সঞ্চয়পত্র নাকি ডাবল বেনিফিট স্কিম—৫ লাখ টাকায় কোনটিতে বেশি লাভ?
নিরাপদ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের কাছে সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংকের ডাবল বেনিফিট স্কিম—দুই ধরনের পণ্যই বেশ জনপ্রিয়। বিশেষ করে হাতে ৫ লাখ টাকা থাকলে নির্দিষ্ট মেয়াদে কোথায় রাখলে তুলনামূলক বেশি অর্থ পাওয়া যাবে, তা নিয়ে অনেকেরই আগ্রহ রয়েছে। সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া একটি হিসাবচিত্রে ৫ লাখ টাকা ডাবল বেনিফিট স্কিম ও সঞ্চয়পত্রে রাখার সম্ভাব্য রিটার্ন তুলনা করা হয়েছে। তবে ওই হিসাবের কিছু অংশ নির্দিষ্ট ব্যাংকের স্কিম, কর, আবগারি শুল্ক ও পুনর্বিনিয়োগের শর্তের ওপর নির্ভরশীল—তাই এটিকে সরাসরি সব বিনিয়োগকারীর জন্য প্রযোজ্য চূড়ান্ত হিসাব হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
বর্তমানে জাতীয় সঞ্চয় স্কিমের মুনাফার হারও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৬ সময়ের জন্য জাতীয় সঞ্চয় স্কিমের মুনাফার হার জানুয়ারি-জুনের হারেই অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। ৫ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মেয়াদান্তে হার ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ; ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং পরিবার সঞ্চয়পত্রে ১১ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
৫ লাখ টাকার ডাবল বেনিফিট স্কিমের হিসাব
ছবিতে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ৫ লাখ টাকা প্রায় ৬ দশমিক ৫ বছরের জন্য একটি ডাবল বেনিফিট স্কিমে রাখা হলে মেয়াদ শেষে মূল টাকা দ্বিগুণ হওয়ার ধারণা নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ কর ও অন্যান্য কর্তনের আগে ৫ লাখ টাকা থেকে প্রায় ১০ লাখ টাকা হওয়ার সম্ভাবনা ধরা হয়েছে।
তবে ডাবল বেনিফিট স্কিমের ক্ষেত্রে ‘মেয়াদ শেষে টাকা দ্বিগুণ’ কথাটিই শেষ কথা নয়। প্রকৃত হাতে পাওয়া অর্থ নির্ভর করবে ব্যাংকের নির্ধারিত মেয়াদ, মুনাফার হার, উৎসে কর, আবগারি শুল্ক এবং সংশ্লিষ্ট স্কিমের শর্তের ওপর। একটি ব্যাংকের ডাবল বেনিফিট স্কিমের হার ও মেয়াদ অন্য ব্যাংকের সঙ্গে এক নাও হতে পারে।
ছবির হিসাবেও ১৫ শতাংশ উৎসে কর এবং আবগারি শুল্কের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। সেই হিসাবে ৬ দশমিক ৫ বছর পর মোট প্রাপ্তি ১০ লাখ টাকার চেয়ে কম ধরা হয়েছে। অর্থাৎ বিজ্ঞাপনে ‘ডাবল’ বলা হলেও কর-শুল্ক কাটার পর বিনিয়োগকারীর হাতে প্রকৃত অর্থ ১০ লাখ টাকা নাও থাকতে পারে।
সঞ্চয়পত্রে ৫ লাখ টাকা রাখলে কী হতে পারে?
অন্যদিকে সঞ্চয়পত্রের সুবিধা হলো—এখানে সরকারি নির্ধারিত মুনাফার হার ও নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়েও আগের নির্ধারিত হার বহাল রয়েছে।
ছবিতে ৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রের মাসিক মুনাফা প্রায় ৪ হাজার ৭২০ টাকা ধরে ৬ দশমিক ৫ বছরের একটি তুলনা করা হয়েছে। সেই হিসাবে দীর্ঘ সময়ে নিয়মিত মুনাফা পাওয়া এবং মূলধন আলাদাভাবে বিবেচনা করে মোট প্রাপ্তির হিসাব করা হয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ডাবল বেনিফিট স্কিম সাধারণত মেয়াদ শেষে বড় অঙ্কের এককালীন অর্থ পাওয়ার দিকে কেন্দ্রীভূত, আর নির্দিষ্ট ধরনের সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারী মেয়াদ চলাকালেই নিয়মিত মুনাফা পাওয়ার সুযোগ পান। ফলে শুধু মেয়াদ শেষে হাতে কত টাকা থাকবে—এটি দিয়ে দুই বিনিয়োগের প্রকৃত তুলনা করা সবসময় যথাযথ নয়।
নিয়মিত মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ করলে হিসাব বদলে যেতে পারে
ছবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো পুনর্বিনিয়োগের বিষয়টি। ধরা হয়েছে, সঞ্চয়পত্র থেকে পাওয়া নিয়মিত মুনাফা আবার কোনো ব্যাংকিং বিনিয়োগে রাখা হলে মোট রিটার্ন আরও বাড়তে পারে।
এটি বাস্তব আর্থিক বিশ্লেষণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একই ৫ লাখ টাকা যদি একজন বিনিয়োগকারী মুনাফা তুলে খরচ করেন, আর অন্যজন সেই মুনাফা আবার বিনিয়োগ করেন—দুজনের শেষ সম্পদের পরিমাণ এক হবে না।
অর্থাৎ তুলনা করতে হলে তিনটি বিষয় আলাদা করে দেখতে হবে—
১. প্রাথমিক বিনিয়োগ: ৫ লাখ টাকা
২. মেয়াদ চলাকালে পাওয়া মুনাফা: মাসিক/ত্রৈমাসিক/বার্ষিক
৩. মুনাফা পুনর্বিনিয়োগের রিটার্ন: পুনরায় বিনিয়োগ করলে অতিরিক্ত আয়
এই তিনটি একসঙ্গে বিবেচনা না করলে ‘কোনটি বেশি লাভজনক’ প্রশ্নের উত্তর বিভ্রান্তিকর হতে পারে।
৮.৫ লাখ টাকার উদাহরণ কেন এসেছে?
ছবির শেষের অংশে ৮ দশমিক ৫ লাখ টাকা নিয়ে পুনরায় সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের একটি হিসাব দেখানো হয়েছে। এর উদ্দেশ্য মূলত আগের বিনিয়োগ থেকে তৈরি হওয়া বড় মূলধন পরবর্তী সময়ে আবার বিনিয়োগ করলে সম্ভাব্য অতিরিক্ত আয় কত হতে পারে, তা বোঝানো।
তবে এই অংশের হিসাবও নির্ভর করবে তখনকার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার, বিনিয়োগের শ্রেণি, করহার, বিনিয়োগের যোগ্যতা ও প্রযোজ্য সীমার ওপর। তাই ৮ দশমিক ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলেই ছবিতে দেখানো একই ফল পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না।
৫ লাখ টাকার ক্ষেত্রে মূল পার্থক্য কোথায়?
সঞ্চয়পত্র ও ডাবল বেনিফিট স্কিমের তুলনায় সবচেয়ে বড় বিষয় হলো নগদ প্রবাহ বনাম মেয়াদান্তের এককালীন রিটার্ন।
সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে নিয়মিত মুনাফা পাওয়ার সুযোগ থাকায় যাদের মাসিক বা ত্রৈমাসিক আয় প্রয়োজন, তাদের জন্য এটি বেশি উপযোগী হতে পারে। বিপরীতে যারা নিয়মিত মুনাফা না তুলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত টাকা রেখে মেয়াদ শেষে বড় অঙ্কের অর্থ নিতে চান, তাদের কাছে ডাবল বেনিফিট স্কিম আকর্ষণীয় হতে পারে।
তবে ডাবল বেনিফিট স্কিমে ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা, স্কিমের প্রকৃত মুনাফার হার, আগাম ভাঙালে কী হবে, কর ও শুল্ক কত হবে—এসব বিষয় আগে যাচাই করা জরুরি।
করের বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
অনেক সময় বিনিয়োগের বিজ্ঞাপনে কর-পূর্ব মুনাফা বা মোট ম্যাচিউরিটি ভ্যালু দেখানো হয়। কিন্তু বিনিয়োগকারীর প্রকৃত লাভ নির্ধারণে কর ও অন্যান্য কর্তন বাদ দেওয়ার পর হাতে কত টাকা থাকবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয় সঞ্চয় স্কিমের ক্ষেত্রেও বিনিয়োগের পরিমাণ ও সংশ্লিষ্ট শ্রেণি অনুযায়ী মুনাফার হার ভিন্ন হতে পারে। ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধের জন্য সরকার আগের হার বহাল রেখেছে।
এ কারণে কোনো বিনিয়োগ করার আগে শুধু ‘কত টাকা হবে’ নয়, বরং কর কাটার পর কত টাকা পাওয়া যাবে এবং মাঝপথে টাকা প্রয়োজন হলে কী শর্ত প্রযোজ্য হবে—এ দুটি বিষয়ও হিসাব করা উচিত।
তাহলে ৫ লাখ টাকা কোথায় রাখা তুলনামূলক ভালো?
এক কথায় সবার জন্য একই উত্তর নেই।
যদি লক্ষ্য হয় নিয়মিত মুনাফা পাওয়া, তাহলে উপযুক্ত সঞ্চয়পত্র একটি শক্তিশালী বিকল্প হতে পারে। অন্যদিকে যদি লক্ষ্য হয় মেয়াদ শেষে এককালীন বড় অঙ্কের অর্থ তৈরি করা, তাহলে ব্যাংকের ডাবল বেনিফিট স্কিম বিবেচনা করা যেতে পারে।
তবে ডাবল বেনিফিট স্কিমে যাওয়ার আগে ব্যাংকের লিখিত শর্ত দেখে নিশ্চিত হতে হবে—৫ লাখ টাকা ঠিক কত বছরে দ্বিগুণ হবে, কর ও আবগারি শুল্ক বাদে নিট কত পাওয়া যাবে, আগাম ভাঙলে কত পাওয়া যাবে এবং মেয়াদ শেষে অর্থ পরিশোধের নিয়ম কী।
অন্যদিকে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট স্কিমে বিনিয়োগের যোগ্যতা, সর্বোচ্চ বিনিয়োগসীমা, মুনাফার হার ও করের নিয়ম যাচাই করতে হবে।
শেষ কথা
ছবিতে দেখানো হিসাব থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার—শুধু ‘ডাবল’ শব্দটি দেখে ব্যাংকের ডাবল বেনিফিট স্কিমকে সঞ্চয়পত্রের চেয়ে বেশি লাভজনক ধরে নেওয়া ঠিক নয়। একইভাবে শুধু সঞ্চয়পত্রের উচ্চ মুনাফার হার দেখেও সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
৫ লাখ টাকা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রকৃত তুলনা করতে হলে একই মেয়াদ, কর-শুল্ক, নিয়মিত মুনাফা, পুনর্বিনিয়োগের সুযোগ এবং ঝুঁকি—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
বর্তমানে জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৬ সময়ের জন্য জাতীয় সঞ্চয় স্কিমের মুনাফার হার অপরিবর্তিত রয়েছে। তাই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের সর্বশেষ শর্ত যাচাই করাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।


