নতুন পে স্কেলে বড় পরিবর্তন: ঊর্ধ্বতনদের ইনক্রিমেন্ট কমছে, কমছে বাড়িভাড়ার হারও
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য অনুমোদিত নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো–২০২৬-এ শুধু মূল বেতন বাড়ানোর পরিবর্তনই নয়, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ও বিভিন্ন ভাতার কাঠামোতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের একটি হলো—সব গ্রেডে অভিন্ন ৫ শতাংশ বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের বদলে এবার গ্রেড যত উঁচু হবে, ইনক্রিমেন্টের হার তত কম হবে। একই সঙ্গে মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর কারণে বাড়িভাড়া ভাতার শতাংশের হারও কমানো হচ্ছে।
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ইনক্রিমেন্টে বড় পরিবর্তন
বর্তমান ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন কাঠামোয় সরকারি চাকরিজীবীরা গ্রেড নির্বিশেষে বছরে ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট পেয়ে থাকেন। নতুন কাঠামোয় এই অভিন্ন ব্যবস্থা আর থাকছে না।
নতুন নিয়মে—
- ৬ষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেড: বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ৫ শতাংশ
- ৫ম গ্রেড: ৪ শতাংশ
- ৩য় ও ৪র্থ গ্রেড: ৩.৫ শতাংশ
- ২য় গ্রেড: ২.৭৫ শতাংশ
অর্থাৎ নিচের গ্রেডের কর্মচারীরা ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট পেলেও উচ্চপদে উঠলে ইনক্রিমেন্টের শতাংশ ধাপে ধাপে কমে যাবে।
এর ফলে নতুন পে স্কেলের দর্শন দাঁড়াচ্ছে—মূল বেতন যত বেশি, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির হার তত কম। এতে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন বৃদ্ধির সুবিধা তুলনামূলকভাবে বেশি বজায় থাকবে, আর উচ্চপদস্থদের বেতন বৃদ্ধির গতি কিছুটা নিয়ন্ত্রিত হবে।
সামরিক বাহিনীতেও একই নীতি
সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষেত্রেও একই ধরনের কাঠামো রাখা হচ্ছে। ক্যাপ্টেন ও সমতুল্য এবং তার নিচের পদে ৫ শতাংশ, মেজর পদে ৪ শতাংশ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল ও কর্নেল পর্যায়ে ৩.৫ শতাংশ এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সমতুল্য পদে ২.৭৫ শতাংশ বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের কথা বলা হয়েছে।
বাড়িভাড়া ভাতায়ও কমছে শতাংশ
নতুন পে স্কেলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাড়িভাড়া ভাতার হার। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বোঝা জরুরি—বাড়িভাড়ার শতাংশ কমলেও অনেক কর্মচারীর প্রকৃত টাকার অঙ্কে বাড়িভাড়া ভাতা কমবে না; বরং মূল বেতন বড় পরিমাণে বাড়ায় ভাতার টাকার পরিমাণ বাড়তে পারে।
ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় বর্তমানে গ্রেডভেদে বাড়িভাড়া ভাতা মূল বেতনের ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ। নতুন কাঠামোয় এটি কমিয়ে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ করা হচ্ছে।
অন্য সিটি করপোরেশন এলাকা ও সাভারে বর্তমানে ৪০–৫৫ শতাংশ থাকলেও নতুন কাঠামোয় তা হবে ৩০–৫০ শতাংশ।
এ ছাড়া ঢাকা ও অন্যান্য সিটি করপোরেশন এবং সাভারের বাইরে বর্তমানে ৩৫–৫০ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া পাওয়া গেলেও নতুন কাঠামোয় তা কমে ২৫–৪৫ শতাংশ হবে।
তাহলে বাড়িভাড়া কমছে, নাকি বাড়ছে?
এখানেই নতুন পে স্কেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসাবটি রয়েছে।
শতাংশের হিসাবে বাড়িভাড়া কমছে ঠিকই, কিন্তু নতুন পে স্কেলে মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ছে। ফলে কম শতাংশ প্রয়োগ করেও অনেক ক্ষেত্রে কর্মচারীর হাতে পাওয়া বাড়িভাড়ার টাকার অঙ্ক বর্তমানের চেয়ে বেশি হতে পারে।
অর্থাৎ, ‘বাড়িভাড়ার হার কমছে’ এবং ‘বাড়িভাড়া ভাতা কমছে’—দুটি বিষয় এক নয়।
উদাহরণ হিসেবে, কারও মূল বেতন যদি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়, তাহলে ৫০ শতাংশের পরিবর্তে ৪০ শতাংশ বাড়িভাড়া পেলেও মোট টাকার পরিমাণ আগের চেয়ে বেশি হতে পারে।
শুধু ইনক্রিমেন্ট ও বাড়িভাড়া নয়, আরও যেসব পরিবর্তন
নতুন পে স্কেলে সরকারি চাকরিজীবীদের অন্যান্য ভাতাতেও বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এর মধ্যে যাতায়াত, টিফিন ও ধোলাই ভাতা উল্লেখযোগ্য।
বর্তমান ও প্রস্তাবিত হার অনুযায়ী—
| ভাতার ধরন | বর্তমান | নতুন কাঠামো |
|---|---|---|
| যাতায়াত ভাতা | ৩০০ টাকা | ৬০০ টাকা |
| টিফিন ভাতা | ২০০ টাকা | ৫০০ টাকা |
| ধোলাই ভাতা | ১০০ টাকা | ৩০০ টাকা |
| বাংলা নববর্ষ ভাতা | মূল বেতনের ২০% | ১৫% |
অর্থাৎ কিছু ভাতায় সরাসরি টাকার অঙ্কে বড় বৃদ্ধি থাকলেও বাংলা নববর্ষ ভাতার শতাংশ কমানো হচ্ছে।
চিকিৎসা ভাতাতেও পরিবর্তন
নতুন কাঠামোয় বয়সভেদে চিকিৎসা ভাতার নতুন ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
৫০ বছর পর্যন্ত চাকরিজীবীদের মাসিক চিকিৎসা ভাতা হবে ৩,০০০ টাকা। ৫০ বছরের বেশি থেকে ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত পাবেন ৪,০০০ টাকা।
অন্যদিকে পেনশনভোগীদের মধ্যে ৬০–৭০ বছর বয়সীদের জন্য মাসে ৫,০০০ টাকা এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য ৬,০০০ টাকা চিকিৎসা ভাতার প্রস্তাব রয়েছে।
মোবাইল ভাতায়ও নতুন কাঠামো
নতুন পে স্কেলে প্রথমবারের মতো সব স্তরের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য মোবাইল ফোন ভাতার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
বর্তমানে ১ম–৩য় গ্রেডের কর্মকর্তারা ১,৫০০ টাকা এবং ৪র্থ–৫ম গ্রেডের কর্মকর্তারা ১,০০০ টাকা মোবাইল বিল পান। নতুন কাঠামোয় ১ম–৫ম গ্রেডের জন্য এই ভাতা কমিয়ে ৫০০ টাকা করা হচ্ছে।
তবে ৬ষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য প্রথমবারের মতো মাসে ১৫০ টাকা মোবাইল ভাতার ব্যবস্থা থাকছে।
উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ আরও দ্রুত
নতুন পে স্কেলে চাকরিজীবীদের জন্য আরেকটি ইতিবাচক পরিবর্তন হচ্ছে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময় কমানো।
বর্তমানে একই গ্রেডে ১০ বছর চাকরি করার পর উচ্চতর গ্রেডে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। নতুন কাঠামোয় এই সময় কমিয়ে ৮ বছর করা হচ্ছে।
তবে পদোন্নতি ছাড়া দ্বিতীয়বার উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রে ৬ বছর একই গ্রেডে চাকরির শর্ত বহাল থাকবে। পদোন্নতিযোগ্য পদে কর্মরতরা পদোন্নতি না পেলে চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ দুইবার উচ্চতর গ্রেডে যেতে পারবেন।
তিন ধাপে মূল বেতন, ভাতা কার্যকর ২০২৮ সালে
নতুন পে স্কেলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি একবারে পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না। মূল বেতন তিন ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই, ২০২৭ সালের ডিসেম্বর এবং ২০২৭ সালের জুলাই—এই তিন ধাপে মূল বেতন বাস্তবায়নের পর ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে নতুন হারে বিভিন্ন ভাতা কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
এর অর্থ, কর্মচারীদের নতুন পে স্কেলের সম্পূর্ণ আর্থিক সুবিধা পেতে সময় লাগবে। প্রথম ধাপে মূল বেতন বাড়লেও সব ধরনের সংশোধিত ভাতা তাৎক্ষণিকভাবে যুক্ত হবে না।
সরকারের অতিরিক্ত ব্যয়ও বাড়বে ব্যাপকভাবে
নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের ব্যয়ের ওপরও বড় প্রভাব পড়বে। প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, তিন বছরে অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা।
এর মধ্যে—
- ২০২৬ সালে: অতিরিক্ত ৩৭,৩৭২ কোটি টাকা
- ২০২৭ সালে: অতিরিক্ত ৪৪,৮৩৮ কোটি টাকা
- ২০২৮ সালে: অতিরিক্ত ২৩,১৭০ কোটি টাকা
আর সব ভাতা ও সুবিধা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে বেতন, ভাতা, পেনশন, আনুতোষিক ও লাম্পগ্রান্টসহ সরকারের মোট বার্ষিক ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ২ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা।
কর্মচারীদের জন্য নতুন পে স্কেলের আসল চিত্র কী?
সবকিছু মিলিয়ে নতুন পে স্কেলকে শুধু ‘বেতন বাড়ানোর স্কেল’ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না। এখানে একসঙ্গে কয়েকটি বিষয় করা হচ্ছে।
প্রথমত, মূল বেতন ব্যাপকভাবে বাড়ছে।
দ্বিতীয়ত, নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডে ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট বহাল থাকলেও উচ্চতর গ্রেডে ইনক্রিমেন্টের হার কমছে।
তৃতীয়ত, বাড়িভাড়া ভাতার শতাংশ কমছে, কিন্তু মূল বেতন বড় হওয়ায় প্রকৃত টাকার অঙ্ক অনেক ক্ষেত্রে বাড়তে পারে।
চতুর্থত, যাতায়াত, টিফিন ও ধোলাইয়ের মতো কিছু ভাতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে।
পঞ্চমত, চিকিৎসা ও মোবাইল ভাতার কাঠামো নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে।
ষষ্ঠত, উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার জন্য অপেক্ষার সময় ১০ বছর থেকে ৮ বছরে নামানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শেষ কথা
নতুন পে স্কেলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো মূল বেতন ও ভাতার মধ্যে নতুন ভারসাম্য তৈরি করা। উচ্চ বেতনধারীদের জন্য ইনক্রিমেন্টের শতাংশ কমিয়ে এবং বাড়িভাড়া ভাতার হার কিছুটা কমিয়ে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে। অন্যদিকে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট, উচ্চতর গ্রেডে যাওয়ার সময় কমানো এবং কয়েকটি ভাতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে।
তবে বাস্তবে একজন সরকারি কর্মচারী নতুন পে স্কেলে কত টাকা বেশি পাবেন, তা নির্ভর করবে গ্রেড, বর্তমান মূল বেতন, ইনক্রিমেন্ট, কর্মস্থল এবং প্রযোজ্য ভাতার ওপর। তাই শুধু বাড়িভাড়ার শতাংশ কমেছে দেখে কারও মোট বেতন কমে যাবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
উল্লেখ্য, ৩১ আগস্টের মন্ত্রিসভা বৈঠকে জাতীয় বেতন কাঠামো–২০২৬ ও সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কাঠামো অনুমোদনের কথা জানিয়েছে টিবিএস; বর্তমানে গেজেট প্রণয়নের কাজ চলছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।


