৯ম পে-স্কেলের আগেই যারা অবসর বা পিআরএলে, তাদের জন্য পূর্ণ গ্রাচুইটি-পেনশনের দাবি
১১ বছর পর নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন অবসর ও পিআরএলে থাকা সরকারি কর্মচারীদের নিয়ে। দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে যারা নতুন পে-স্কেলের সুবিধা পাওয়ার আগেই অবসর নিয়েছেন বা পিআরএলে গেছেন, তাদের ক্ষতি কীভাবে সমন্বয় করা হবে—এ নিয়ে জোরালো দাবি উঠেছে।
দীর্ঘ প্রায় ১১ বছর পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে সরকার ৯ম জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুমোদন করেছে। বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা এবং সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকা নির্ধারণের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে সরকার। নতুন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু এই দীর্ঘ অপেক্ষার সময়টিই এখন একটি বড় বৈষম্যের প্রশ্ন সামনে এনেছে। বিশেষ করে যেসব সরকারি কর্মচারী ৯ম পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার আগেই অবসর নিয়েছেন, পিআরএলে গেছেন কিংবা অবসরের দ্বারপ্রান্তে রয়েছেন—তাদের অনেকেই মনে করছেন, নতুন বেতন কাঠামোর সুফল থেকে তারা বাস্তবে বঞ্চিত হতে পারেন।
‘বকেয়া না দিলেও অবসর সুবিধা নতুন স্কেলে নির্ধারণ হোক’
সরকারি কর্মচারীদের একটি অংশের দাবি, ৯ম পে-স্কেলের পুরো বকেয়া বেতন প্রত্যেক অবসরপ্রাপ্তকে দেওয়া সম্ভব না হলেও মানবিক ও ন্যায়সংগত বিবেচনায় অন্তত নতুন পে-স্কেলের ভিত্তিতে পূর্ণ গ্রাচুইটি ও মাসিক পেনশন পুনর্নির্ধারণ করা উচিত।
তাদের যুক্তি—একজন কর্মচারী যখন চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন, তখন বিদ্যমান বেতন কাঠামো অনুযায়ী বছরের পর বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু নতুন পে-স্কেল কার্যকর হতে দীর্ঘ সময় লাগায় তার অবসরের সময় এসে গেছে। ফলে শুধু সময়ের ব্যবধানের কারণে একই পদ ও একই ধরনের চাকরিজীবনের একজন কর্মচারী নতুন পে-স্কেলের সুবিধা পাবেন, আর কয়েক মাস বা কিছুদিন আগে অবসর নেওয়া কর্মচারী তা পাবেন না—এটি ন্যায্যতার প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
এ কারণেই দাবি উঠেছে, ‘নতুন বেতন না পেলেও অবসর সুবিধায় যেন বৈষম্য না হয়।’
কেন বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ?
সরকারি কর্মচারীর অবসরকালীন সুবিধার বড় অংশই শেষ বেতন বা পেনশনযোগ্য বেতনের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে চাকরির শেষ পর্যায়ে মূল বেতন যত বেশি হয়, অবসরকালীন আর্থিক সুবিধার হিসাবেও তার প্রভাব পড়ে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যারা পিআরএলে রয়েছেন, তাদের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পিআরএল শেষে চূড়ান্ত অবসরের সময় নতুন পে-স্কেল কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, সেটি নির্ধারণ না হলে তাদের গ্রাচুইটি, পেনশন এবং অন্যান্য অবসর সুবিধা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও পিআরএল শেষে অবসরে যাওয়া কর্মচারীদের পেনশন, গ্রাচুইটি ও ছুটির নগদায়ন নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা ‘শেষ বেতনের’ হিসাব
ধরা যাক, একজন সরকারি কর্মচারী ৮ম পে-স্কেলের বেতন অনুযায়ী চাকরির শেষ পর্যায়ে পৌঁছে অবসর নিলেন। অন্যদিকে একই গ্রেডের আরেকজন কর্মচারী কয়েক মাস পরে অবসর নিলেন এবং তার ক্ষেত্রে ৯ম পে-স্কেল অনুযায়ী নতুন বেতন নির্ধারণ হলো।
দুজনের চাকরির মেয়াদ, পদ ও দায়িত্ব প্রায় একই হলেও অবসর সুবিধার হিসাবে বড় পার্থক্য তৈরি হতে পারে।
এখানেই ক্ষতিগ্রস্ত কর্মচারীদের প্রশ্ন—এই পার্থক্য কি শুধু অবসরের তারিখের কারণে হওয়া উচিত?
তাদের দাবি, সরকার চাইলে একটি বিশেষ transitional বা রূপান্তরকালীন বিধান করতে পারে। সেই বিধানের আওতায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অবসর নেওয়া বা পিআরএলে যাওয়া কর্মচারীদের ক্ষেত্রে নতুন পে-স্কেলের সংশ্লিষ্ট গ্রেড অনুযায়ী অবসর সুবিধা পুনর্নির্ধারণ করা সম্ভব হতে পারে।
বকেয়া বেতন না দিলেও সমাধানের সুযোগ আছে
ক্ষতিগ্রস্ত কর্মচারীদের দাবিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তারা সবাই necessarily ৯ম পে-স্কেলের পুরো বকেয়া বেতন দাবি করছেন না।
বরং তাদের প্রস্তাবের মূল কথা হলো:
৯ম পে-স্কেলের কার্যকর তারিখ থেকে অবসর পর্যন্ত পুরো বকেয়া বেতন দেওয়া না হলেও, অবসরকালীন সুবিধা নির্ধারণে নতুন বেতন কাঠামো বিবেচনা করা হোক।
অর্থাৎ, অতীতের বকেয়া বেতন পরিশোধ না করে সরকার চাইলে একটি নির্দিষ্ট কাট-অফ তারিখের আগে/পরে অবসর নেওয়া কর্মচারীদের জন্য বিশেষভাবে—
- নতুন গ্রেড অনুযায়ী শেষ মূল বেতন নির্ধারণ,
- সেই বেতনের ভিত্তিতে গ্রাচুইটি পুনর্গণনা,
- মাসিক পেনশন পুনর্নির্ধারণ,
- প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পেনশন-সংক্রান্ত অন্যান্য সুবিধা সমন্বয়
করতে পারে।
এ ধরনের ব্যবস্থা নিলে সরকারের ওপর একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ বকেয়া বেতন দেওয়ার চাপও তুলনামূলকভাবে কমতে পারে—যদিও আর্থিক প্রভাব নির্ভর করবে সরকার কী ধরনের সূত্র ও সময়সীমা নির্ধারণ করে তার ওপর।
সরকারের ঘোষণায় পেনশনভোগীদের জন্য আলাদা সুবিধার ইঙ্গিত
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ৯ম পে-স্কেল অনুমোদনের সময় সরকার অবসরভোগীদের বিষয়টিও বিবেচনায় নিয়েছে।
বাসসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জীবনযাত্রার মান ও বৃদ্ধ বয়সের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে স্ল্যাবভিত্তিক নিট পেনশন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেখানে ৯ হাজার টাকা বা তার কম নিট পেনশনপ্রাপ্তদের ১০০ শতাংশ, ৯,০০১–২০,০০০ টাকা পর্যন্ত ৭৫ শতাংশ, ২০,০০১–৩০,০০০ টাকা পর্যন্ত ৬৫ শতাংশ, ৩০,০০১–৪০,০০০ টাকা পর্যন্ত ৬০ শতাংশ এবং ৪০,০০১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশনপ্রাপ্তদের ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধির কথা জানানো হয়েছে।
অর্থাৎ, অবসরপ্রাপ্তদের আর্থিক নিরাপত্তা যে নতুন বেতন কাঠামোর আলোচনার বাইরে নয়, সেটি ইতোমধ্যে সরকারি সিদ্ধান্তের মধ্যেই প্রতিফলিত হয়েছে।
তবে বর্তমানে অবসর বা পিআরএলে থাকা কর্মচারীদের গ্রাচুইটি ও পেনশন ৯ম পে-স্কেলের নতুন মূল বেতন ধরে পুনর্নির্ধারণ করা হবে কি না—এটি আলাদা নীতিগত বিষয়। চূড়ান্ত গেজেট ও বাস্তবায়ন নির্দেশনায় বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
পিআরএলে থাকা কর্মচারীরাই সবচেয়ে স্পর্শকাতর অবস্থানে
পিআরএলে থাকা কর্মচারীদের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। কারণ তারা ইতোমধ্যে চাকরির কার্যকর দায়িত্ব থেকে অবসরের দিকে এগিয়ে গেছেন। নতুন পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার সময় তাদের পে-ফিক্সেশন কীভাবে হবে—তার ওপর ভবিষ্যৎ অবসর সুবিধা নির্ভর করতে পারে।
সাম্প্রতিক আলোচনায় ধাপে ধাপে বেতন বাস্তবায়ন নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। কারণ বর্তমানে বেতন, ইনক্রিমেন্ট, পেনশন, গ্রাচুইটি ও জিপিএফসহ সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক কার্যক্রম অনেকটাই ডিজিটাল ব্যবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে। ফলে একাধিক ধাপে বেতন ফিক্সেশন করলে প্রশাসনিক ও সফটওয়্যারগত জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই কারণে পিআরএলে থাকা কর্মচারীদের জন্য শুরুতেই স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা জরুরি।
‘একই চাকরি, শুধু অবসরের তারিখ আলাদা’—বৈষম্য কতটা যুক্তিসংগত?
এই দাবির সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি এখানেই।
একজন কর্মচারী যদি ৩০ বছরের চাকরি শেষে ৯ম পে-স্কেলের ঠিক আগে অবসর নেন এবং তার সহকর্মী কয়েক মাস পরে একই গ্রেডে অবসর নেন, তাহলে দুজনের অবসর সুবিধায় বড় ব্যবধান তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কর্মচারীরা বলছেন, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় লেগেছে সরকারের সিদ্ধান্ত ও প্রক্রিয়াগত কারণে। তাই এই বিলম্বের দায় সম্পূর্ণভাবে কর্মচারীর ওপর চাপানো উচিত নয়।
তাদের ভাষায়, ‘পে-স্কেল বাস্তবায়নে ১১ বছর লেগেছে; এই ১১ বছরের মধ্যে যারা অবসর নিয়েছেন, তাদের সবাইকে যেন বঞ্চিত হিসেবে বিবেচনা না করা হয়।’
সম্ভাব্য সমাধান কী হতে পারে?
নীতিগতভাবে সরকার কয়েকটি পথ বিবেচনা করতে পারে।
প্রথমত, নির্দিষ্ট একটি কাট-অফ তারিখ নির্ধারণ করে ওই সময়ের মধ্যে অবসর নেওয়া কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেলের সংশ্লিষ্ট গ্রেড অনুযায়ী পেনশন ও গ্রাচুইটি পুনর্নির্ধারণ করা।
দ্বিতীয়ত, পিআরএলে থাকা কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী সরাসরি পে-ফিক্সেশন করে অবসর সুবিধা নির্ধারণ করা।
তৃতীয়ত, যারা ইতোমধ্যে অবসর নিয়েছেন কিন্তু নির্দিষ্ট একটি সময়সীমার মধ্যে পড়েন, তাদের জন্য বিশেষ পুনর্নির্ধারণের ব্যবস্থা করা।
চতুর্থত, পুরো বকেয়া বেতন না দিয়ে শুধু অবসরকালীন সুবিধার ওপর নতুন পে-স্কেলের প্রভাব দেওয়ার একটি বিশেষ বিধান করা।
তবে এগুলোর কোনোটিই স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হবে না। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য সরকারি গেজেট, বাস্তবায়ন বিধি এবং অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ।
সামনে এখন যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
৯ম পে-স্কেল নিয়ে সরকারি পর্যায়ে অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু কর্মরত কর্মচারীদের বেতন কত ধাপে ও কীভাবে কার্যকর হবে—এর পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত ও পিআরএল কর্মচারীদের সুবিধা কীভাবে নির্ধারিত হবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ নতুন পে-স্কেলের সবচেয়ে বড় মানবিক প্রশ্নটি শুধু ‘কে কত টাকা বেতন পাবেন’ নয়; বরং ‘যারা অপেক্ষা করতে করতে অবসরে চলে গেলেন, তাদের সঙ্গে কী হবে?’
তাই ক্ষতিগ্রস্ত কর্মচারীদের দাবি—পুরো বকেয়া বেতন দেওয়া সম্ভব না হলেও ৯ম পে-স্কেলের সংশ্লিষ্ট গ্রেড অনুযায়ী তাদের পূর্ণ গ্রাচুইটি ও মাসিক পেনশন পুনর্নির্ধারণ করা হোক।
এটি বাস্তবায়ন করা হলে দীর্ঘ পে-স্কেল বিলম্বের কারণে অবসরে যাওয়া কর্মচারীদের মধ্যে সৃষ্ট বৈষম্য অনেকটাই কমানো সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে পিআরএলে থাকা কর্মচারীদের জন্যও একটি সুস্পষ্ট, একক ও স্বচ্ছ নীতিমালা তৈরি হবে।
তবে মনে রাখতে হবে, এটি বর্তমানে একটি জোরালো দাবি ও নীতিগত প্রস্তাব; সরকার চূড়ান্তভাবে এ সুবিধা অনুমোদন করেছে—এমন তথ্য এখনো নিশ্চিত নয়। ৯ম পে-স্কেলের চূড়ান্ত গেজেট ও বাস্তবায়ন নির্দেশনাতেই এ বিষয়ে প্রকৃত সিদ্ধান্ত পরিষ্কার হবে।


