প্রস্তাবিত ৯ম পে-স্কেল : সরকারি চাকুরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির সম্ভাব্য তুলনামূলক চিত্র ও বিশ্লেষণ দেখুন
দেশের সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দিতে প্রস্তাবিত ৯ম পে-স্কেল কাঠামোর একটি সম্ভাব্য ও তুলনামূলক ছক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। পে-কমিশনের সম্ভাব্য সুপারিশের ভিত্তিতে তৈরি এই ছকে সরকারি চাকুরিজীবীদের ১ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির এক অভূতপূর্ব রূপরেখা দেখা গেছে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, এটি একটি সম্ভাব্য খসড়া বা অনুমিত ছক মাত্র, যা এখনও সরকারি গেজেট বা চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশিত হয়নি।
নিম্ন গ্রেডে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার: ৫০% ও ১০০% বৃদ্ধির প্রস্তাব প্রকাশিত সম্ভাব্য ছকটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এবারের প্রস্তাবনায় বৈষম্য দূরীকরণ এবং নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। কাঠামোটিতে মূলত দুটি ভাগে বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে:
১. ১ম থেকে ১০ম গ্রেড (৫০% বৃদ্ধি): উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা তথা ১ম থেকে ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ১ম গ্রেডের বর্তমান মূল বেতন ৭৮,০০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে সম্ভাব্য নতুন পে-স্কেলে ১,১৭,০০০ টাকা হতে পারে। একইভাবে ২য় থেকে ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের বেতনও আনুপাতিক হারে ৫০% বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।
২. ১১তম থেকে ২০তম গ্রেড (১০০% বা শতভাগ বৃদ্ধি): এই স্তরের কর্মচারীদের জন্য সবচেয়ে বড় চমক রয়েছে ছকটিতে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনা করে ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন শতভাগ বা ১০০% বৃদ্ধির প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ছক অনুযায়ী, ১১তম গ্রেডের বর্তমান মূল বেতন ১২,৫০০ – ৩০,২৩০ টাকা থেকে দ্বিগুণ হয়ে সম্ভাব্য ২৫,০০০ – ৬০,৪৬০ টাকা হতে পারে। ২০তম গ্রেডের সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়াতে পারে ১৬,৫০০ টাকায় (সর্বোচ্চ ৪০,০২০ টাকা)।
অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতামত অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমান বাজারের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, তাতে এই ধরনের বেতন বৃদ্ধি সময়ের দাবি। বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের (১১ থেকে ২০তম) কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ১০০% বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাবনাটি বাস্তবায়িত হলে প্রান্তিক ও মধ্যম আয়ের সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে।
তবে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ এই বিপুল পরিমাণ ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়ে সরকারকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁদের মতে, একসঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন এতটা বৃদ্ধি পেলে বাজারে এক ধরণের কৃত্রিম মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিতে পারে। এছাড়া জাতীয় বাজেটের ওপর যে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ পড়বে, তা সামাল দিতে সরকারকে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি ও অপচয় রোধে কঠোর হতে হবে।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রত্যাশা ও বর্তমান অবস্থা এই সম্ভাব্য ছকটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই সচিবালয়সহ সারা দেশের সরকারি দপ্তরগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও আলোচনার ঝড় উঠেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নতুন পে-স্কেলের এই খসড়া রূপরেখা তাঁদের মনে আশার আলো সঞ্চার করেছে। কর্মচারীদের একাংশ মনে করছেন, এই প্রস্তাবনা দ্রুত বাস্তবায়ন হলে তাঁরা পরিবার নিয়ে কিছুটা স্বস্তিতে জীবনযাপন করতে পারবেন।
তবে বিষয়টি নিয়ে এখনই অতিরিক্ত উচ্ছ্বসিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন নীতিপ্রণেতারা। যেহেতু এটি সরকারের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা গেজেট নয়, তাই এতে পরিবর্তন বা পরিমার্জনের পূর্ণ সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে পুরো প্রক্রিয়াটি পে-কমিশনের চূড়ান্ত সুপারিশ প্রণয়ন এবং সরকারের সর্বোচ্চ মহলের (মন্ত্রিসভা ও অর্থ মন্ত্রণালয়) অনুমোদন ও যাচাই-বাছাইয়ের অপেক্ষায় রয়েছে। দেশের লাখ লাখ সরকারি চাকুরীজীবী এখন অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছেন সরকারের চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের দিকে।




