নবম পে-স্কেলের গেজেটে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরাও অন্তর্ভুক্ত
দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬-এর আওতায় এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মচারীদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি আবারও স্পষ্ট হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এর আগে জানানো হয়েছিল, জাতীয় বেতনস্কেল অনুযায়ী বেতন-ভাতা পাওয়া এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরাও নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা পাবেন।
এতে দেশের বিপুলসংখ্যক এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর মধ্যে স্বস্তি তৈরি হয়েছে। কারণ, নতুন পে-স্কেল ঘোষণার পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা নতুন কাঠামোয় কীভাবে বেতন পাবেন—এ নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল।
এমপিওভুক্তরা কেন পে-স্কেলের আওতায়?
এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা প্রচলিত জাতীয় বেতনস্কেলের নির্ধারিত গ্রেড অনুযায়ী মূল বেতন পেয়ে থাকেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, যেহেতু এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা জাতীয় বেতনস্কেল অনুসারে বেতন পান, তাই নতুন জাতীয় বেতনস্কেলের সঙ্গেও তাদের বেতন কাঠামো সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদারও জানিয়েছিলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতো এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরাও নতুন বেতন ও ভাতা কাঠামোর সুবিধা পাবেন।
গেজেট প্রকাশের পর বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে। অনুমোদিত কাঠামোয় ২০টি গ্রেড বহাল রেখে নতুন মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে। সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ১ম গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
এখন এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো—তাদের নিজ নিজ পদ ও গ্রেডের বর্তমান বেতন নতুন জাতীয় বেতনস্কেলের সংশ্লিষ্ট স্কেলের সঙ্গে কীভাবে সমন্বয় করা হবে এবং কোন ধাপে কত শতাংশ বেতন কার্যকর হবে।
বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি কীভাবে কার্যকর হবে?
জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ বাস্তবায়নে মূল বেতন ধাপে ধাপে কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। ফলে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও শুধু নতুন স্কেলের অঙ্ক দেখলেই চূড়ান্ত মাসিক প্রাপ্যতা নির্ধারণ করা যাবে না। সংশ্লিষ্ট গ্রেড, বর্তমান মূল বেতন, বেতন নির্ধারণের নিয়ম, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা এবং অন্যান্য প্রযোজ্য সুবিধা বিবেচনা করতে হবে।
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পে ফিক্সেশন। একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক বা কর্মচারীর পুরোনো মূল বেতন থেকে নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণের পরই প্রকৃত নতুন মূল বেতন জানা যাবে।
বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ
এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের অন্যতম দাবি ছিল বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা বৃদ্ধি। সাম্প্রতিক সময়ে এমপিওভুক্তদের বাড়িভাড়া ভাতা মূল বেতনের ১৫ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি ধাপে ধাপে কার্যকর করা হয়েছে।
তাই নতুন পে-স্কেলের মূল বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে বাড়িভাড়া ও অন্যান্য ভাতা কীভাবে সমন্বিত হবে—এটি শিক্ষক-কর্মচারীদের মোট মাসিক প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রায় কয়েক লাখ শিক্ষক-কর্মচারীর ওপর প্রভাব
এটি শুধু কয়েক হাজার মানুষের বিষয় নয়। ব্যানবেইসের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে প্রায় ৩ লাখ ৯৮ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী, মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে প্রায় পৌনে ২ লাখ এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে ২৩ হাজারের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন।
অর্থাৎ, নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে এমপিওভুক্তদের অন্তর্ভুক্তি বাস্তবায়িত হলে এর আর্থিক প্রভাব হবে ব্যাপক।
আগে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল
নবম পে-স্কেল অনুমোদনের পর এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা নতুন স্কেলের আওতায় থাকবেন কি না—এ নিয়ে একাধিক পর্যায়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। এমনকি ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভা বৈঠকের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিবের বক্তব্যের বরাত দিয়ে সংবাদ প্রকাশ হয়েছিল যে, তখনও এমপিওভুক্তদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি চূড়ান্ত হয়নি।
এর পরই অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের নতুন বেতন ও ভাতা কাঠামোর সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়।
এখন শিক্ষক-কর্মচারীদের নজর যেসব বিষয়ে
গেজেট ও সংশ্লিষ্ট বাস্তবায়ন নির্দেশনার আলোকে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয় হলো—
- নতুন স্কেলে কার কোন গ্রেড নির্ধারিত হবে;
- বর্তমান মূল বেতন থেকে নতুন মূল বেতন কীভাবে ফিক্সেশন হবে;
- ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কত শতাংশ বেতন কার্যকর হবে;
- পরবর্তী ধাপে বেতন কীভাবে বৃদ্ধি পাবে;
- বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা কীভাবে সমন্বয় হবে;
- পূর্বের বেতন ও নতুন বেতনের পার্থক্য বকেয়া হিসেবে কীভাবে সমন্বয় হবে;
- এমপিও সফটওয়্যার/পে-রোল ব্যবস্থায় নতুন বেতন কখন প্রতিফলিত হবে।
সার্বিকভাবে কী দাঁড়াচ্ছে?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি হলো—এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জাতীয় বেতনস্কেলের বাইরে রাখা হচ্ছে না। বরং জাতীয় বেতনস্কেল অনুসরণ করে তাদের বেতন নির্ধারিত হওয়ার কাঠামো বহাল থাকায় নতুন পে-স্কেলের সঙ্গে তাদের বেতনও সমন্বয়ের পথ তৈরি হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্যও এ বিষয়টি সমর্থন করে।
তবে কোন শিক্ষক বা কর্মচারী ঠিক কত টাকা পাবেন, সেটি নির্ধারণের জন্য শুধু ‘এমপিওভুক্ত’ পরিচয় যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট পদ, গ্রেড, বর্তমান মূল বেতন এবং নতুন বেতন নির্ধারণের বিধি অনুযায়ী আলাদা হিসাব করতে হবে।
ফলে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নতুন পে-স্কেলের বেতন নির্ধারণের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নির্দেশনা এবং সংশ্লিষ্ট এমপিও/পে-রোল ব্যবস্থায় তা কার্যকর হওয়া।
এক কথায়: নবম জাতীয় পে-স্কেলের পরিধিতে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে। এখন অপেক্ষা বাস্তব প্রয়োগের—কে কোন গ্রেডে কত মূল বেতন পাবেন, কোন তারিখ থেকে কত অংশ কার্যকর হবে এবং বকেয়া কীভাবে সমন্বয় হবে, তার বিস্তারিত হিসাবের।



