১ জুলাই থেকেই নবম পে-স্কেল কার্যকর, প্রথম ধাপে বেতন কত বাড়বে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা
আগামী ১ জুলাই থেকে নবম জাতীয় পে-স্কেল কার্যকর করার সরকারি ঘোষণা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে চললেও প্রথম ধাপে মূল বেতন (বেসিক) কত শতাংশ বৃদ্ধি পাবে, তা নিয়ে এখনো রয়েছে ব্যাপক অনিশ্চয়তা। এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শতভাগ বেতন বৃদ্ধির গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো এমন তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেনি।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে আলোচনায় থাকা মূল প্রস্তাব অনুযায়ী প্রথম ধাপে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেসিক বেতন ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বিকল্প একটি প্রস্তাবও বিবেচনায় রাখা হয়েছে, যেখানে ১ম থেকে ৯ম গ্রেড পর্যন্ত কর্মচারীদের বেসিক ৪০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত কর্মচারীদের বেসিক ৬০ শতাংশ বৃদ্ধির বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত শতভাগ বেসিক বৃদ্ধির দাবি এখনো কোনো সরকারি আলোচনার অংশ নয় বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
ফেসবুকের গুঞ্জন নিয়ে সরকারের অবস্থান
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, নবম পে-স্কেলে প্রথম ধাপে বেসিক কত শতাংশ বৃদ্ধি পাবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সরকারের বিভিন্ন আর্থিক সক্ষমতা, বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং বাস্তবায়ন কৌশল বিবেচনায় নিয়ে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “শতভাগ বেসিক বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে তথ্য প্রচার করা হচ্ছে, তার উৎস সম্পর্কে তারাই ভালো বলতে পারবেন যারা এসব তথ্য ছড়িয়েছেন।”
সচিব কমিটির গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক আজ
নবম জাতীয় পে-স্কেলের বিভিন্ন বিষয় চূড়ান্ত করতে পে-স্কেল সংক্রান্ত সচিব কমিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই বৈঠকে বেতন বৃদ্ধির হার, গেজেট প্রকাশের সময়সূচি, বাস্তবায়নের ধাপ এবং বিভিন্ন ভাতা বৃদ্ধির বিষয়গুলো নিয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে জানা গেছে।
মঙ্গলবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে তিন ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রস্তাব থাকলেও বর্তমানে দুই ধাপে বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। বিশেষ করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠনের দাবির প্রেক্ষিতে দ্রুত বেতন সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
দুই ধাপে বাস্তবায়ন হলে কী হতে পারে?
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, যদি সরকার তিন ধাপের পরিবর্তে দুই ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে প্রথম ধাপেই বেসিক বেতনে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি আসতে পারে। কিছু কর্মকর্তা মনে করছেন, এ ক্ষেত্রে প্রথম ধাপের বৃদ্ধি ১০০ শতাংশের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এটি এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে এবং কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলছে, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, রাজস্ব আহরণ এবং বাজেট ঘাটতির বিষয়গুলো বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
পে-কমিশনের সুপারিশ কতটুকু বাস্তবায়ন হবে?
শুধু বেসিক বেতন বৃদ্ধি নয়, সচিব কমিটির বৈঠকে পে-কমিশনের দেওয়া বিভিন্ন সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে। পে-কমিশন যে হারে বেতন বৃদ্ধি, ভাতা সমন্বয় এবং অন্যান্য সুবিধা বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে, তার কতটুকু কার্যকর করা হবে তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষ করে—
- চিকিৎসা ভাতা বৃদ্ধি
- বাড়ি ভাড়া ভাতা পুনর্নির্ধারণ
- যাতায়াত ভাতা সমন্বয়
- টিফিন ও অন্যান্য ভাতা বৃদ্ধি
- পেনশন সুবিধার উন্নয়ন
এসব বিষয়ও আলোচনায় থাকতে পারে বলে জানা গেছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব যা বললেন
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বলেছেন, “আগামীকাল সচিব কমিটির সভা রয়েছে। সভায় নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।”
যদিও তিনি সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাননি, তবে সংশ্লিষ্ট মহলে ধারণা করা হচ্ছে, এই বৈঠকেই নবম পে-স্কেলের গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হতে পারে।
জুলাই থেকে কার্যকর, টাকা পেতে লাগতে পারে কয়েক মাস
সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন পে-স্কেল আগামী ১ জুলাই থেকেই কার্যকর হবে। তবে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, গেজেট প্রকাশ, সফটওয়্যার আপডেট, বেতন নির্ধারণ এবং হিসাব সমন্বয়ের কারণে বাস্তবে বাড়তি বেতনের টাকা হাতে পেতে দুই থেকে তিন মাস সময় লাগতে পারে।
তিনি বলেন, “জুলাই থেকে পে-স্কেল কার্যকর হবে। তবে বাড়তি অর্থ পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু সময় লাগতে পারে। সচিব কমিটির সভার পর অনেক বিষয়ই স্পষ্ট হয়ে যাবে।”
চাকরিজীবীদের প্রত্যাশা
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজার পরিস্থিতির কারণে শুধু ৫০ শতাংশ নয়, আরও বেশি বেতন বৃদ্ধি প্রয়োজন। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীরা তুলনামূলক বেশি বেতন বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে আসছেন।
এদিকে পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং লাখো পেনশনভোগী।
সারসংক্ষেপ
বর্তমান পরিস্থিতিতে ১ জুলাই থেকে নবম জাতীয় পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত হলেও প্রথম ধাপে বেসিক বেতন ৫০ শতাংশ, নাকি তার বেশি বৃদ্ধি পাবে—সেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ফেসবুকে প্রচারিত শতভাগ বেতন বৃদ্ধির তথ্যের সরকারি ভিত্তি পাওয়া যায়নি। সচিব কমিটির বৈঠকের পরই এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।


