নতুন পে স্কেলে অক্টোবরের বেতনের সঙ্গে মিলতে পারে প্রায় তিন মাসের বকেয়া, ৫ অক্টোবর থেকে পে ফিক্সেশন
জাতীয় বেতন কাঠামো-২০২৬ অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন নির্ধারণের কার্যক্রম আগামীকাল ৫ অক্টোবর ২০২৬ থেকে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। নতুন বেতন নির্ধারণ বা পে ফিক্সেশন সম্পন্ন হলে অক্টোবর মাসের বেতনের সঙ্গে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসের বকেয়া বেতন বা এরিয়ার পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারী সমপরিমাণ এরিয়ার পাবেন না। নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী কার কত টাকা মূল বেতন নির্ধারিত হবে, আগের বেতন কত ছিল, ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেডসহ সংশ্লিষ্ট তথ্যের ওপরই বকেয়ার পরিমাণ নির্ভর করবে।
৫ অক্টোবর থেকে শুরু পে ফিক্সেশন
নতুন বেতন নির্ধারণের জন্য সরকারি চাকরিজীবীদের iBAS++-এর পে ফিক্সেশন ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হবে। নির্ধারিত অনলাইন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কর্মচারী-কর্মকর্তাদের নিজ নিজ চাকরিসংক্রান্ত তথ্য যাচাই ও প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান করতে হবে।
অর্থ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, পে ফিক্সেশনের কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করে ২০ অক্টোবরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। ফলে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী এখনো নতুন বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে পরিষ্কার নন, তাদের জন্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্য যাচাই করে পে ফিক্সেশন সম্পন্ন করা গুরুত্বপূর্ণ।
অনলাইনে যেসব তথ্য প্রয়োজন হতে পারে
পে ফিক্সেশনের সময় একজন সরকারি কর্মচারীর চাকরিসংক্রান্ত বেশ কিছু তথ্য প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে রয়েছে—
- জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য;
- জন্মতারিখ;
- বর্তমান পদ ও পদমর্যাদা;
- বর্তমান গ্রেড;
- সরকারি চাকরিতে যোগদানের তারিখ;
- বর্তমান মূল বেতন;
- সর্বশেষ বেতন নির্ধারণের তথ্য;
- ইনক্রিমেন্টসংক্রান্ত তথ্য;
- পদোন্নতি বা উচ্চতর গ্রেডের তথ্য, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে;
- পূর্ববর্তী পে ফিক্সেশনের তথ্য।
অর্থাৎ শুধু বর্তমান মূল বেতন দিলেই হবে না; আগের বেতন নির্ধারণের ধারাবাহিকতাও সঠিকভাবে যাচাই করতে হবে। কারণ নতুন স্কেলে চূড়ান্ত মূল বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী বেতন কাঠামোর তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কেন আগের পে ফিক্সেশনের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ?
নতুন বেতন কাঠামোয় একজন কর্মচারীর বেতন নির্ধারণ একটি নির্দিষ্ট হিসাবের মাধ্যমে হবে। বর্তমান মূল বেতন থেকে নতুন স্কেলের সংশ্লিষ্ট ধাপে বেতন নির্ধারণের পাশাপাশি চাকরির ইতিহাস, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি, পদোন্নতি এবং উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার তথ্যও বিবেচনায় আসতে পারে।
ফলে কোনো কর্মচারীর আগের পে ফিক্সেশনে ভুল থাকলে নতুন বেতন নির্ধারণের সময়ও তার প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে বর্তমান মূল বেতন, গ্রেড এবং পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণের তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি থাকলে পে ফিক্সেশন সম্পন্ন করার আগে তা সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে।
জুলাই থেকে কার্যকর হলে তিন মাসের বকেয়া
নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরে বেতন নির্ধারণ করা হলে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসের বেতন নতুন কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।
এক্ষেত্রে অক্টোবর মাসের বেতন যদি নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী দেওয়া হয়, তাহলে আগের তিন মাসের বেতন ও নতুন নির্ধারিত বেতনের পার্থক্য এরিয়ার বা বকেয়া হিসেবে পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, কোনো কর্মচারীর পুরোনো কাঠামো অনুযায়ী মাসিক মূল বেতন ছিল ২৫ হাজার টাকা। নতুন পে ফিক্সেশনের পর তার মূল বেতন যদি ৩৫ হাজার টাকা নির্ধারিত হয়, তাহলে শুধু মূল বেতনের পার্থক্যই প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা। তিন মাসে এই পার্থক্য দাঁড়াবে ৩০ হাজার টাকা।
তবে বাস্তবে এরিয়ার হিসাব শুধু মূল বেতনের পার্থক্য দিয়ে নির্ধারিত হবে—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী কোন কোন ভাতা ও সুবিধা পুনর্নির্ধারণ হবে, সেগুলোর কার্যকারিতা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি নির্দেশনার ওপর মোট বকেয়ার পরিমাণ নির্ভর করবে।
সবাই একই পরিমাণ এরিয়ার পাবেন না
সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে এরিয়ার নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তির জায়গা হলো—নতুন স্কেলে সবাই সমান টাকা পাবেন কি না। বাস্তবে তা নয়।
একজন কর্মচারীর এরিয়ার নির্ভর করতে পারে—
পুরোনো মূল বেতন → নতুন মূল বেতন → ইনক্রিমেন্ট → পদোন্নতি/উচ্চতর গ্রেড → কার্যকর তারিখ → ভাতা ও অন্যান্য প্রাপ্য → ইতোমধ্যে পাওয়া বেতন
এসব বিষয়ের ওপর।
ফলে একই গ্রেডের দুই কর্মচারীর চাকরির মেয়াদ, বর্তমান মূল বেতন বা ইনক্রিমেন্টের তারিখ ভিন্ন হলে তাদের নতুন বেতন ও এরিয়ারও ভিন্ন হতে পারে।
পে ফিক্সেশনে ভুল তথ্য দিলে সমস্যা হতে পারে
অনলাইন পে ফিক্সেশনের সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তথ্য সঠিকভাবে দেওয়া এবং প্রদর্শিত পুরোনো তথ্য যাচাই করা।
বিশেষ করে—
১. নাম ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য সঠিক কি না;
২. জন্মতারিখ ঠিক আছে কি না;
৩. চাকরিতে যোগদানের তারিখ সঠিক কি না;
৪. বর্তমান পদ ও গ্রেড ঠিক আছে কি না;
৫. বর্তমান মূল বেতন সঠিক কি না;
৬. সর্বশেষ ইনক্রিমেন্টের তথ্য ঠিক আছে কি না;
৭. পূর্ববর্তী পে ফিক্সেশনের তথ্যের সঙ্গে বর্তমান তথ্যের মিল রয়েছে কি না—এসব বিষয় ভালোভাবে দেখতে হবে।
কোনো তথ্য ভুল থাকলে সেটি যাচাই না করে চূড়ান্তভাবে পে ফিক্সেশন করা উচিত হবে না।
অক্টোবরের বেতনের সময়সীমা গুরুত্বপূর্ণ
অর্থ বিভাগের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পে ফিক্সেশন সম্পন্ন করা গেলে অক্টোবরের বেতন নতুন কাঠামো অনুযায়ী দেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া সহজ হবে। একই সঙ্গে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রাপ্য বকেয়া হিসাব করাও সম্ভব হবে।
তবে অক্টোবরের বেতনের সঙ্গে সবার তিন মাসের পুরো বকেয়া নিশ্চিতভাবেই হাতে চলে আসবে—এমন নিশ্চয়তা পে ফিক্সেশন শেষ হওয়ার আগেই দেওয়া যায় না। কারণ এরিয়ার বিল প্রস্তুত, যাচাই, অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ের প্রশাসনিক প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করতে হবে।
এখন সরকারি কর্মচারীদের করণীয়
পে ফিক্সেশন শুরু হওয়ার আগে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজেদের চাকরির গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো প্রস্তুত রাখা উচিত। বিশেষ করে পুরোনো পে ফিক্সেশন, ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি ও বর্তমান মূল বেতনের তথ্য হাতে থাকলে অনলাইন তথ্য যাচাই সহজ হবে।
৫ অক্টোবর থেকে পে ফিক্সেশন শুরু এবং ২০ অক্টোবরের মধ্যে কার্যক্রম শেষ করার লক্ষ্যের কারণে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্ধারিত পদ্ধতিতে দ্রুত প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন পে স্কেলে কে কত টাকা বেতন ও এরিয়ার পাবেন, তা অনুমান করে নয়—iBAS++-এ সঠিক চাকরির তথ্য যাচাই ও নতুন বেতন নির্ধারণ সম্পন্ন হওয়ার পরই চূড়ান্তভাবে জানা যাবে।
সুতরাং অক্টোবর মাসের বেতনের সঙ্গে প্রায় তিন মাসের বকেয়া পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও, প্রকৃত অর্থের পরিমাণ নির্ভর করবে ব্যক্তিভেদে নতুন পে ফিক্সেশনের ফল এবং সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক সুবিধার কার্যকরতার ওপর।



