মাসের মাঝামাঝিতেই পকেট ফাঁকা—বাকি দিনগুলো কীভাবে চলবে?
বাজার খরচ, বাসাভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, যাতায়াত ও চিকিৎসার ব্যয়—সব মিলিয়ে মাস শেষ হওয়ার আগেই চাপে পড়ছেন বহু পরিবার
মাসের শুরুতে বেতন হাতে পাওয়ার পর অনেকেরই মনে হয়—এই মাসটা হয়তো আগের চেয়ে একটু ভালোভাবে চালানো যাবে। কিন্তু কয়েক দিন যেতে না যেতেই বাজারের খরচ, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানির বিল, সন্তানের পড়াশোনা, যাতায়াত, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় কেনাকাটার হিসাব একে একে সামনে আসে। মাসের মাঝামাঝি পৌঁছাতেই অনেক পরিবারের কাছে তখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়—বাকি দিনগুলো কীভাবে চলবে?
বাংলাদেশে জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ যে এখনও বড় বাস্তবতা, সরকারি পরিসংখ্যানেও তার প্রতিফলন রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) সর্বশেষ প্রকাশিত জুন ২০২৬-এর হিসাবে জাতীয় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৬১ শতাংশ।
অর্থাৎ, আয় একই থাকলেও আগের তুলনায় একই ধরনের পণ্য ও সেবা কিনতে পরিবারের বেশি অর্থ ব্যয় হচ্ছে। ফলে মাসিক বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা।
মাসের মাঝামাঝিতেই কেন হিসাব এলোমেলো হয়ে যায়?
পরিবারের মাসিক আয়ের একটি বড় অংশ সাধারণত নির্দিষ্ট খাতে আগেই চলে যায়। বাসাভাড়া, ঋণের কিস্তি, সন্তানের স্কুল-কলেজের খরচ, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য বিল—এসব ব্যয় কমানো অনেকের পক্ষেই সহজ নয়।
এরপর আসে বাজার খরচ। চাল, ডাল, তেল, মাছ-মাংস, ডিম, সবজি, মসলা ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সামান্য করে বাড়লেও মাস শেষে তার বড় প্রভাব পড়ে।
এর সঙ্গে যোগ হয় যাতায়াতের খরচ, মোবাইল ও ইন্টারনেট বিল, ওষুধ বা চিকিৎসা ব্যয় এবং হঠাৎ কোনো জরুরি প্রয়োজন। ফলে যে অর্থটি মাসের শেষ সপ্তাহের জন্য রেখে দেওয়ার কথা ছিল, সেটিও অনেক সময় মাসের দ্বিতীয় বা তৃতীয় সপ্তাহেই খরচ হয়ে যায়।
মধ্যবিত্তের চাপটা কোথায়?
জীবনযাত্রার ব্যয়ের এই চাপ সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে মধ্যবিত্ত পরিবারের বাজেটে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মূল্যস্ফীতির চাপে অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার সঞ্চয় ভেঙে দৈনন্দিন ব্যয় মেটাচ্ছে, কম দামের পণ্যে ঝুঁকছে, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যয় পিছিয়ে দিচ্ছে কিংবা প্রয়োজন মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভর করছে।
মধ্যবিত্তের সমস্যা আরও জটিল। নিম্নআয়ের মানুষের মতো তাদের অনেক সময় সরকারি সহায়তার সুযোগ থাকে না, আবার উচ্চআয়ের মানুষের মতো অতিরিক্ত আর্থিক সুরক্ষাও থাকে না। ফলে হঠাৎ কোনো চিকিৎসা ব্যয়, বাসা পরিবর্তন, সন্তানের অতিরিক্ত শিক্ষা খরচ কিংবা পারিবারিক জরুরি প্রয়োজন পুরো মাসের বাজেটকে নড়বড়ে করে দিতে পারে।
আয় বাড়লেও স্বস্তি কেন ফিরছে না?
শুধু বেতন বা আয় কত বেড়েছে—এই হিসাব দিয়ে পরিবারের আর্থিক স্বস্তি বোঝা যায় না। গুরুত্বপূর্ণ হলো, আয় বৃদ্ধির তুলনায় ব্যয় কতটা বেড়েছে।
দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতি বেশি থাকলে একই পরিমাণ টাকা দিয়ে আগের মতো পণ্য ও সেবা কেনা যায় না। ফলে কাগজে আয় অপরিবর্তিত থাকলেও বাস্তবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়।
এ কারণেই মাসের মাঝামাঝি এসে অনেকের মনে হয়—‘বেতন তো কম পাইনি, কিন্তু টাকা গেল কোথায়?’
আসলে টাকা হারিয়ে যাচ্ছে না; বরং একই অর্থ দিয়ে আগের তুলনায় কম জিনিস কেনা যাচ্ছে।
সঞ্চয়ের ওপরও পড়ছে চাপ
স্বাভাবিক আর্থিক পরিকল্পনায় মাসিক আয়ের একটি অংশ সঞ্চয়ের জন্য রাখার কথা। কিন্তু যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ই আয়ের বড় অংশ দখল করে নেয়, তখন সঞ্চয়ের সুযোগ সংকুচিত হয়।
অনেক পরিবার প্রথমে বিনোদন, বাইরে খাওয়া বা অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা কমায়। এরপর প্রয়োজনীয় পণ্যের ব্র্যান্ড পরিবর্তন করে, বাজারের পরিমাণ কমায় কিংবা কিছু খরচ পিছিয়ে দেয়। পরিস্থিতি আরও কঠিন হলে সঞ্চয় ভাঙা বা ধার করার পর্যায়েও যেতে হয়।
এভাবে কয়েক মাস চলতে থাকলে শুধু বর্তমান মাসের বাজেট নয়, পরিবারের ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
মাসের বাকি দিনগুলো নিয়ে প্রশ্নটি তাই গুরুত্বপূর্ণ
‘এই মুহূর্তে আপনার পকেটে কত টাকা আছে?’—প্রশ্নটি নিছক কৌতূহলের নয়। এটি আসলে বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়, আয় ও আর্থিক সক্ষমতার একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে পারে।
কারও হাতে মাসের মাঝামাঝিতে কয়েক হাজার টাকা অবশিষ্ট থাকতে পারে, কারও হয়তো কয়েকশ টাকা। আবার কেউ হয়তো ইতোমধ্যে পরবর্তী বেতনের অপেক্ষায় রয়েছেন।
আয়ের পরিমাণ, পরিবারের সদস্য সংখ্যা, বাসাভাড়া, সন্তানের সংখ্যা, চিকিৎসা ব্যয় এবং ঋণের দায়—সবকিছুর ওপর এই হিসাব নির্ভর করে।
তাই একজনের জন্য যে পরিমাণ অর্থ স্বস্তিদায়ক, অন্য পরিবারের জন্য সেটিই হয়তো একেবারে অপর্যাপ্ত।
পাঠকের কাছে প্রশ্ন
মাসের মাঝামাঝিতে এসে আপনার আর্থিক অবস্থাটা কেমন?
বাজার, বাসাভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, যাতায়াত, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ মিটিয়ে এই মুহূর্তে আপনার পকেটে কত টাকা আছে?
কমেন্টে জানিয়ে দিন। চাইলে শুধু টাকার পরিমাণ নয়, আপনার মাসিক আয় ও পরিবারের সদস্যসংখ্যাও জানাতে পারেন। এতে বোঝা যাবে—মাসের মাঝামাঝিতে বাংলাদেশের বিভিন্ন পরিবারের হাতে বাস্তবে কতটা অর্থ থাকে এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ মানুষকে কতটা প্রভাবিত করছে।
মাসের শুরুতে স্বস্তি, নাকি মাসের মাঝামাঝিতেই দুশ্চিন্তা—আপনার বাস্তব অভিজ্ঞতাই হতে পারে এই সময়ের অর্থনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় গল্প।


