নবম পে স্কেলে অনলাইনে বেতন নির্ধারণ: iBAS++-এ যা করতে হবে সরকারি চাকরিজীবীদের
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নবম জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে অনলাইনে বেতন নির্ধারণ বা Pay Fixation-এর বিস্তারিত পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন নির্ধারণের বড় অংশই সম্পন্ন হবে iBAS++ (Integrated Budget and Accounting System)-এর মাধ্যমে। অর্থাৎ, নির্ধারিত তথ্য অনলাইনে জমা, যাচাই, অনুমোদন এবং ভেরিফিকেশন নম্বর তৈরির মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
গেজেটে থাকা নির্দেশনায় অনলাইন বেতন নির্ধারণের জন্য সরকারি কর্মচারীদের করণীয়, iBAS++-এ প্রবেশের পদ্ধতি, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, জন্মতারিখের অসামঞ্জস্য, DDO ও হিসাবরক্ষণ অফিসের দায়িত্ব এবং চূড়ান্ত বেতন নির্ধারণের পর অতিরিক্ত বা কম বেতন পরিশোধের সমন্বয়—সবকিছু ধাপে ধাপে তুলে ধরা হয়েছে।
গেজেটের পর iBAS++-এ অনলাইনে বেতন নির্ধারণ
নির্দেশনা অনুযায়ী, জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ জারি হওয়ার পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের iBAS++ সিস্টেমে লগইন করে নির্ধারিত ছক পূরণের মাধ্যমে নতুন বেতন নির্ধারণ করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে iBAS++-এর Pay Fixation অপশনে গিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান করতে হবে। কেউ যদি Pay Fixation-এর নির্ধারিত ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রবেশ করেন, সেখান থেকেও তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে iBAS++ সিস্টেমের Pay Fixation অপশনে নিয়ে যাওয়া হবে।
অর্থাৎ, আলাদা কোনো ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে নতুন বেতন হিসাব করার পরিবর্তে অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্ধারিত বেতন নিরূপণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
গেজেটেড ও নন-গেজেটেড কর্মচারীর লগইন পদ্ধতি আলাদা
নির্দেশনায় গেজেটেড এবং নন-গেজেটেড সরকারি কর্মচারীর iBAS++-এ প্রবেশের ক্ষেত্রে আলাদা তথ্য ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
গেজেটেড সরকারি কর্মচারী iBAS++-এ প্রবেশের জন্য তার নিজস্ব ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করবেন।
অন্যদিকে নন-গেজেটেড সরকারি কর্মচারী জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) নম্বর ও জন্মতারিখ ব্যবহার করে সিস্টেমে প্রবেশ করবেন।
দেশের বাইরে অবস্থানরত কোনো কর্মচারীর ক্ষেত্রে iBAS++-এ নিবন্ধিত ই-মেইলে পাঠানো একবার ব্যবহারযোগ্য পাসওয়ার্ড বা OTP ব্যবহার করে সিস্টেমে প্রবেশের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
NID না থাকলে আগে নিবন্ধন করতে হবে
কোনো সরকারি কর্মচারীর জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকলে নতুন পে স্কেলে বেতন নির্ধারণের আগে তাকে জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্য নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে।
এ ছাড়া কর্মচারীর NID-তে থাকা জন্মতারিখ এবং চাকরির রেকর্ডে থাকা জন্মতারিখের মধ্যে পার্থক্য থাকলে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
নির্দেশনা অনুযায়ী, চাকরির রেকর্ডে থাকা জন্মতারিখের সঙ্গে NID-এর জন্মতারিখের পার্থক্য তিন বছরের বেশি হলে বেতন নির্ধারণের আগে চাকরির রেকর্ডে উল্লেখিত জন্মতারিখের ভিত্তিতে জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
ফলে শুধু NID নম্বর থাকলেই হবে না; চাকরির রেকর্ড, NID ও জন্মতারিখের তথ্যের সামঞ্জস্যও নিশ্চিত করতে হবে।
অনলাইনে তথ্য পূরণ করে DDO বরাবর সাবমিট
iBAS++-এ সফলভাবে প্রবেশ করার পর বেতন নির্ধারণের জন্য নির্ধারিত ছকে প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করতে হবে।
তথ্য পূরণ করে সাবমিট করার পর বিষয়টি সংশ্লিষ্ট DDO (Drawing and Disbursing Officer)-এর কাছে যাবে। একই সঙ্গে কর্মচারীর নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে SMS পাঠিয়ে জানানো হবে যে তার বেতন নির্ধারণী বিবরণী সাবমিট হয়েছে।
এ কারণে বেতন নির্ধারণের আগে কর্মচারীর iBAS++-এ নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর সক্রিয় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্য পূরণের পরই দেখা যাবে নির্ধারিত মূল বেতন
নতুন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—নির্ধারিত ছকে প্রয়োজনীয় তথ্য সঠিকভাবে এন্ট্রি করার পর নতুন বেতনস্কেলের আওতায় সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর নির্ধারণযোগ্য মূল বেতনের পরিমাণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রদর্শিত হবে।
অর্থাৎ কর্মচারীকে নিজে হাতে জটিল হিসাব করে নতুন মূল বেতন নির্ধারণ করতে হবে না। সিস্টেমে থাকা চাকরির তথ্য ও নির্ধারিত নিয়মের ভিত্তিতে বেতন নির্ধারণের হিসাব তৈরি হবে।
তবে তথ্য ভুল থাকলে স্বয়ংক্রিয় হিসাবও ভুল হতে পারে। তাই চাকরিতে যোগদানের তারিখ, বর্তমান পদ, গ্রেড, ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি বা উচ্চতর গ্রেডসহ সংশ্লিষ্ট তথ্য সঠিক থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। iBAS++-এর অনলাইন বেতন নির্ধারণ ব্যবস্থাতেও কর্মচারীর চাকরিসংক্রান্ত তথ্যের সঠিকতা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
DDO ও হিসাবরক্ষণ অফিসেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব
কর্মচারী অনলাইনে বেতন নির্ধারণী বিবরণী সাবমিট করার পর শুধু কর্মচারীর কাজ শেষ হবে না। এরপর সংশ্লিষ্ট DDO এবং হিসাবরক্ষণ অফিসের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া শুরু হবে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, DDO প্রয়োজনীয় যাচাই শেষে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিসে বেতন নির্ধারণী বিবরণী ফরওয়ার্ড করবেন।
বিশেষ করে নন-গেজেটেড কর্মচারীর ক্ষেত্রে সার্ভিস বই অনুযায়ী চাকরির তথ্য, পূর্ববর্তী বেতন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয় যাচাই করে নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর থাকবে।
অর্থাৎ অনলাইন পে ফিক্সেশন হলেও চাকরির মূল রেকর্ড বা সার্ভিস বুকের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখার প্রক্রিয়া থাকছে।
হিসাবরক্ষণ অফিসে যাচাইয়ের পর অনলাইন অনুমোদন
অনলাইনে দাখিল করা বেতন নির্ধারণী বিবরণী সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিসে পৌঁছানোর পর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তা যাচাই করবেন।
তথ্য সঠিক পাওয়া গেলে অনলাইনেই পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। অনুমোদনের পর সিস্টেম থেকে Verification Number তৈরি হবে।
বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই অনলাইন ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হওয়ার পর বেতন নির্ধারণী বিবরণীতে হিসাবরক্ষণ অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ম্যানুয়াল স্বাক্ষরের প্রয়োজন হবে না।
ফলে পুরো প্রক্রিয়ায় কাগজের ব্যবহার কমিয়ে ডিজিটাল অনুমোদন ও যাচাইয়ের দিকে নেওয়া হচ্ছে।
ভেরিফিকেশন নম্বর হবে গুরুত্বপূর্ণ
অনলাইন পে ফিক্সেশনের পর তৈরি হওয়া Verification Number ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর বেতন নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে কাজ করবে।
হিসাবরক্ষণ অফিস বেতন নির্ধারণ অনুমোদনের সময় নির্ধারিত বেতন ও ভেরিফিকেশন নম্বর সংশ্লিষ্ট রেকর্ডে সংরক্ষণ করবে। এর ফলে ভবিষ্যতে বেতন নির্ধারণ নিয়ে কোনো প্রশ্ন বা সংশোধনের প্রয়োজন হলে অনলাইন রেকর্ড যাচাই করার সুযোগ থাকবে।
একাধিক ওয়েবসাইটে নির্দেশিকা পাওয়া যাবে
অনলাইন বেতন নির্ধারণের বিস্তারিত ব্যবহারবিধি আলাদাভাবে প্রকাশ করা হবে এবং তা iBAS++ লগইন পেজের পাশাপাশি অর্থ বিভাগের ওয়েবসাইট, হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের ওয়েবসাইট এবং Pay Fixation-সংক্রান্ত ওয়েবসাইটে পাওয়া যাবে।
iBAS++-এর বর্তমান অনলাইন বেতন নির্ধারণ প্ল্যাটফর্মেও বিভিন্ন ধরনের বেতন নির্ধারণ—যেমন চলমান বেতন নির্ধারণ, নতুন নিয়োগ, পদোন্নতি, টাইমস্কেল, সিলেকশন গ্রেড, উচ্চতর গ্রেড ও ইনক্রিমেন্ট—সংক্রান্ত অপশন রয়েছে।
বেশি বা কম বেতন হলে পরবর্তী সময়ে সমন্বয়
নির্দেশনার শেষদিকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিস কর্তৃক চূড়ান্তভাবে প্রতিপাদিত বেতন নির্ধারণী বিবরণীর ভিত্তিতেই বেতন পরিশোধ করা হবে।
কোনো কারণে নির্ধারিত বেতনের তুলনায় কম বা বেশি বেতন পরিশোধ হয়ে গেলে পরবর্তী সময়ে তা সমন্বয়যোগ্য হবে।
অর্থাৎ অনলাইন পে ফিক্সেশনের মাধ্যমে চূড়ান্ত বেতন নির্ধারণ হয়ে গেলেও বাস্তবে পরিশোধিত অর্থের সঙ্গে চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত বেতনের পার্থক্য দেখা দিলে পরবর্তী বেতন থেকে সমন্বয়ের ব্যবস্থা থাকবে।
সরকারি চাকরিজীবীদের এখন কী করতে হবে
নতুন পে স্কেলে অনলাইন বেতন নির্ধারণের প্রস্তুতি হিসেবে সরকারি চাকরিজীবীদের কয়েকটি বিষয় আগে থেকেই যাচাই করে রাখা গুরুত্বপূর্ণ—
১. NID নম্বর ও জন্মতারিখ সঠিক আছে কি না যাচাই করতে হবে।
২. চাকরির রেকর্ডে থাকা জন্মতারিখের সঙ্গে NID-এর তথ্যের সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে হবে।
৩. iBAS++-এ নিজের প্রয়োজনীয় তথ্য সঠিকভাবে সংরক্ষিত আছে কি না দেখতে হবে।
৪. পদ, গ্রেড, চাকরিতে যোগদানের তারিখ ও ইনক্রিমেন্টের তথ্য যাচাই করতে হবে।
৫. পদোন্নতি বা উচ্চতর গ্রেড পেয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট তথ্য হালনাগাদ আছে কি না দেখতে হবে।
৬. iBAS++-এ নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর সচল রাখতে হবে।
৭. বিদেশে অবস্থানরত হলে নিবন্ধিত ই-মেইলে OTP পাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
৮. অনলাইনে বেতন নির্ধারণের পর প্রদর্শিত নতুন মূল বেতন ভালোভাবে যাচাই করতে হবে।
৯. সাবমিশনের পর SMS ও অনলাইন স্ট্যাটাস সংরক্ষণ করতে হবে।
১০. চূড়ান্ত অনুমোদনের পর Verification Number সংরক্ষণ করা উচিত।
সার্বিকভাবে যা বোঝা যাচ্ছে
নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নে বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়াকে আগের তুলনায় অনেক বেশি ডিজিটাল, স্বয়ংক্রিয় ও যাচাইযোগ্য করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। iBAS++-এ কর্মচারীর তথ্য থেকে নতুন মূল বেতন নির্ধারণ, DDO-এর মাধ্যমে ফরওয়ার্ড, হিসাবরক্ষণ অফিসের যাচাই এবং শেষে Verification Number তৈরির মাধ্যমে একটি ধারাবাহিক অনলাইন প্রক্রিয়া গড়ে তোলা হচ্ছে। সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় iBAS++-এর মাধ্যমে কর্মচারীর বেতন-সংক্রান্ত তথ্য ব্যবস্থাপনার ভিত্তি আগেও ছিল; নতুন পে স্কেলের ক্ষেত্রে সেই ডিজিটাল অবকাঠামোকেই আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
সুতরাং, গেজেট কার্যকর হওয়ার পর শুধু নতুন বেতনস্কেল ঘোষণা হওয়াই শেষ ধাপ নয়; প্রত্যেক কর্মচারীর ব্যক্তিগত চাকরির তথ্য সঠিকভাবে যাচাই ও অনলাইনে পে ফিক্সেশন সম্পন্ন করাই হবে বাস্তবায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। বর্তমানে সরকারি সূত্রভিত্তিক প্রতিবেদনে নবম পে স্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর এবং ২০টি গ্রেডে সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার ও সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণের কথা জানানো হয়েছে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: উপরের প্রতিবেদনে ছবিতে থাকা ১০ দফা অনলাইন বেতন নির্ধারণ নির্দেশনার তথ্যকে মূল ভিত্তি করা হয়েছে; ওয়েব সূত্রগুলো দিয়ে iBAS++-এর অনলাইন পে ফিক্সেশন কাঠামো ও নবম পে স্কেলের সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট মিলিয়ে দেখা হয়েছে।




