সরকারের অনুমতি ছাড়া বিদেশ যেতে পারবেন না কোনো সরকারি কর্মচারী: জেনে নিন ‘বহিঃ বাংলাদেশ ছুটি’র নিয়মকানুন
ব্যক্তিগত প্রয়োজনে কিংবা চিকিৎসার উদ্দেশ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রায়শই দেশের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে। তবে সাধারণ নাগরিকদের মতো সরকারি চাকুরিজীবীরা চাইলেই হুট করে দেশ ত্যাগ করতে পারেন না। ২০তম গ্রেড থেকে শুরু করে ১ম গ্রেডের সচিব পদমর্যাদার যেকোনো স্তরের কর্মচারীর ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য। দেশের বাইরে অবস্থান করতে হলে প্রত্যেক সরকারি কর্মচারীকে বাধ্যতামূলকভাবে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে ‘বহিঃ বাংলাদেশ ছুটি’ (Ex-Bangladesh Leave) মঞ্জুর করিয়ে নিতে হয়।
সম্প্রতি সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে এই ছুটির প্রক্রিয়া এবং এর অপব্যবহার রোধে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মতে, যথাযথ প্রক্রিয়া না মেনে বা সরকারকে না জানিয়ে দেশ ত্যাগ করা সরকারি চাকরি বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং এটি ‘অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য হয়।
বহিঃ বাংলাদেশ ছুটি আসলে কী?
সহজ ভাষায়, সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা যখন তাদের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে (যেমন: বিদেশে উন্নত চিকিৎসা, পবিত্র হজ বা ওমরাহ পালন, দর্শনীয় স্থান ভ্রমণ, কিংবা বিদেশে অবস্থানরত নিকটাত্মীয়ের সাথে সাক্ষাৎ) নিজ দপ্তরের পূর্বানুমোদন নিয়ে দেশের বাইরে যান, তখন তাকে ‘বহিঃ বাংলাদেশ ছুটি’ বলা হয়।
এই ছুটি মঞ্জুরের পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় থেকে একটি আনুষ্ঠানিক সরকারি আদেশ বা জিও (Government Order) জারি করা হয়। এই জিও’র কপি ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষকে প্রদর্শন করেই কেবল দেশ ত্যাগ করা সম্ভব।
এটি কি অর্জিত ছুটি থেকে কর্তন করা হয়?
জনপ্রশাসন বিধিমালা অনুযায়ী, বহিঃ বাংলাদেশ ছুটি সাধারণত একজন কর্মচারীর জমাকৃত অর্জিত ছুটি (Earned Leave) থেকে কর্তন করা হয়। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে, যেমন— অর্জিত ছুটি জমা না থাকলে বা বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজনে ‘অর্ধ-গড় বেতনে ছুটি’ কিংবা ‘বিনা বেতনে অসাধারণ ছুটি’ও (Extraordinary Leave) কর্তৃপক্ষ মঞ্জুর করতে পারে। এই ছুটির সময়ে বেতন ও ভাতা প্রাপ্তির বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে সরকারি নির্দিষ্ট বিধিমালা ও ছুটির শর্ত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।
ছুটি মঞ্জুরের সাধারণ শর্তাবলী:
বহিঃ বাংলাদেশ ছুটি মঞ্জুরের ক্ষেত্রে সরকার সাধারণত নির্দিষ্ট কিছু শর্ত আরোপ করে থাকে, যা কর্মচারীকে অবশ্যই মেনে চলতে হয়:
১. কোনো আর্থিক দায় নেই: এই বিদেশ ভ্রমণ সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত হওয়ায় এর সাথে সরকারের কোনো আর্থিক সংশ্লেষ থাকবে না। অর্থাৎ, যাতায়াত ও ভ্রমণকালীন সমস্ত খরচ কর্মচারী নিজেকেই বহন করতে হবে।
২. মুদ্রা বিধিমালা: ভ্রমণের যাবতীয় ব্যয় বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হবে এবং এর জন্য সরকারের কাছ থেকে কোনো বৈদেশিক মুদ্রা দাবি করা যাবে না।
৩. নির্দিষ্ট সময়ে প্রত্যাবর্তন: ছুটির মেয়াদ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই দেশে ফিরে কর্মস্থলে যোগদান করতে হবে। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া বিদেশে অবস্থানের মেয়াদ বাড়ানো যাবে না।
৪. বেতন প্রাপ্তি: সাধারণত ছুটির পূর্ববর্তী সময়ের বেতন-ভাতা দেশীয় মুদ্রায় প্রাপ্য হন কর্মচারীরা, ভ্রমণের কারণে কোনো বৈদেশিক মুদ্রায় বেতন দেওয়া হয় না।
আবেদনের সঠিক প্রক্রিয়া
বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করার অন্তত কয়েক সপ্তাহ আগেই কর্মচারীকে তার নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ফরম্যাটে আবেদন করতে হয়।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে: আবেদনের সাথে নিবন্ধিত চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র (Prescription) বা মেডিকেল বোর্ডের রেফারেল লেটার সংযুক্ত করতে হয়।
ভ্রমণ বা জিয়ারতের ক্ষেত্রে: ভ্রমণের উদ্দেশ্য এবং দর্শনীয় স্থানের বিবরণ উল্লেখ করতে হয়।
ছুটির হিসাব (Leave Ledger): আবেদনের সাথে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিস (CAO/DAO/UAO) কর্তৃক প্রত্যয়িত অর্জিত ছুটির হিসাব বিবরণী জমা দিতে হয়।
প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা রক্ষা এবং কর্মস্থলে জনবলের উপস্থিতি নিশ্চিত করতেই এই নিয়ম তৈরি করা হয়েছে। তাই যেকোনো গ্রেডের সরকারি কর্মচারীর উচিত ভ্রমণের চূড়ান্ত সূচি নির্ধারণের আগেই নিয়ম মেনে আবেদন করে জিও (GO) সংগ্রহ করা, যাতে শেষ মুহূর্তে ইমিগ্রেশনে কোনো ধরনের জটিলতায় পড়তে না হয়।
বহিঃ বাংলাদেশ ছুটির আবেদনপত্রের নমুনা
তারিখ: [আবেদনের তারিখ, যেমন: ০২/০৭/২০২৬]
বরাবর [উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ – যেমন: মহাপরিচালক / সচিব / জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার] [দপ্তরের নাম, যেমন: প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর / তথ্য মন্ত্রণালয়] [ঠিকানা, যেমন: মিরপুর-২ / বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা]
মাধ্যম: যথাযথ কর্তৃপক্ষ। (যদি সরাসরি উপরের কর্মকর্তার কাছে পাঠাতে হয়, তবে নিচের অফিস বা প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে ফরওয়ার্ড করতে হয়)
বিষয়: [ভ্রমণ / চিকিৎসা / হজ পালন] এর উদ্দেশ্যে বহিঃ বাংলাদেশ ছুটি মঞ্জুর ও দেশ ত্যাগের অনুমতি প্রসঙ্গে।
মহোদয়, বিনীত নিবেদন এই যে, আমি নিম্নস্বাক্ষরকারী আপনার অধীনস্থ [প্রতিষ্ঠানের নাম/বিদ্যালয়ের নাম] এ [আপনার পদবী, যেমন: সহকারী শিক্ষক / সহকারী বেতার প্রকৌশলী] হিসেবে কর্মরত আছি। আগামী [ভ্রমণ শুরুর সম্ভাব্য তারিখ] তারিখ হতে [ভ্রমণ শেষের সম্ভাব্য তারিখ] তারিখ পর্যন্ত মোট [মোট দিনের সংখ্যা, যেমন: ১৫/৩০] দিন আমার [নিজের চিকিৎসার জন্য / পরিবারের সদস্যের চিকিৎসার জন্য / আজমীর শরীফ জিয়ারত ও দর্শনীয় স্থান ভ্রমণের] উদ্দেশ্যে [দেশের নাম, যেমন: ভারত / সৌদি আরব] গমনের প্রয়োজন।
উল্লেখ্য যে, উক্ত বহিঃ বাংলাদেশ ছুটির সময়ে আমার অনুকূলে জমাকৃত অর্জিত ছুটি (Earned Leave) হতে ছুটি মঞ্জুর করার জন্য বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি। এই বিদেশ ভ্রমণকালীন সরকারের ওপর কোনো আর্থিক দায়-ভার বর্তাবে না এবং আমি যথাসময়ে ছুটি শেষে দেশে প্রত্যাবর্তন করে কর্মস্থলে যোগদান করব।
অতএব, মহোদয়, আমার উপরোক্ত বিষয়সমূহ বিবেচনাপূর্বক উক্ত [মোট দিনের সংখ্যা, যেমন: ১৫] দিনের অর্জিত ছুটি (বহিঃ বাংলাদেশ ছুটি) মঞ্জুরসহ দেশ ত্যাগের অনুমতি প্রদান করতে আপনার সদয় মর্জি হয়।
আপনার অনুগত,
(স্বাক্ষর) নাম: [আপনার নাম] পদবী: [আপনার পদবী] কর্মস্থলের নাম: [আপনার অফিস/প্রতিষ্ঠানের নাম] আইডি নম্বর (যদি থাকে): [আপনার পিডিএসআইডি/পরিচিতি নম্বর] [ঠিকানা/উপজেলা ও জেলার নাম]
💡 কিছু গুরুত্বপূর্ণ নোট (আবেদনকারীর সহায়তার জন্য):
ছুটির হিসাব: আবেদনের সাথে সাধারণত অর্জিত ছুটির হিসাব (Leave Calculation Ledger) সংযুক্ত করতে হয়, যা সংশ্লিষ্ট হিসাব রক্ষণ অফিস বা দপ্তরের প্রধান কর্তৃক প্রত্যয়িত হতে হবে।
সংযুক্তি: চিকিৎসার উদ্দেশ্যে গেলে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন/রেফারেল লেটার এবং ভ্রমণের উদ্দেশ্যে গেলে পাসপোর্ট বা প্রাসঙ্গিক কাগজপত্রের কপি আবেদনের সাথে যুক্ত করে দেওয়া ভালো।



