নবম পে-স্কেলে নিম্ন গ্রেডের বেতন একবারে ১০০% বাড়ানোর দাবি
নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির ধরন ও বৈষম্য কমানোর বিষয়টি। জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া মনে করেন, উচ্চ গ্রেডের তুলনায় নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের আর্থিক সংকট বেশি হওয়ায় তাদের বেতন ধাপে ধাপে না বাড়িয়ে একবারে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো প্রয়োজন। এমনকি নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন একবারে ১০০ শতাংশ বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন তিনি।
সম্প্রতি নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের খসড়া প্রস্তাবনা চূড়ান্ত করেছে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন কমিটি। প্রস্তাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়ন এবং ধাপে ধাপে ২০২৮ সালের জানুয়ারির মধ্যে পুরো কাঠামো বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বাস্তবায়নের ধাপ ও চূড়ান্ত কাঠামো সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার মন্ত্রিসভার।
নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য কেন বেশি বেতন বৃদ্ধির দাবি?
ফিরোজ মিয়ার বক্তব্যের মূল বিষয় হলো—সরকারি চাকরিতে উচ্চ গ্রেডের কর্মচারীরা মূল বেতনের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন। বিপরীতে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের আয় তুলনামূলক কম হওয়ায় মূল্যস্ফীতি, বাসাভাড়া, খাদ্যপণ্য, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে তাদের বেশি চাপের মুখে পড়তে হয়।
এ কারণে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন ধাপে ধাপে বাড়ানোর পরিবর্তে দ্রুত ও বড় পরিমাণে বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, উচ্চ গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন প্রাথমিক পর্যায়ে না বাড়ালেও বড় ধরনের সমস্যা হবে না; বরং সীমিত আয়ের কর্মচারীদের দিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলে বেতন কাঠামোর বৈষম্য কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
নবম পে-স্কেলের প্রস্তাবে বেতন কত বাড়তে পারে?
নবম জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে এর আগে জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব উঠে আসে। প্রস্তাবিত কাঠামোতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশের কথা জানানো হয়েছে।
বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডে শতাংশের হিসাবে বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি রাখার একটি প্রবণতা প্রস্তাবিত কাঠামোতে দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা করার প্রস্তাবের কথা এসেছে, যা বর্তমান মূল বেতনের তুলনায় প্রায় ১৪২ শতাংশ বৃদ্ধি। ১৭তম গ্রেডের ক্ষেত্রেও প্রায় ১৩৮ শতাংশ বৃদ্ধির হিসাব পাওয়া যাচ্ছে।
ধাপে বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা
নতুন বেতন কাঠামো একবারে কার্যকর করার পরিবর্তে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়টি বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। সাম্প্রতিক খসড়া প্রস্তাবনায় চলতি বছরের জুলাই থেকে আংশিক বাস্তবায়ন এবং ২০২৮ সালের জানুয়ারির মধ্যে পুরো পে-স্কেল বাস্তবায়নের লক্ষ্য রাখা হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত কত ধাপে এবং কোন কোন সুবিধা কখন থেকে কার্যকর হবে, তা মন্ত্রিসভা চূড়ান্ত করবে।
অন্যদিকে সচিব কমিটির সুপারিশ নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন বেতন কাঠামোয় প্রথম ধাপে মূল বেতন বাড়ানো এবং পরবর্তী পর্যায়ে বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য ভাতা কার্যকর করার প্রস্তাব রয়েছে। অর্থাৎ বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা বাস্তবায়নের সময়ও আলাদা হতে পারে।
বিচার বিভাগের বেতন কাঠামো নিয়েও জটিলতা
নবম পে-স্কেল চূড়ান্ত করার পর্যায়ে বিচার বিভাগ-সংক্রান্ত কিছু জটিলতা সামনে এসেছে। এসব বিষয় সমাধান এবং বিচার বিভাগের কর্মচারীদের জন্য বেতন কাঠামো নির্ধারণে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে। ফলে নবম পে-স্কেলের চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে আরও কিছু প্রশাসনিক ও কাঠামোগত বিষয় নিষ্পত্তি করতে হবে।
কর্মচারীদের প্রত্যাশা কোথায়?
২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো হয়নি। এ সময়ে নিয়মিত বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি হলেও মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন পে-স্কেলের প্রত্যাশা আরও জোরালো হয়েছে।
বিশেষ করে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের একটি বড় অংশ মনে করেন, শুধু শতাংশের হিসাবে বেতন বাড়ানো নয়—মূল বেতন, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত, টিফিন ও অন্যান্য ভাতার বাস্তব মূল্য বিবেচনায় নিয়ে নতুন কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের জন্য দ্রুত ও তুলনামূলক বেশি সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি সেই আলোচনাকেই আরও জোরালো করছে।
এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মন্ত্রিসভার
সব মিলিয়ে নবম পে-স্কেলের আলোচনায় এখন দুটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে—একদিকে দ্রুত বাস্তবায়ন, অন্যদিকে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য তুলনামূলক বেশি আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করা। ফিরোজ মিয়ার ১০০ শতাংশ এককালীন বেতন বৃদ্ধির বক্তব্য মূলত নিম্ন আয়ের সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক বাস্তবতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার একটি প্রস্তাব।
তবে ১০০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি এখনো কোনো চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত নয়। এটি একজন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞের মতামত। নবম পে-স্কেলের চূড়ান্ত বেতন কাঠামো, বৃদ্ধির হার, বাস্তবায়নের ধাপ এবং ভাতা কার্যকরের সময় মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পরই নিশ্চিত হবে।


