নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন চূড়ান্ত পর্যায়ে, ১ জুলাই থেকেই কার্যকর; দুই ধাপে বেতন বৃদ্ধি
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বহুল প্রত্যাশিত নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। বুধবার (২৪ জুন) সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সচিব কমিটির গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন সংক্রান্ত একাধিক নীতিগত ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি এবং নিম্ন আয়ের সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান বেতন বৈষম্য কমিয়ে একটি তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
১ জুলাই থেকেই কার্যকর, পরে মিলবে অ্যারিয়ার
বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, আগামী ১ জুলাই থেকেই নবম পে-স্কেল কার্যকর হিসেবে গণ্য হবে। তবে প্রশাসনিক প্রস্তুতি, আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং ডিজিটাল বেতন ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের কারণে বর্ধিত বেতন হাতে পেতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আরও দুই থেকে তিন মাস অপেক্ষা করতে হতে পারে।
তবে এই বিলম্বে কর্মচারীদের কোনো আর্থিক ক্ষতি হবে না। কারণ পে-স্কেল কার্যকরের তারিখ হিসেবে ১ জুলাই বহাল থাকবে এবং পরবর্তী সময়ে বর্ধিত বেতনের বকেয়া অর্থ বা অ্যারিয়ার একসঙ্গে পরিশোধ করা হবে।
তিন ধাপ নয়, বাস্তবায়ন হবে দুই ধাপে
প্রাথমিকভাবে নতুন পে-স্কেল তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা থাকলেও সরকারি চাকরিজীবীদের বিভিন্ন সংগঠনের দাবি এবং বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় তা সংশোধন করা হয়েছে। এখন মাত্র দুই ধাপে পুরো পে-স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বৈঠক সূত্রে জানা গেছে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, দুই ধাপে বাস্তবায়নের ফলে কর্মচারীরা দ্রুত বর্ধিত বেতনের সুবিধা পাবেন এবং দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা কমবে।
নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা পাবেন বেশি সুবিধা
বৈঠকে আর্থিক সক্ষমতা ও সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা প্রথম ধাপেই প্রস্তাবিত বেতন বৃদ্ধির ৬০ শতাংশ সুবিধা পাবেন। অন্যদিকে ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে প্রথম ধাপে ৪০ শতাংশ বর্ধিত বেতন কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা লাঘব করতে সহায়ক হবে এবং বেতন কাঠামোতে বিদ্যমান বৈষম্য কমাতে ভূমিকা রাখবে।
গ্রেড বৈষম্য দূর করতে বিশেষ রোডম্যাপ
বৈঠকে ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডভুক্ত কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের বেতন বৈষম্যের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। এ লক্ষ্যে একটি পৃথক রোডম্যাপ তৈরির সিদ্ধান্ত হয়েছে, যার মাধ্যমে বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যে বেতনের অসামঞ্জস্য দূর করা হবে।
এছাড়া শুধু মূল বেতন বৃদ্ধি নয়, বরং বর্তমান বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়িভাড়া ভাতা ও চিকিৎসা ভাতাও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর বিষয়ে নীতিগত সম্মতি পাওয়া গেছে।
ডিজিটাল হবে বেতন নির্ধারণ ও ফিক্সেশন
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অতীতের জটিলতা ও বিলম্ব এড়াতে বেতন নির্ধারণ বা পে-ফিক্সেশন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেতন নির্ধারণ, গ্রেড অনুযায়ী সমন্বয় এবং অ্যারিয়ার হিসাব সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে ইতোমধ্যে কারিগরি রূপরেখা প্রস্তুত করা হয়েছে বলে বৈঠক সূত্রে জানা গেছে।
দ্রুত শেষ হচ্ছে আইনি ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি
নবম পে-স্কেল ঘোষণার পর যাতে কোনো আইনি জটিলতা বা প্রযুক্তিগত ত্রুটি না দেখা দেয়, সেজন্য সংশ্লিষ্ট বিধিমালা সংশোধন এবং আইনি ভেটিংয়ের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি অর্থ মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মধ্যে সমন্বয় কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনের অপেক্ষায় সরকারি চাকরিজীবীরা
বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানান, নতুন পে-স্কেল নিয়ে অনুষ্ঠিত আলোচনা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এখন প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি করা। প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পরই নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে।
নতুন এই বেতন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে প্রায় কয়েক লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বিপুলসংখ্যক পেনশনভোগী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উপকৃত হবেন বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে। এর ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার অবসান ঘটবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসনেও নতুন কর্মোদ্যম সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।



