আইবাস++ । পে ফিক্সেশন । ই-ফাইলিং

আইবাস++-এর যাত্রা শুরু যেভাবে: ২০১৫ সালের পে-স্কেল, অনলাইন পে-ফিক্সেশন ও অগ্রণী হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তাদের অবদানের স্মৃতিচারণ

সরকারি কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ, বেতন-ভাতার হিসাব এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বর্তমানে আইবাস++ (iBAS++) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যবস্থা। কিন্তু এই অনলাইন ব্যবস্থার সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের পরিচিতি কীভাবে বিস্তৃত হলো, কারা এর প্রাথমিক বাস্তবায়নে ভূমিকা রেখেছিলেন এবং ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়নের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী—এসব প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি স্মৃতিচারণমূলক লেখায় ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়নের সময়কার অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে রফিকুল ইসলামসহ কয়েকজন হিসাব ও অর্থ ব্যবস্থাপনা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবদান এবং তৎকালীন ‘Audit and Accounts Forum’ ফেসবুক গ্রুপের ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। লেখাটিতে উঠে এসেছে অনলাইন পে-ফিক্সেশন, ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (EFT) এবং সরকারি কর্মচারীদের পারস্পরিক সহযোগিতার শুরুর দিকের নানা স্মৃতি।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে: কোনো ব্যবস্থার সঙ্গে ব্যবহারকারীদের প্রথম পরিচিতি এবং সেই ব্যবস্থার পরিকল্পনা, নকশা ও উন্নয়নের সূচনা এক বিষয় নয়। তাই আইবাস++-এর একক উদ্ভাবক নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্মৃতিচারণের পাশাপাশি সরকারি নথি ও নির্ভরযোগ্য প্রামাণ্য তথ্যও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেল: অনলাইন পে-ফিক্সেশনের ঐতিহাসিক অধ্যায়

২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়ন বাংলাদেশের সরকারি কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নিয়ে আসে। এর আগে বেতন নির্ধারণের বিভিন্ন কার্যক্রমে কাগজপত্র, অফিস আদেশ এবং হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের ওপর নির্ভরতা ছিল বেশি। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সময় অনলাইনে বেতন নির্ধারণের ব্যবস্থা চালু হওয়ায় সরকারি কর্মচারীরা নিজেদের চাকরিসংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করে নতুন বেতন হিসাব করার সুযোগ পান।

২০১৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সচিবালয়ে আইবাস++ সফটওয়্যার আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন বলে সমসাময়িক সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। নতুন বেতন কাঠামোয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও পেনশনসংক্রান্ত তথ্য হিসাব করার সুবিধা দেওয়াই ছিল এর অন্যতম লক্ষ্য।

জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী ১ জুলাই ২০১৫ তারিখ থেকে বেতন নির্ধারণের জন্য অনলাইন পোর্টাল চালু করা হয়। পরবর্তী সময়ে নতুন নিয়োগ, বদলি, টাইমস্কেল, সিলেকশন গ্রেড, উচ্চতর গ্রেড এবং অন্যান্য কারণে বেতন পুনর্নির্ধারণের কাজেও এই ব্যবস্থা ব্যবহৃত হতে থাকে।

আইবাস++ কি একজনের ব্রেইনচাইল্ড?

স্মৃতিচারণমূলক লেখাটিতে রফিকুল ইসলাম স্যারকে আইবাস++-এর ব্রেইনচাইল্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। লেখকের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর নেতৃত্বে একটি দল অনলাইন পে-ফিক্সেশন বাস্তবায়ন এবং প্রথম দিকের ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার বা EFT কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

তবে আইবাস++-এর সামগ্রিক উন্নয়নকে একজন ব্যক্তির একক উদ্ভাবন হিসেবে চিহ্নিত করার পক্ষে প্রকাশ্য সরকারি নথিতে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অর্থ বিভাগের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বাজেট ও হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থার স্বয়ংক্রিয়করণের কাজ ১৯৯০-এর দশকে শুরু হয়। ২০০৬-০৭ অর্থবছরে iBAS বাস্তবায়িত হয় এবং পরবর্তী সময়ে সেটিকে উন্নত করে iBAS++-এ রূপান্তর করা হয়। ২০১৫ সালে এ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য সরকারি অর্থায়নে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।

অর্থাৎ, রফিকুল ইসলাম স্যারের ব্যক্তিগত অবদান সম্পর্কে লেখকের স্মৃতিচারণকে সম্মান জানানো প্রয়োজন; একই সঙ্গে পুরো ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস ও কারিগরি উন্নয়নের পেছনে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং একাধিক পর্যায়ের কাজকেও বিবেচনায় রাখতে হবে।

‘Audit and Accounts Forum’: সহযোগিতার একটি স্মরণীয় পরিসর

স্মৃতিচারণে তৎকালীন ‘Audit and Accounts Forum’ ফেসবুক গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা অ্যাডমিন দ্বিজেন সরকার স্যারের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। লেখকের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি এমন কিছু হিসাব ও অর্থ ব্যবস্থাপনা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে এই গ্রুপে যুক্ত করেছিলেন, যাঁরা সরকারি কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ ও হিসাবসংক্রান্ত জটিলতা সমাধানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সহায়তা করতেন।

সেই সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারি চাকরিসংক্রান্ত তথ্যের জন্য এখনকার মতো অসংখ্য গ্রুপ ও পেজ ছিল না। ফলে হাতে গোনা কয়েকটি অনলাইন কমিউনিটি পারস্পরিক সহযোগিতা, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং জটিল নিয়ম বোঝার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছিল।

লেখাটিতে যাঁদের অবদানের কথা স্মরণ করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন—

  • রফিকুল ইসলাম

  • দ্বিজেন সরকার

  • মফিজউদ্দিন মণ্ডল

  • হারুন রশিদ

  • আজমল খান

  • মো. ইয়াহিয়া মোল্লা

  • ইয়ার মোহাম্মদ

  • হৃদয় রঞ্জন রায়

  • শহিদুল ইসলাম

  • ওয়াহিদ ইকবাল স্বপন

  • ইমদাদুল ইসলাম

  • জয়নাল আবেদিন

  • শরীফ রহমান

  • মোহাম্মদ আমিন

উল্লেখিত ব্যক্তিদের ভূমিকা সম্পর্কে এখানে তথ্যের ভিত্তি মূলত সরবরাহ করা স্মৃতিচারণমূলক লেখা। তাঁদের প্রত্যেকের নির্দিষ্ট দায়িত্ব, পদবি বা অবদানের পরিধি আলাদাভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তাই এই নামগুলোকে লেখকের স্মরণ করা অবদানকারীদের তালিকা হিসেবেই দেখা উচিত।

অনলাইন পে-ফিক্সেশন থেকে EFT: কীভাবে বদলেছে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা?

আইবাস++ শুধু বেতন নির্ধারণের সফটওয়্যার নয়। এটি সরকারের সমন্বিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা তথ্য পদ্ধতি। এর মাধ্যমে বাজেট প্রণয়ন, বাজেট বাস্তবায়ন, অনলাইনে বিল দাখিল, অর্থ পরিশোধ, হিসাব সংরক্ষণ এবং আর্থিক প্রতিবেদন তৈরির মতো কাজ সম্পন্ন করা হয়।

এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার বা EFT। এই ব্যবস্থায় অনুমোদিত বেতন ও অন্যান্য অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে ইলেকট্রনিকভাবে পাঠানো যায়। ফলে প্রচলিত কাগজভিত্তিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরতা কমানো, কর্মচারীদের তথ্য সংরক্ষণ এবং অর্থ পরিশোধের কার্যক্রম আরও সুশৃঙ্খল করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সময়ের সঙ্গে আইবাস++-এর কার্যপরিধি বেড়েছে। বর্তমানে এর সঙ্গে বাজেট, বিল প্রক্রিয়াকরণ, কর্মচারী ও পেনশনার ডেটাবেইজসহ বিভিন্ন আর্থিক সেবা যুক্ত রয়েছে।

১০/১৬ বিতর্ক: নিয়ম বোঝার সেই সময়

স্মৃতিচারণে ১০/১৬ নিয়ে তৎকালীন বিতর্কের কথাও উঠে এসেছে। বেতন স্কেল বাস্তবায়নের সময় বিভিন্ন বিধান, গ্রেড এবং বেতন নির্ধারণের নিয়ম নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে আলোচনা ও মতবিনিময় হতো। লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব বিষয় নিয়ে আলাদা গ্রুপও তৈরি হয়েছিল।

এ ধরনের আলোচনার গুরুত্ব ছিল বাস্তবভিত্তিক। কারণ বেতন নির্ধারণে চাকরিতে যোগদানের তারিখ, পূর্ববর্তী বেতন, টাইমস্কেল, সিলেকশন গ্রেড এবং প্রযোজ্য বিধানের মতো তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইনে হিসাব করার সুযোগ তৈরি হলেও নিয়মের সঠিক ব্যাখ্যা জানা এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক রাখা কর্মচারীদের জন্য অপরিহার্য ছিল।

তবে ১০/১৬ বলতে নির্দিষ্ট কোন বিধান বা বিতর্ককে বোঝানো হয়েছে, তা মূল লেখায় বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হয়নি। তাই বিষয়টিকে নির্দিষ্ট কোনো বিধানের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন হবে না।

প্রায় ১১ বছর পর ফিরে দেখা

২০১৫ সালের অভিজ্ঞতার পর প্রায় ১১ বছর পেরিয়ে গেছে। এই সময়ে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনার ডিজিটাল রূপান্তর অনেক দূর এগিয়েছে। একসময় অনলাইন পে-ফিক্সেশন নিয়ে আলোচনা, হিসাবের নিয়ম বোঝা এবং অন্যকে সহায়তা করার জন্য যাঁরা সময় ব্যয় করেছিলেন, তাঁদের অবদান এখন পুরোনো অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে উঠেছে।

বর্তমানে নতুন বেতন কাঠামো বা পে-ফিক্সেশন নিয়ে আলোচনা শুরু হলে সেই শুরুর সময়ের কথা মনে পড়া স্বাভাবিক। প্রযুক্তি ও ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিজ্ঞতা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং জ্ঞান বিনিময়ও এই পরিবর্তনের ইতিহাসের অংশ।

স্মৃতিচারণটির মূল বার্তা তাই কেবল আইবাস++-এর সূচনাকাল নিয়ে নয়; বরং সরকারি কর্মচারীদের জন্য অনলাইন সেবা সহজ করতে যাঁরা নিজ উদ্যোগে সহযোগিতা করেছিলেন, তাঁদের স্মরণ করার মধ্যেও রয়েছে।

উপসংহার

আইবাস++-এর ইতিহাস বুঝতে হলে ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়নকে গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হিসেবে দেখতে হবে। ওই সময় অনলাইন পে-ফিক্সেশন সরকারি কর্মচারীদের কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিত হয় এবং বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল ব্যবস্থার ব্যবহার দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার স্বয়ংক্রিয়করণের ইতিহাস আরও আগে শুরু হয়েছিল এবং আইবাস++ ধাপে ধাপে উন্নত হয়েছে।

রফিকুল ইসলাম স্যার, দ্বিজেন সরকার স্যার এবং স্মৃতিচারণে উল্লিখিত অন্যদের অবদান সম্পর্কে আরও প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া গেলে এই ইতিহাস আরও পূর্ণাঙ্গভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।

প্রযুক্তির পেছনে থাকে মানুষের শ্রম, অভিজ্ঞতা ও সহযোগিতা। পুরোনো দিনের সেই প্রচেষ্টাগুলো স্মরণ করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নির্ভরযোগ্যভাবে সংরক্ষণ করা—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *