বৈষম্য । দাবীর খতিয়ান । পুন:বিবেচনা

নতুন পে স্কেলে বাড়িভাড়া নিয়ে প্রশ্ন: ১৫তম গ্রেডের চেয়ে ১৬তম গ্রেডে বেশি ভাতা পাওয়ার সম্ভাবনা

জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এর আওতায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাড়িভাড়া ভাতার নতুন হার প্রকাশের পর গ্রেডভিত্তিক ভাতা নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ১৫তম ও ১৬তম গ্রেডের ক্ষেত্রে মূল বেতন এবং বাড়িভাড়া ভাতার হার একসঙ্গে বিবেচনা করলে নিচের গ্রেডে তুলনামূলক বেশি বাড়িভাড়া পাওয়ার একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

অর্থ বিভাগের প্রকাশিত ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’-এর সারণিতে দেখা যায়, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার জন্য গ্রেড-২০-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-১৬-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত মূল বেতনের ৬০ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে গ্রেড-১৫ থেকে গ্রেড-১০-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত মূল বেতনের ৫০ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।

অর্থাৎ, একই সঙ্গে গ্রেড-১৬-এর জন্য বাড়িভাড়ার হার ৬০ শতাংশ এবং গ্রেড-১৫-এর জন্য ৫০ শতাংশ হওয়ায় গ্রেড পরিবর্তনের সীমার কাছে একটি ব্যতিক্রমী হিসাব তৈরি হচ্ছে।

১৫ ও ১৬তম গ্রেডে কী হচ্ছে?

নতুন বেতনস্কেলে গ্রেড-১৫-এর প্রারম্ভিক মূল বেতন ২২ হাজার ৮০০ টাকা, আর গ্রেড-১৬-এর প্রারম্ভিক মূল বেতন ২১ হাজার ৯০০ টাকা

ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রারম্ভিক মূল বেতন ধরে হিসাব করলে—

গ্রেড-১৫:
মূল বেতন = ২২,৮০০ টাকা
বাড়িভাড়া = ৫০%
= ১১,৪০০ টাকা

গ্রেড-১৬:
মূল বেতন = ২১,৯০০ টাকা
বাড়িভাড়া = ৬০%
= ১৩,১৪০ টাকা

অর্থাৎ, শুধু বাড়িভাড়া ভাতা বিবেচনা করলে গ্রেড-১৬-এর কর্মচারী গ্রেড-১৫-এর কর্মচারীর তুলনায় ১,৭৪০ টাকা বেশি বাড়িভাড়া পেতে পারেন।

এখানেই তৈরি হচ্ছে মূল প্রশ্ন—উচ্চতর গ্রেডে থাকা কর্মচারীর মূল বেতন বেশি হলেও নিম্নতর গ্রেডে বাড়িভাড়া বেশি হওয়ার এই কাঠামো কতটা যৌক্তিক এবং প্রশাসনিকভাবে এটি কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে?

শুধু ঢাকায় নয়, অন্য এলাকাতেও একই ধরনের পার্থক্য

প্রকাশিত সারণি অনুযায়ী, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, রংপুর, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও বগুড়া সিটি করপোরেশন এবং সাভার ও কক্সবাজার পৌর এলাকায় গ্রেড-১৬ থেকে গ্রেড-২০-এর জন্য মূল বেতনের ৫০ শতাংশ, আর গ্রেড-১০ থেকে গ্রেড-১৫-এর জন্য ৪০ শতাংশ বাড়িভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।

সেই হিসাবে গ্রেড-১৫ ও ১৬-এর প্রারম্ভিক বেতন দিয়ে হিসাব করলে—

  • গ্রেড-১৫: ২২,৮০০ × ৪০% = ৯,১২০ টাকা
  • গ্রেড-১৬: ২১,৯০০ × ৫০% = ১০,৯৫০ টাকা

এ ক্ষেত্রেও গ্রেড-১৬-এর বাড়িভাড়া গ্রেড-১৫-এর চেয়ে ১,৮৩০ টাকা বেশি হয়।

জেলা সদর, উপজেলা ও অন্যান্য এলাকার ক্ষেত্রেও গ্রেড-১৬ থেকে ২০-এর জন্য ৪৫ শতাংশ এবং গ্রেড-১০ থেকে ১৫-এর জন্য ৩৫ শতাংশ বাড়িভাড়া নির্ধারণের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

২০১৫ সালের কাঠামোর সঙ্গে পার্থক্য কোথায়?

২০১৫ সালের জাতীয় বেতনস্কেলে বাড়িভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু শতাংশ নয়, ‘ন্যূনতম টাকা’ নির্ধারণের ব্যবস্থাও ছিল। সরকারি প্রকাশিত ২০১৫ সালের বেতনস্কেলের নথিতে দেখা যায়, বিভিন্ন মূল বেতনের সীমার জন্য শতাংশের পাশাপাশি ন্যূনতম বাড়িভাড়ার অঙ্ক নির্ধারণ করা হয়েছিল। যেমন ঢাকায় ৯,৭০০ টাকা পর্যন্ত মূল বেতনে ৬৫ শতাংশ হলেও ন্যূনতম ৫,৬০০ টাকা এবং ৯,৭০১ থেকে ১৬,০০০ টাকা পর্যন্ত মূল বেতনে ৬০ শতাংশ হলেও ন্যূনতম ৬,৪০০ টাকা নির্ধারিত ছিল।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—২০১৫ সালের কাঠামোতেও বেতনসীমা পরিবর্তনের জায়গায় শতাংশ ও ন্যূনতম অঙ্কের সমন্বয়ের কারণে কিছু সীমান্তবর্তী ক্ষেত্রে পার্থক্য তৈরি হতে পারত। তাই শুধু ‘ন্যূনতম বাড়িভাড়া ছিল’ বলেই সব গ্রেডে কখনোই নিচের গ্রেডের বাড়িভাড়া বেশি হয়নি—এমন সরল সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না।

তবে ২০২৬ সালের প্রকাশিত সারণির ক্ষেত্রে আলোচনার জায়গাটি আরও স্পষ্ট, কারণ গ্রেড-১৬ থেকে ২০-এর জন্য আলাদা উচ্চ শতাংশ এবং গ্রেড-১০ থেকে ১৫-এর জন্য তুলনামূলক কম শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?

বেতন কাঠামোয় গ্রেড যত ওপরে যায়, সাধারণত মূল বেতনও বাড়ে। ফলে একই এলাকার জন্য বাড়িভাড়া যদি মূল বেতনের নির্দিষ্ট শতাংশ হিসেবে দেওয়া হয়, তাহলে উচ্চতর গ্রেডে থাকা কর্মচারীর বাড়িভাড়াও স্বাভাবিকভাবে বেশি হওয়ার কথা।

কিন্তু ২০২৬ সালের কাঠামোয় গ্রেড-১৬ ও ১৫-এর সীমায় শতাংশের হার পরিবর্তনের কারণে মূল বেতন কম হওয়া সত্ত্বেও গ্রেড-১৬-এর বাড়িভাড়া বেশি হওয়ার গাণিতিক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

এটি মূলত ‘হার-ভিত্তিক ভাতা’ বনাম ‘গ্রেডভিত্তিক বেতনক্রম’—এই দুই নীতির মধ্যে সমন্বয়ের প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে।

সমাধানের সম্ভাব্য জায়গা কোথায়?

এ ধরনের অসামঞ্জস্য দূর করতে চাইলে নীতিগতভাবে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে—

১. গ্রেডভিত্তিক বাড়িভাড়ার হার পুনর্বিন্যাস করা।
২. ন্যূনতম বাড়িভাড়ার অঙ্ক নির্ধারণ করা, যাতে নিম্ন গ্রেডে হার বেশি হলেও উচ্চ গ্রেডের তুলনায় ভাতা অস্বাভাবিকভাবে বেশি না হয়।
৩. মূল বেতনের সঙ্গে বাড়িভাড়ার একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ ধাপ তৈরি করা।
৪. গ্রেড পরিবর্তনের সীমায় যাতে বাড়িভাড়া হঠাৎ কমে বা বেড়ে গিয়ে ‘ভাতা ইনভার্সন’ তৈরি না হয়, সে বিষয়ে একটি সুরক্ষা বিধান রাখা।

শেষ কথা

নতুন জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এ মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ২০টি গ্রেডই নতুন কাঠামোর আওতায় এসেছে। একই সঙ্গে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, টিফিন, মোবাইল ও অন্যান্য ভাতার কাঠামোও নতুন করে নির্ধারণ করা হয়েছে।

কিন্তু গ্রেড-১৫ ও গ্রেড-১৬-এর মতো কাছাকাছি গ্রেডে বাড়িভাড়ার হার পরিবর্তনের কারণে তৈরি হওয়া পার্থক্যটি প্রশাসনিকভাবে পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে কি না—সেটিই এখন আলোচনার বিষয়। বিশেষ করে একজন কর্মচারীর পদোন্নতির পর মূল বেতন বাড়লেও যদি কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বাড়িভাড়া কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে সেটি ভবিষ্যতে বেতন নির্ধারণ ও ভাতা ব্যবস্থাপনায় প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।

তাই নতুন পে-স্কেলের বাড়িভাড়া কাঠামো বাস্তবায়নের আগে বা প্রয়োগের ক্ষেত্রে গ্রেড পরিবর্তনের সীমান্তে ভাতার অস্বাভাবিক ওঠানামা ঠেকাতে স্পষ্ট নির্দেশনা বা সংশোধিত হিসাবপদ্ধতি প্রয়োজন কি না, তা নিয়ে অর্থ বিভাগের ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *