নবম বেতনকাঠামো শিগগিরই মন্ত্রিসভায়, অনুমোদনের পরই প্রজ্ঞাপন—অর্থমন্ত্রীর আশ্বাস
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের কাজ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। কাজ শেষ হলেই প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। মন্ত্রিসভার অনুমোদন মিললে দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ফলে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।
গত বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অর্থমন্ত্রী জানান, নতুন বেতনকাঠামো নিয়ে সরকারের কাজ অব্যাহত রয়েছে এবং প্রজ্ঞাপন জারি হতে খুব বেশি সময় লাগবে না। তিনি বলেন, “কাজ চলছে। বেতনকাঠামো হবে এবং প্রজ্ঞাপন জারি হতে বেশি সময় লাগবে না।”
মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের প্রস্তুতি
সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ প্রস্তুত করতে গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়।
অর্থ বিভাগের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, কমিটির সুপারিশ প্রায় চূড়ান্ত। এখন তা পর্যালোচনা শেষে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে।
কমিটিতে রয়েছেন—
- প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব
- অর্থসচিব
- জনপ্রশাসনসচিব
- আইনসচিব
- প্রতিরক্ষাসচিব
- মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা সচিব
- স্বাস্থ্যসেবা সচিব
- সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার
- হিসাব মহানিয়ন্ত্রক
আইএমএফের সঙ্গে বেতনকাঠামোর সম্পর্ক নেই
নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন করলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে নতুন ঋণ পাওয়া ব্যাহত হতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, আইএমএফের ঋণের সঙ্গে নতুন বেতনকাঠামোর কোনো সম্পর্ক নেই।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ বিষয়ে নানা ধরনের সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি বারবার মন্তব্য করতে চান না; যথাসময়ে সরকারই আনুষ্ঠানিকভাবে সব জানাবে।
অর্থ বিভাগের দায়িত্বশীল সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, আইএমএফ নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে আপত্তি জানায়নি। তবে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের উৎস এবং রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর বিষয়ে জানতে চেয়েছে।
নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা
আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের ৫৫০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ কর্মসূচি ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে শুরু হলেও পাঁচ কিস্তি পাওয়ার পর তা আর এগোয়নি।
বর্তমানে ৪০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলছে। আগামী অক্টোবর মাসে ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভায় এ বিষয়ে আরও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
এক যুগ পর নবম জাতীয় বেতন কমিশন
অষ্টম বেতন কমিশনের প্রায় এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার ২৩ সদস্যবিশিষ্ট নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে।
সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খান কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।
কমিশনের সুপারিশে বলা হয়—
- বর্তমান ২০টি গ্রেড বহাল থাকবে।
- বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
- সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
- সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বাস্তবায়নে অতিরিক্ত ব্যয়ের হিসাব
বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য বছরে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়।
নতুন বেতনকাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে বলে কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা
নাসিমুল গনি নেতৃত্বাধীন কমিটি শুরুতে তিন অর্থবছরে এবং পরে দুই অর্থবছরে বাস্তবায়নের খসড়া প্রস্তাব দেয়।
তবে সর্বশেষ আলোচনায় কমিটির সদস্যরা চলতি অর্থবছরে মূল বেতন বৃদ্ধি এবং পরবর্তী অর্থবছরে বিভিন্ন ভাতা কার্যকর করার পক্ষে মত দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বাজেটেই ছিল ঘোষণা
গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী ঘোষণা দেন, ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে।
তিনি বলেন, প্রায় ১১ বছর ধরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা একই বেতনকাঠামোতে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। এ সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাজেটে অতিরিক্ত বরাদ্দের ইঙ্গিত
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া ‘জনপ্রশাসন-নিট’ খাতে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেশি।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, এই অতিরিক্ত বরাদ্দের মধ্যে অন্তত ৪৪ হাজার কোটি টাকা সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক এবং পেনশনভোগীদের নতুন বেতন ও সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে।
কী হতে পারে পরবর্তী ধাপ
সরকারি সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো মন্ত্রিসভায় প্রস্তাব উপস্থাপন ও অনুমোদন। অনুমোদন মিললেই অর্থ বিভাগ নতুন বেতনকাঠামোর সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করবে। এরপর বাস্তবায়নের সময়সূচি, বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি, ভাতা এবং অন্যান্য প্রশাসনিক নির্দেশনা প্রকাশ করা হবে।
সরকারের সাম্প্রতিক বক্তব্য, বাজেটে অতিরিক্ত বরাদ্দ এবং কমিটির সুপারিশ প্রায় চূড়ান্ত হওয়ার তথ্য—সব মিলিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল প্রত্যাশিত নবম বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন এখন চূড়ান্ত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।


