নতুন পে স্কেলে মূল বেতন বাড়লেও কমছে হরেক রকমের ভাতা, ১ জুলাই কার্যকরের প্রস্তুতি
সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রূপ নিচ্ছে। তবে এবারের পে স্কেলে বড় ধরনের চমক ও পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। মূল বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধির পরিকল্পনা থাকলেও সরকারের আর্থিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন ধরনের ভাতা কমানো বা পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াত ভাতাসহ বেশ কয়েকটি খাতে কাটছাঁট বা যৌক্তিকীকরণের প্রস্তাব নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
বুধবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে পুনর্গঠিত সচিব কমিটির এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে নবম পে স্কেলের রূপরেখা, আর্থিক প্রভাব এবং বাস্তবায়ন কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে, আগামী ১ জুলাই থেকেই নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের নীতিগত সিদ্ধান্ত ধরে রেখে জোরেশোরে পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
কেন ভাতার ওপর কোপ?
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নতুন স্কেলে মূল বেতন বা বেসিক স্যালারি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু মূল বেতন বাড়ার পর যদি বর্তমান হাড়েই অন্যান্য ভাতা দেওয়া হয়, তবে সরকারের সামগ্রিক বাজেট ও আর্থিক ব্যয়ের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হবে। ফলে বাজেটের ভারসাম্য বজায় রাখতে বিভিন্ন ভাতার হার পুনর্মূল্যায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।
যেসব ভাতায় পরিবর্তনের জোরালো আলোচনা:
বাড়িভাড়া ভাতা: বর্তমানে অঞ্চলভেদে (যেমন: ঢাকা ও অন্যান্য বিভাগীয় শহর) মূল বেতনের ৪৫ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়া ভাতা পান চাকরিজীবীরা। নতুন স্কেলে মূল বেতন বাড়লে এই বিশাল শতাংশ বজায় রাখা সরকারের পক্ষে অসম্ভব। তাই এই শতাংশ কমিয়ে একটি যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত পর্যায়ে আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
চিকিৎসা ভাতা: বর্তমানে সব গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারী সমহারে মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা করে চিকিৎসা ভাতা পেয়ে থাকেন। নতুন কাঠামোয় এ ভাতার হার পুনর্নির্ধারণ করা হতে পারে কিংবা নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেওয়া নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
শিক্ষা সহায়ক ভাতা: বর্তমানে দুই সন্তানের জন্য দেওয়া শিক্ষা সহায়ক ভাতাও পুনর্বিবেচনার আওতায় এসেছে। এ ক্ষেত্রে খরচের সর্বোচ্চ সীমা (সিলিং) নির্ধারণ করে দেওয়া হতে পারে।
যাতায়াত ভাতা: নির্দিষ্ট গ্রেডের কর্মচারীদের মাসিক যাতায়াত ভাতা এবং প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানি সুবিধার বর্তমান হার পুনর্মূল্যায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।
অপ্রাসঙ্গিক ভাতা বিলোপ: বর্তমান সময়ে কার্যকারিতা হারিয়েছে বা খুবই সীমিত গুরুত্ব রয়েছে—এমন কিছু ছোটখাটো ভাতা পুরোপুরি বাতিল করার প্রস্তাব এসেছে। তবে কোন কোন ভাতা বিলোপ হবে, তা চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের আগে প্রকাশ করা হচ্ছে না।
ব্যয়ের বিশাল সংস্থান ও জবাবদিহির শর্ত
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, নতুন অর্থবছর (১ জুলাই) থেকেই যেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নবম পে স্কেলের আওতায় বেতন-ভাতা পেতে পারেন, সে জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ বড় অংকের বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
তবে এই আর্থিক সুবিধার বিপরীতে কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন:
“সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বেতন বাড়ানো হচ্ছে, এটা ঠিক। তবে এর সঙ্গে সমানতালে জনপ্রশাসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সেবার মানও বাড়াতে হবে। শুধু আর্থিক সুবিধা ভোগ করলেই হবে না, সাধারণ নাগরিকদের সেবাপ্রাপ্তি কতটা সহজ হচ্ছে—তা নিশ্চিত করা আমাদের মূল লক্ষ্য।”
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নীতিগতভাবে ১ জুলাই থেকে কার্যকরের পরিকল্পনা থাকলেও ভাতার হ্রাস-বৃদ্ধি ও সামগ্রিক বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং রূপরেখা স্পষ্ট হবে আনুষ্ঠানিক গেজেট প্রকাশের পর। সরকারি চাকরিজীবীরা একদিকে মূল বেতন বাড়ার আনন্দে থাকলেও, ভাতার কাটছাঁট তাদের প্রাপ্তির খাতায় কতটা প্রভাব ফেলবে—তা নিয়ে এখন প্রশাসনে চলছে নানা সমীকরণ।


