২০২৬ সালের নতুন পে স্কেল : বৈষম্য নিরসন ও এক ধাপে শতভাগ মূল বেতন বাস্তবায়নের জোরালো দাবি
দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি কর্মচারীদের বহুল প্রতীক্ষিত নতুন পে-স্কেল (Pay Scale 2026) বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় কর্মচারীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে প্রস্তাবিত এই পে-স্কেলের বৈষম্য দূরীকরণ এবং এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের একটি বড় অংশের মধ্যে নতুন করে দাবি ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কর্মচারীদের স্পষ্ট দাবি—আসন্ন গেজেটে যেন এক ধাপেই শতভাগ মূল বেতন (Basic Pay) কার্যকর করা হয়।
বৈষম্য কমানোর বদলে বাড়ানোর অভিযোগ
সরকারি কর্মচারীদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, বেতন বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে কর্মচারীদের পক্ষ থেকে সর্বনিম্ন বেতন ১:৪ অনুপাতে ৩৫,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ১,৪০,০০০ টাকা করার দাবি জানানো হয়েছিল। পাশাপাশি গ্রেড সংখ্যা ২০টি থেকে কমিয়ে ১২টিতে নামিয়ে আনার প্রস্তাব ছিল।
কিন্তু বর্তমান প্রস্তাবনায় গ্রেডের সংখ্যা ২০টিই বহাল রাখা হয়েছে এবং ১:৪ অনুপাতের পরিবর্তে ১:৮ অনুপাত বজায় রাখা হয়েছে। এর ফলে প্রস্তাবিত সর্বনিম্ন বেতন ৩৫,০০০ টাকা থেকে কমিয়ে ২০,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ১,৪০,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৬০,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কর্মচারীদের মতে, এই ব্যবস্থার ফলে নিচের গ্রেডের কর্মচারীদের বৈষম্য কমার বদলে উল্টো আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ গ্রেডগুলোর ভেতরের ব্যবধান পূর্বের মতোই মাত্র ৩০০, ৪০০ বা ৫০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে, যেখানে উপরের গ্রেডগুলোর ব্যবধান ৪,০০০ থেকে ১৫,০০০ টাকা পর্যন্ত।
অতীত পে-স্কেলের বাস্তবায়ন চিত্র ও তুলনা
কর্মচারী প্রতিনিধিরা পূর্বের বিভিন্ন পে-স্কেলের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া তুলে ধরে জানান:
২০১৫ সালের পে-স্কেল: এটি এক ধাপেই বাস্তবায়িত হয়েছিল (১ জুলাই থেকে কার্যকর এবং ১৫ ডিসেম্বর প্রজ্ঞাপন)। তবে বকেয়া অংশ ৬ মাসের ধাপে দেওয়া হয়েছিল।
২০০৯ সালের পে-স্কেল: এটি দুই ধাপে বাস্তবায়িত হয়—প্রথম ধাপে মূল বেতন এবং দ্বিতীয় ধাপে অন্যান্য ভাতা।
২০০৫ সালের পে-স্কেল: তৎকালীন সরকার দেড় বছরের মধ্যে ৩টি ধাপে এটি সম্পন্ন করেছিল। প্রথম বছরের জানুয়ারিতে ৭৫% বেসিক, জুলাইয়ে বাকি ২৫% বেসিক এবং পরবর্তী বছরের জুলাইয়ে ভাতা কার্যকর করা হয়েছিল।
বক্তারা উল্লেখ করেন, পূর্বের পে-স্কেলগুলো ৫ বছর পর পর নিয়মতান্ত্রিকভাবে হওয়ায় তখন দ্রব্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু এবার দীর্ঘ ১১ বছর পর নতুন পে-স্কেল দেওয়া হচ্ছে। এই দীর্ঘ সময়ে বাজারের দ্রব্যমূল্য বহুগুণ বেড়েছে এবং সাধারণ কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। তাই একে পূর্বের পে-স্কেলগুলোর সাথে তুলনা করলে চলবে না।
কর্মচারীদের সুনির্দিষ্ট দাবি ও বিকল্প প্রস্তাব
দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও রাষ্ট্রের সামর্থ্যের কথা বিবেচনা করে কর্মচারীদের পক্ষ থেকে সরকারকে দুটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে:
১. এক ধাপে পূর্ণ বাস্তবায়ন (প্রধান দাবি): নতুন পে-স্কেলের মূল বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা যেন কোনো প্রকার ধাপ ছাড়াই একবারে বা এক ধাপে বাস্তবায়ন করা হয়। ২. বিকল্প প্রস্তাব (অর্থনৈতিক মন্দা থাকলে): যদি রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক মন্দা বা বাজেট ঘাটতি থাকে, তবে ২০০৫ বা ২০০৯ সালের মডেল অনুসরণ করা যেতে পারে। অর্থাৎ, প্রথম ধাপে কোনো আপস ছাড়াই শতভাগ মূল বেতন (Basic Pay) কার্যকর করতে হবে। ভাতা বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাগুলো সরকার পরবর্তী সময়ে তাদের সুবিধাজনক ধাপে প্রদান করতে পারে, এতে কর্মচারীদের কোনো আপত্তি থাকবে না। তবে মূল বেতন কোনোভাবেই ভেঙে ভেঙে বা আংশিক কার্যকর করা যাবে না।
বর্তমানে এই “এক ধাপে শতভাগ মূল বেতন” চালুর দাবির পক্ষে সরকারি কর্মচারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন ফোরামে ব্যাপক জনমত গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হচ্ছে। কর্মচারীদের আশা, সরকার গেজেট প্রকাশের পূর্বেই সাধারণ কর্মচারীদের এই যৌক্তিক দাবিটি বিবেচনায় নেবে।


