পে-স্কেলের ‘ফিক্সেশন’ জটিলতা কাটেনি, iBAS++-এ ৩ ধাপে বেতন সমন্বয়ের প্রস্তুতি
গেজেট ভেটিংয়ে আইন মন্ত্রণালয়ে, ফিক্সেশনের ধাপ নিয়ে সিদ্ধান্তই এখন বড় প্রশ্ন—তথ্য হালনাগাদ হলেই iBAS++-এ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত হতে পারে নতুন বেতন
নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ের দিকে এগোলেও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কীভাবে ফিক্সেশন বা নির্ধারণ করা হবে, সেই বিষয়টি এখনো পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, পে-স্কেলের গেজেট ইতোমধ্যে আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে। তবে ফিক্সেশন কয় ধাপে করা হবে—এ নিয়ে জটিলতা এখনো কাটেনি। দ্রুত এ বিষয়ে সমাধান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে iBAS++-ভিত্তিক অনলাইন বেতন নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার এই সিস্টেমে কর্মচারীর চাকরিসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ ও বেতন নির্ধারণের ব্যবস্থা আগে থেকেই রয়েছে।
৩ ধাপে ৫০%, ২৫% ও ২৫%—কীভাবে হিসাব হতে পারে
পে-স্কেলের নতুন কাঠামোয় বেতন একবারে শতভাগ কার্যকর না হয়ে ধাপে ধাপে সমন্বয়ের যে ধারণা সামনে এসেছে, সেটিই এখন ফিক্সেশনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আলোচ্য কাঠামো অনুযায়ী, ৫০ শতাংশ + ২৫ শতাংশ + ২৫ শতাংশ—এই তিন ধাপে মোট ১০০ শতাংশ বেতন সমন্বয়ের হিসাব করা হলে এর অর্থ দাঁড়ায়, প্রথম ধাপে নতুন বেতন কাঠামোর ৫০ শতাংশ অংশ কার্যকর হবে। পরবর্তী দুই ধাপে যথাক্রমে ২৫ শতাংশ করে অবশিষ্ট অংশ যুক্ত হবে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই ৫০%, ২৫% ও ২৫% সরাসরি বর্তমান মূল বেতনের ওপর আলাদা আলাদা শতাংশ যোগ হবে, নাকি নতুন নির্ধারিত বেতনের পার্থক্য ধাপে ধাপে সমন্বয় হবে—তা চূড়ান্ত গেজেট ও ফিক্সেশন বিধিতে স্পষ্ট হতে হবে।
অর্থাৎ, শুধু ‘তিন ধাপে ৫০-২৫-২৫’ বলা হলে প্রত্যেক কর্মচারীর হাতে পাওয়া বেতন কত হবে, তা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। ফিক্সেশনের সূত্র, ভিত্তি বেতন এবং পূর্ববর্তী ধাপের সঙ্গে পরবর্তী ধাপ কীভাবে যুক্ত হবে—এসবই এখানে মূল বিষয়।
বিশেষ প্রণোদনার মতো বর্তমান বেসিকের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ
আলোচনায় যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে তা হলো, ধাপে ধাপে কার্যকর হওয়া বর্ধিত অংশ বিশেষ প্রণোদনার মতো বর্তমান মূল বেতনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরবর্তী ধাপের ভিত্তি তৈরি করবে কি না।
যদি এমন পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়, তাহলে এটি সরলভাবে ‘প্রথমে ৫০%, পরে ২৫%, শেষে ২৫%’ যোগ করার হিসাব হবে না। বরং প্রথম ধাপে যে বেতন নির্ধারিত হবে, সেটিই পরবর্তী ধাপের হিসাবের ভিত্তি হতে পারে।
ফলে ফিক্সেশন পদ্ধতি চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত কর্মচারীরা নিজেদের নতুন বেতন সম্পর্কে যে হিসাব করছেন, সেটিকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
iBAS++-এ কীভাবে হবে নতুন বেতন নির্ধারণ
সরকারের iBAS++ ব্যবস্থায় অনলাইন বেতন নির্ধারণের সুবিধা রয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, iBAS++ একটি সমন্বিত সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা তথ্যব্যবস্থা, যেখানে বাজেট, হিসাব, বিল ও পেমেন্টসহ বিভিন্ন আর্থিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এর Pay Fixation ব্যবস্থায় সরকারি কর্মচারীরা নিজেদের চাকরিসংক্রান্ত তথ্যও রেকর্ড করতে পারেন।
বর্তমান অনলাইন বেতন নির্ধারণ ব্যবস্থায় চলমান বেতন, নতুন নিয়োগ, পদোন্নতি, টাইমস্কেল, সিলেকশন গ্রেড, উচ্চতর গ্রেড এবং ইনক্রিমেন্টসহ বিভিন্ন ধরনের ফিক্সেশনের অপশন রয়েছে।
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সময়ও একই ধরনের তথ্যের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয় হিসাব তৈরির সুযোগ থাকবে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য থেকে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।
কর্মচারীর যেসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হবে
নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণের সময় মূলত যেসব তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজন হতে পারে—
- বর্তমান পদ ও পদায়ন
- বেতন গ্রেড
- বর্তমান মূল বেতন
- চাকরিতে যোগদানের তারিখ
- বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের তথ্য
- পদোন্নতির তথ্য
- উচ্চতর গ্রেডের তথ্য
- পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণের তথ্য
- প্রযোজ্য অন্যান্য সার্ভিস রেকর্ড
এসব তথ্য সঠিকভাবে সংরক্ষিত ও যাচাই হওয়ার পর সফটওয়্যার নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী নতুন মূল বেতন ও প্রযোজ্য সুবিধার হিসাব করতে পারবে।
ভুল ফিক্সেশনের ঝুঁকি কমাতে পারে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা
iBAS++-এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হবে একই নিয়মে বিপুলসংখ্যক কর্মচারীর বেতন নির্ধারণ করা। বর্তমানে কোনো কর্মচারীর পদোন্নতি, ইনক্রিমেন্ট বা উচ্চতর গ্রেডের তথ্য ভুল থাকলে বেতন নির্ধারণে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
নতুন পে-স্কেলের ফিক্সেশন যদি কেন্দ্রীয়ভাবে নির্ধারিত সূত্রে সফটওয়্যারে করা হয়, তাহলে ব্যক্তিভেদে হিসাবের পার্থক্য এবং ম্যানুয়াল ভুলের ঝুঁকি কমতে পারে।
সরকারের iBAS++ তথ্য অনুযায়ী, সিস্টেমটিতে অনলাইন Pay Bill সুবিধা রয়েছে এবং এর মাধ্যমে GPF, ঋণ ও আয়কর-সংক্রান্ত স্টেটমেন্টও তৈরি করা যায়।
কিন্তু গেজেট ছাড়া এখনো চূড়ান্ত হিসাব সম্ভব নয়
এখানেই সরকারি কর্মচারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো—গেজেট প্রকাশের আগে কোনো অনানুষ্ঠানিক হিসাবকে চূড়ান্ত বেতন ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
কারণ গেজেটেই শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে—
- নতুন মূল বেতন কীভাবে নির্ধারণ হবে;
- ৫০-২৫-২৫ ধাপ কীভাবে প্রয়োগ হবে;
- প্রতিটি ধাপের কার্যকর তারিখ;
- পূর্ববর্তী বেতন থেকে নতুন বেতনে ফিক্সেশনের সূত্র;
- ইনক্রিমেন্ট কীভাবে সমন্বিত হবে;
- পদোন্নতি ও উচ্চতর গ্রেডের ক্ষেত্রে কী নিয়ম হবে;
- বিভিন্ন ভাতা কখন থেকে কার্যকর হবে;
- বকেয়া বা আর্থিক সুবিধা কীভাবে হিসাব করা হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্যেও মূলত ফিক্সেশনের ধাপ নিয়ে জটিলতার বিষয়টি উঠে এসেছে। অন্যদিকে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রজ্ঞাপনের রেজল্যুশন অর্থ মন্ত্রণালয়ে এসে পরে আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে এবং ভেটিং শেষ হলে গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া এগোবে।
গেজেট কবে হতে পারে?
বর্তমান অবস্থায় নির্দিষ্ট তারিখ নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী গেজেটের খসড়া/প্রজ্ঞাপন ভেটিং পর্যায়ে থাকায় এটি প্রক্রিয়ার শেষ দিকের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। ভেটিং সম্পন্ন হওয়ার পর প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে সরকারি গেজেট প্রকাশ করা হতে পারে।
তবে ফিক্সেশন কয় ধাপে হবে—এই জটিলতা দ্রুত নিষ্পত্তি করা না গেলে গেজেট প্রকাশের সময়সূচিও প্রভাবিত হতে পারে। ফলে এখন সরকারি চাকরিজীবীদের সবচেয়ে বড় অপেক্ষা দুটি বিষয়ে—গেজেট এবং ফিক্সেশনের চূড়ান্ত সূত্র।
‘১০০% কার্যকর’ হওয়ার বিষয়টি কী বোঝায়
নতুন পে-স্কেলের ক্ষেত্রে যদি বর্ধিত মূল বেতন ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে প্রথম ধাপে কর্মচারী পুরো বর্ধিত বেতন পাবেন না। বরং নির্ধারিত অংশ কার্যকর হবে। এরপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে বাকি অংশ যুক্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত নতুন কাঠামোর ১০০ শতাংশ নির্ধারিত বেতন কার্যকর হওয়ার কথা।
এ কারণে ‘পে স্কেল অনুমোদিত’ এবং ‘নতুন পে স্কেলের পূর্ণ আর্থিক সুবিধা হাতে পাওয়া’—এই দুটি বিষয়কে একই বিষয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে।
বিশেষ করে ফিক্সেশনের সূত্র যদি বর্তমান বেসিকের সঙ্গে প্রতিটি ধাপের সমন্বয় করে তৈরি হয়, তাহলে একজন কর্মচারীর প্রকৃত বেতন কত হবে তা নির্ভর করবে তাঁর বর্তমান গ্রেড, মূল বেতন, ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি ও উচ্চতর গ্রেডের তথ্যের ওপর।
শেষ কথা
সব মিলিয়ে নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হলো গেজেটের ভেটিং শেষ করা এবং ফিক্সেশনের পদ্ধতি চূড়ান্ত করা। গেজেট প্রকাশের পর iBAS++-এ প্রয়োজনীয় সার্ভিস তথ্য যাচাই ও হালনাগাদের মাধ্যমে নতুন বেতন নির্ধারণের কাজ অনেক বেশি স্বয়ংক্রিয় ও তথ্যনির্ভর হতে পারে। সরকারি iBAS++ ব্যবস্থায় ইতোমধ্যে অনলাইন Pay Fixation ও Pay Bill-এর মতো সুবিধা চালু রয়েছে।
তাই বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ‘পে স্কেল হবে কি না’ নয়; বরং ‘কীভাবে ফিক্সেশন হবে এবং ৫০%-২৫%-২৫% ধাপ কীভাবে বেসিকের সঙ্গে সমন্বিত হবে’। এই দুটি বিষয় গেজেটে স্পষ্ট হলেই সরকারি কর্মচারীরা নিজেদের প্রকৃত নতুন বেতন, ধাপভিত্তিক বৃদ্ধি এবং ১০০ শতাংশ কার্যকর হওয়ার পর চূড়ান্ত বেতন সম্পর্কে নির্ভুল হিসাব করতে পারবেন।
নোট: ৫০%-২৫%-২৫% ফিক্সেশনের নির্দিষ্ট সূত্রটি আপনার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে; চূড়ান্ত হিসাবের জন্য সরকারি গেজেট/ফিক্সেশন নির্দেশনাই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।



