শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নতুন পরিপত্র জারি ২০২৬ । বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এডহক কমিটির সভাপতি হতে লাগবে স্নাতক ডিগ্রি?
দেশের বেসরকারি নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শৃঙ্খলা ও মানোন্নয়নে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে সরকার। এখন থেকে এসব প্রতিষ্ঠানের এডহক কমিটির সভাপতি হতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ন্যূনতম স্নাতক (পাস) বা সমমানের শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন হতে হবে। সোমবার (১৬ মার্চ) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিপত্র জারি করা হয়েছে।
উপসচিব সাইয়েদ এ. জেড. মোরশেদ আলী স্বাক্ষরিত এই পরিপত্রে এডহক কমিটি গঠন এবং সভাপতি মনোনয়নের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। জনস্বার্থে জারিকৃত এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে জানানো হয়েছে।
পরিপত্রের মূল বিষয়সমূহ:
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারি করা নির্দেশনায় প্রধানত দুটি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে:
১. সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা: পরিপত্রে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, এডহক কমিটির সভাপতির সাধারণ শিক্ষাগত যোগ্যতা হবে স্নাতক বা সমমান। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে যদি কোনো ব্যক্তির শিক্ষা বিস্তার ও উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান বা বিশেষ কোনো যোগ্যতা থাকে, তবে মন্ত্রণালয় প্রয়োজনবোধে শিথিলযোগ্য সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
২. মনোনয়ন প্রক্রিয়া: এডহক কমিটির সভাপতি মনোনয়নের জন্য একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠান প্রধানকে (অধ্যক্ষ/প্রধান শিক্ষক) সভাপতির জন্য ৩ জন যোগ্য ব্যক্তির নাম ও জীবনবৃত্তান্তসহ প্রস্তাব পাঠাতে হবে।
মহানগর এলাকার প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই প্রস্তাব বিভাগীয় কমিশনারের মাধ্যমে এবং অন্যান্য এলাকার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও জেলা প্রশাসকের (ডিসি) মাধ্যমে পাঠাতে হবে।
প্রস্তাবিত ৩ জনের তালিকায় সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের প্রথম শ্রেণির বর্তমান বা অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদ, স্থানীয় শিক্ষানুরাগী বা সমাজসেবক এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতাদের নাম রাখা যাবে।
প্রাপ্ত প্রস্তাবসমূহ যাচাই-বাছাই করে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড যেকোনো একজনকে সভাপতি হিসেবে মনোনীত করবে।
প্রেক্ষাপট ও আইনি ভিত্তি:
গত ১০ মার্চ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি গঠন সংক্রান্ত এক মতবিনিময় সভায় এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পরিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক) গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা, ২০২৪’ (৩১ আগস্ট ২০২৫-এর সংশোধনীসহ) অনুযায়ী এই নির্দেশনা কার্যকর হবে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের ক্ষেত্রে প্রবিধি ৭৫(২) এবং অন্যান্য বোর্ডের ক্ষেত্রে প্রবিধি ৭৪(২) অনুসরণ করে এই কমিটি গঠন করতে হবে।
জনমনে প্রতিক্রিয়া:
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে শিক্ষিত নেতৃত্বের উপস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাড়বে এবং শিক্ষার মানোন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। ইতিপূর্বে সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করার বিষয়ে আলোচনা উঠলে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছিল, যার প্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় এই কঠোর অবস্থান নিশ্চিত করল।

কমিটি গঠন করে দিবে কে?
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এই এডহক কমিটি গঠনের চূড়ান্ত অনুমোদনের ক্ষমতা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির হাতে নয়, বরং এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
নিচে বিষয়টি সহজভাবে বুঝিয়ে বলা হলো:
১. প্রস্তাব পাঠানোর দায়িত্ব (প্রতিষ্ঠান প্রধান)
শুরুতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ বা প্রধান শিক্ষক সভাপতি হওয়ার যোগ্য এমন ৩ জন ব্যক্তির একটি প্যানেল তৈরি করবেন। এই তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের জীবনবৃত্তান্তসহ প্রস্তাবটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পাঠাতে হয়।
২. যাচাই-বাছাই (প্রশাসনিক কর্মকর্তা)
প্রস্তাবিত নামগুলো সরাসরি বোর্ডে যায় না। এটি একটি নির্দিষ্ট চ্যানেলে যায়:
মহানগর এলাকার জন্য: বিভাগীয় কমিশনারের মাধ্যমে।
জেলা/উপজেলা এলাকার জন্য: সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং জেলা প্রশাসকের (ডিসি) মাধ্যমে।
৩. চূড়ান্ত গঠন ও অনুমোদন (শিক্ষা বোর্ড)
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো এটি। জেলা প্রশাসক বা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে যাচাইকৃত প্রস্তাবটি যখন সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডে (যেমন: ঢাকা শিক্ষা বোর্ড) পৌঁছায়, তখন বোর্ডের চেয়ারম্যান বা বোর্ড কর্তৃপক্ষ সেই ৩ জনের মধ্য থেকে একজনকে সভাপতি হিসেবে মনোনীত করে এডহক কমিটি গঠন করে দেন।
সংক্ষেপে: কমিটি গঠনের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড। তবে সভাপতি হিসেবে কার নাম আসবে, সেই প্রাথমিক প্রস্তাবনা তৈরি করেন প্রতিষ্ঠান প্রধান এবং সেটি সুপারিশ করেন জেলা প্রশাসক (ডিসি) বা বিভাগীয় কমিশনার।



