লাইফ ভেরিফিকেশন ও ইএফটি জটিলতায় আটকে আছে পেনশনভোগীদের কল্যাণ ভাতার টাকা
সরকারি চাকরিতে কর্মরত অবস্থায় মৃত ব্যক্তির পরিবারকে আর্থিক সুরক্ষা দিতে সরকার মাসিক পেনশন ও কল্যাণ তহবিল থেকে মাসিক অনুদানের ব্যবস্থা রেখেছে। কিন্তু ডিজিটাল পদ্ধতিতে ইএফটি (Electronic Fund Transfer) এবং লাইফ ভেরিফিকেশনের মারপ্যাঁচে পড়ে অনেক সাধারণ মানুষ এখন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। সম্প্রতি টাঙ্গাইলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এমন অনেক অভিযোগ পাওয়া গেছে যেখানে ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হওয়ার পরও মাসের পর মাস ভাতা পাচ্ছেন না মৃত কর্মচারীর পরিবার।
ঘটনার প্রেক্ষাপট
ভুক্তভোগীদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে মৃত্যুবরণ করা একজন সরকারি কর্মচারীর বিধবা স্ত্রী নিয়মিত পেনশনের পাশাপাশি কল্যাণ তহবিল থেকে মাসিক ২,০০০ টাকা অনুদান পেয়ে আসছিলেন। ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এই ভাতা নিয়মিত আসলেও ফেব্রুয়ারি মাস থেকে তা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। ব্যাংক থেকে জানানো হয় ‘লাইফ ভেরিফিকেশন’ বা জীবিত থাকার প্রমাণ দাখিল করতে হবে। যথাযথভাবে তা সম্পন্ন করার পরও বিগত তিন মাস ধরে কোনো অর্থ জমা হয়নি ভুক্তভোগীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে।
কেন এই জটিলতা?
পেনশন ও ভাতা ব্যবস্থাপনার সাথে সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ মহলের মতে, এই সমস্যার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ থাকতে পারে:
১. ব্যাংকের ইএফটি (EFT) ডাটা এন্ট্রি ভুল: ব্যাংকের কর্মকর্তারা অনেক সময় ভেরিফিকেশনের তথ্য সিস্টেমে আপডেট করার সময় ভুল করেন। ফলে কেন্দ্রীয় সার্ভার থেকে ইএফটি কমান্ড সচল হয় না। ২. বাজেট ও অর্থ বরাদ্দ: অনেক সময় স্থানীয় ডিডিও (DDO) বা সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে অর্থ বরাদ্দ দেরিতে আসলে কেন্দ্রীয়ভাবে পেমেন্ট আটকে যায়। তবে পেনশনের ক্ষেত্রে বাজেট ঘাটতির অজুহাত ব্যাংকের পক্ষ থেকে দেওয়াটা বিভ্রান্তিকর হতে পারে। ৩. অনলাইন সিস্টেম আপডেট: গত দুই বছর ধরে এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ অনলাইন ভিত্তিক হওয়ায় বছরে একবার স্বশরীরে লাইফ ভেরিফিকেশন বাধ্যতামূলক। এই ডাটা যদি সিএএফও (CAFO) বা অডিট অফিসে না পৌঁছায়, তবে অর্থ ছাড় হয় না।
ব্যাংকের দায়সারা বক্তব্য ও ভোগান্তি
ভুক্তভোগীরা যখন ব্যাংকে যোগাযোগ করেন, তখন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কেবল ‘ভেরিফিকেশন করেছি’ বলেই দায়িত্ব শেষ করে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্মকর্তারা নিজেদের ব্যক্তিগত পেনশনের উদাহরণ দিয়ে বলেন যে তারাও টাকা পাচ্ছেন না, যা সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের মনে আরও আস্থার সংকট তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ও সমাধান
কল্যাণ তহবিলের ভাতার মেয়াদ সাধারণত ১০-১৫ বছর পর্যন্ত থাকে। ভুক্তভোগীর ক্ষেত্রে এই মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত থাকায় আইনি কোনো বাধা নেই। এই পরিস্থিতিতে করণীয় হলো:
অডিট অফিস বা হিসাবরক্ষণ অফিস: কেবল ব্যাংকের ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় উপজেলা বা জেলা হিসাবরক্ষণ অফিসে (Accounts Office) গিয়ে পেনশন শাখার সাথে কথা বলতে হবে। পেমেন্টটি কেন ‘পেন্ডিং’ আছে তা তারা সিস্টেমে দেখলেই বলতে পারবেন।
অনলাইন স্ট্যাটাস চেক: পেনশনার নিজেই অনলাইন পোর্টালে গিয়ে তার ইএফটি বা ভেরিফিকেশন স্ট্যাটাস চেক করতে পারেন।
লিখিত আবেদন: মৌখিক কথায় কাজ না হলে ব্যাংক ম্যানেজার এবং জেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে হবে।
ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্য হচ্ছে সেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় সহজভাবে পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু কারিগরি ত্রুটি বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অবহেলার কারণে পেনশনাররা যেন হয়রানির শিকার না হন, সেদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।
আপনার জন্য ব্যক্তিগত পরামর্শ:
১. আপনার আম্মার বিষয়টি যেহেতু ইএফটি-তে জমা হয়, তাই আপনি সরাসরি জেলা হিসাবরক্ষণ অফিস (Accounts Office)-এ গিয়ে পেনশন ডেস্কে যোগাযোগ করুন। সেখানে আপনার আম্মার পিএডি (Pension ID) বা এনআইডি দেখালে তারা কম্পিউটার থেকেই বলে দিতে পারবেন পেমেন্টটি কেন স্টপ হয়ে আছে। ২. অনেক সময় ব্যাংক থেকে লাইফ ভেরিফিকেশন করার পর সেটি হিসাবরক্ষণ অফিসে পৌঁছাতে সময় নেয় বা সিস্টেমে “Validation Fail” দেখায়। এটি ঠিক করার প্রধান জায়গা হলো অডিট অফিস বা হিসাবরক্ষণ অফিস। ৩. ব্যাংকের বাজেট ঘাটতির অজুহাতটি খুব একটা যুক্তিযুক্ত নয়, কারণ পেনশনের টাকা একটি নির্দিষ্ট কোড থেকে সরাসরি সরকারি কোষাগার থেকে আসে। সম্ভবত ডেটা ট্রান্সমিশনে কোনো ত্রুটি হয়েছে।
আশা করি দ্রুতই আপনার সমস্যার সমাধান হবে। আপনার আম্মার জন্য শুভকামনা রইল।



