেকেই পাবেন। তবে এটি কোনো পূর্ববর্তী সময়ের বকেয়া (Arrear) হিসেবে গণ্য হবে না, বরং ১ জুলাই থেকেই নতুন স্কেলে বেতন ও ইনক্রিমেন্ট চালু হবে।
উপসংহার:
সার্বিক তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে বলা যায়, যারা বর্তমান স্কেলের শেষ ধাপে পৌঁছে গেছেন, নতুন পে-স্কেল চালু হওয়ার পর তাদের বেতন নতুন ও বর্ধিত স্কেলের উচ্চতর ধাপে ফিক্সেশন হবে। এর ফলে তাদের ইনক্রিমেন্ট বন্ধ থাকার জটিলতা কেটে যাবে এবং ১ জুলাই থেকেই তারা নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী ইনক্রিমেন্টের আওতায় আসবেন। তবে বেতন বৃদ্ধির প্রকৃত হার, ফিক্সেশনের সুনির্দিষ্ট নিয়ম এবং সিলিং সংক্রান্ত জটিলতার স্থায়ী সমাধানের বিষয়টি পূর্ণাঙ্গ গেজেট প্রকাশিত হবার পরই ১০০% নিশ্চিত করে বলা যাবে।



