৯ম পে স্কেল নিউজ ২০২৬

নবম পে-স্কেল নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি, জুলাইয়ে কার্যকর হলেও বর্ধিত বেতন পেতে লাগতে পারে আরও কয়েক মাস

দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে সরকার। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও, কত শতাংশ বেতন বৃদ্ধি হবে, গেজেট কবে প্রকাশিত হবে এবং বর্ধিত বেতন কবে হাতে পাওয়া যাবে—এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়ায় চাকরিজীবীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও কৌতূহল বেড়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, নতুন অর্থবছর থেকেই নবম পে-স্কেল কার্যকরের নীতিগত সিদ্ধান্ত থাকলেও এর বাস্তবায়ন কৌশল, বেতন বৃদ্ধির হার এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ে এখনো চূড়ান্ত ঐকমত্যে পৌঁছানো যায়নি। ফলে লাখো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এখন সচিব কমিটির সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছেন।

সচিব কমিটির বৈঠকে হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত

অর্থ মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নবম পে-স্কেলের সুপারিশ পুনর্মূল্যায়নের জন্য গঠিত সচিব কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে বুধবার। বৈঠকে বেতন বৃদ্ধির হার, গেজেট প্রকাশ, বাস্তবায়ন পদ্ধতি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানিয়েছেন, সচিব কমিটির বৈঠকে পে-স্কেল সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, এ বৈঠকেই বহুদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নতুন পে-স্কেল আগামী ১ জুলাই থেকেই কার্যকর হবে। তবে বাস্তবে বর্ধিত বেতন হাতে পেতে দুই থেকে তিন মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। কারণ গেজেট প্রকাশ, হিসাব পুনর্নির্ধারণ এবং সফটওয়্যার সমন্বয়ের মতো প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন করতে সময় প্রয়োজন হবে।

বেসিক বৃদ্ধি ৫০ শতাংশ নাকি ১০০ শতাংশ?

নতুন পে-স্কেল নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে মূল বেতন বা বেসিক বৃদ্ধির হার নিয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রথম ধাপেই বেসিক ১০০ শতাংশ বৃদ্ধির দাবি ছড়িয়ে পড়লেও সরকারি সূত্রগুলো এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেনি।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সচিব কমিটির প্রাথমিক সুপারিশ অনুযায়ী প্রথম ধাপে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি করার প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া বিকল্প প্রস্তাব হিসেবে ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের জন্য ৪০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য ৬০ শতাংশ বৃদ্ধির বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।

তবে শতভাগ বেতন বৃদ্ধির কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা বা সিদ্ধান্ত এখন পর্যন্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এক কর্মকর্তা বলেন, “প্রথম ধাপে বেসিকের শতভাগ বৃদ্ধি নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে তথ্য প্রচার হচ্ছে, তার সঙ্গে সরকারি সিদ্ধান্তের কোনো সম্পর্ক নেই।”

জুলাইয়ে কার্যকর হলেও বেতন মিলতে পারে সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে

সরকার নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বাজেটে সংরক্ষণ করেছে। কিন্তু বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের আগে প্রজ্ঞাপন জারি, বিধিমালা সংশোধন, আইবাস (iBAS++) সিস্টেম হালনাগাদ এবং বেতন হিসাব পুনঃনির্ধারণের মতো বেশ কিছু আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হবে।

ফলে জুলাই মাস থেকে পে-স্কেল কার্যকর হলেও চাকরিজীবীরা বর্ধিত বেতন হাতে পেতে সেপ্টেম্বর অথবা অক্টোবর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে নতুন স্কেলের বেতন সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর মাসে পাওয়া যেতে পারে।

গেজেট প্রকাশের তারিখ নিয়েও অনিশ্চয়তা

নতুন পে-স্কেল নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন—গেজেট কবে প্রকাশ হবে?

অর্থ মন্ত্রণালয় পূর্বে জুন মাসের মধ্যেই গেজেট প্রকাশের ইঙ্গিত দিলেও এখনো পে-স্কেলের পূর্ণাঙ্গ কাঠামো চূড়ান্ত না হওয়ায় নির্দিষ্ট সময় জানাতে পারছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

কর্মকর্তাদের মতে, সচিব কমিটির বৈঠকে সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলে তারপর গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া শুরু হবে। ফলে বৈঠকের ফলাফলের ওপরই নির্ভর করছে নবম পে-স্কেলের ভবিষ্যৎ অগ্রগতি।

বাতিল হচ্ছে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বিশেষ সুবিধা

নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে বর্তমানে চালু থাকা বিশেষ সুবিধা বা অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধাও বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বর্তমানে ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মূল বেতনের ১০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা ১৫ শতাংশ বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন।

নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে এই সুবিধা বাতিল হবে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

সেক্ষেত্রে যদি মূল বেতন ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়, তাহলে—

  • ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের ক্ষেত্রে কার্যকর বেতন বৃদ্ধি হবে প্রায় ৪০ শতাংশ।
  • ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের ক্ষেত্রে কার্যকর বৃদ্ধি হবে প্রায় ৩৫ শতাংশ।

অর্থাৎ ঘোষিত বেতন বৃদ্ধির একটি অংশ বিশেষ সুবিধা বাতিলের মাধ্যমে সমন্বয় হয়ে যাবে।

হতাশ কর্মকর্তা-কর্মচারী নেতারা

পে-স্কেল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় থাকা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। গেজেট প্রকাশে বিলম্ব এবং বেতন বৃদ্ধির হার নিয়ে অস্পষ্টতা তাদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির সদস্য সচিব আশিকুল ইসলাম বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রত্যাশা এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিন্তু এখনো ৫০ শতাংশ নাকি ১০০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি হবে, গেজেট কবে প্রকাশ হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট ঘোষণা না আসায় উদ্বেগ বাড়ছে।

তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বর্তমান পরিস্থিতিতে চাকরিজীবীরা আর গুঞ্জন নয়, বরং সরকারের পক্ষ থেকে একটি স্পষ্ট ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেখতে চান।

অপেক্ষার প্রহর শেষ হবে কবে?

নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে বেতন বৃদ্ধির হার, গেজেট প্রকাশ এবং বর্ধিত বেতন প্রাপ্তির সময় নিয়ে বিদ্যমান অনিশ্চয়তা এখনো দূর হয়নি।

আজকের সচিব কমিটির বৈঠককে কেন্দ্র করে লাখো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর দৃষ্টি এখন সরকারের দিকে। বৈঠকে যদি বেতন বৃদ্ধি, গেজেট প্রকাশ ও বাস্তবায়ন রোডম্যাপ চূড়ান্ত হয়, তাহলে দীর্ঘ ১১ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে পারে। অন্যথায় নবম পে-স্কেল নিয়ে জল্পনা-কল্পনা ও অনিশ্চয়তা আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *