নতুন পে-স্কেল আপাতত হচ্ছে না; বরাদ্দের টাকা যাচ্ছে কৃষিঋণ ও ভর্তুকিতে
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা নতুন পে-স্কেল বা বেতন কাঠামো আপাতত বাস্তবায়িত হচ্ছে না। পে-কমিশনের জন্য নির্ধারিত বাজেটের বড় একটি অংশ বর্তমানে কৃষিঋণ মওকুফ, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি এবং জ্বালানি খাতের ভর্তুকি মেটাতে ব্যয় করা হচ্ছে। ফলে সরকারি চাকুরিজীবীদের নতুন পে-স্কেলের জন্য আরও অপেক্ষা করতে হতে পারে।
বরাদ্দ ও ব্যয়ের চিত্র: প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকার পে-কমিশনের জন্য প্রাথমিকভাবে ৪০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছিল। তবে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং জনকল্যাণমূলক খাতের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সেই অর্থ ভিন্ন খাতে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
গ্রাফিক থেকে প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী ব্যয়ের বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
জ্বালানি ভর্তুকি: সবচেয়ে বড় অংকের টাকা ব্যয় হচ্ছে জ্বালানি খাতে। এই খাতে ভর্তুকি বাবদ ২৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
কৃষিঋণ মওকুফ: কৃষকদের আর্থিক চাপ কমাতে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার কৃষিঋণ মওকুফ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি: সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টিসিবির ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে ৩৮.০৭ কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে।
কেন পিছিয়ে যাচ্ছে পে-স্কেল? বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষি ও জ্বালানি খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সরকারের কাছে অগ্রাধিকার পাচ্ছে। গ্রাফিকের একটি চিত্রে দেখা যায়, পাল্লার একদিকে কৃষিঋণ, ফ্যামিলি কার্ড ও ভর্তুকিকে রাখা হয়েছে যার ওজন পে-স্কেলের তুলনায় অনেক বেশি। অর্থাৎ, জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট এই খাতগুলোতে ব্যয়ের আধিক্যের কারণেই পে-স্কেলের বিষয়টি আপাতত স্থগিত বা ধীরগতিতে এগোচ্ছে।
উপসংহার: যদিও সরকারি কর্মচারীরা উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নতুন বেতন কাঠামোর আশা করছিলেন, তবে সরকারের বর্তমান লক্ষ্য ভর্তুকি ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী শক্তিশালী করা। ফলে গ্রাফিকের ভাষায় এটি স্পষ্ট যে, ‘সহসাই হচ্ছে না নতুন পে-স্কেল’। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা পেলেও নির্দিষ্ট একটি শ্রেণির মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকার কেন পে স্কেল ঘোষণা না করার পক্ষে?
বর্তমান প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, সরকার আপাতত নতুন পে-স্কেল ঘোষণা না করার পেছনে মূলত ৩টি প্রধান কারণ কাজ করছে:
১. বাজেটের অগ্রাধিকার পরিবর্তন (ভর্তুকি ও জনকল্যাণ)
গ্রাফিকটিতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে, পে-কমিশনের জন্য যে ৪০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল, সরকার সেই বিশাল অর্থ এখন জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাতে ব্যয় করছে। যেমন:
জ্বালানি খাতে ভর্তুকি: এখানে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা চলে যাচ্ছে, যা মোট বরাদ্দের অর্ধেকেরও বেশি।
কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা: কৃষিঋণ মওকুফে ১,৫০০ কোটি এবং ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে কম মূল্যে পণ্য সরবরাহে বড় অংকের অর্থ ব্যয় হচ্ছে। সরকার মনে করছে, এই মুহূর্তে আমলাতান্ত্রিক বেতন বৃদ্ধির চেয়ে সাধারণ মানুষের খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বেশি জরুরি।
২. মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা (Inflation Control)
সাধারণত নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করলে বাজারে মুদ্রার সরবরাহ বেড়ে যায়, যার ফলে দ্রব্যমূল্য আরও বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশে এমনিতেই মূল্যস্ফীতি বেশি। এই অবস্থায় সরকারি কর্মচারীদের হাতে অতিরিক্ত টাকা আসলে তা বাজারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে, যা সাধারণ মানুষের জন্য কষ্টকর হবে।
৩. রাজস্ব ঘাটতি ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা
পে-কমিশন বাস্তবায়নের জন্য সরকারের রাজস্ব আয় থেকে বিশাল একটি অংশ ব্যয় করতে হয়। গ্রাফিকের নিচের দিকের ‘পাল্লা’ বা স্কেলটি লক্ষ্য করলে দেখবেন, একদিকে আছে ভর্তুকি ও ঋণ মওকুফ, আর অন্যদিকে পে-স্কেল। যেহেতু ভর্তুকির পাল্লা ভারী, তাই সরকার নতুন করে বড় কোনো আর্থিক দায়বদ্ধতা (যেমন পে-স্কেল) নিতে চাইছে না।
এক কথায় বলতে গেলে: সরকার এই মুহূর্তে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির চেয়ে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, জ্বালানির দাম স্থিতিশীল রাখা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে টিসিবির পণ্য পৌঁছে দেওয়াকে বেশি সাশ্রয়ী ও জরুরি মনে করছে।
এসব ভর্তুকী কি মূল্যস্ফিটি উসকে দিবে না?
ভর্তুকি এবং মূল্যস্ফীতির (Inflation) সম্পর্কটি বেশ জটিল। ভর্তুকি একাধারে মূল্যস্ফীতি কমাতে সাহায্য করে, আবার ভুলভাবে প্রয়োগ করলে তা মূল্যস্ফীতি উসকেও দিতে পারে।
আপনার শেয়ার করা তথ্যের আলোকে এর দুটি দিকই নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:
১. যেভাবে ভর্তুকি মূল্যস্ফীতি “নিয়ন্ত্রণ” করে (ইতিবাচক দিক)
সরকার যখন জ্বালানি বা কৃষিতে ভর্তুকি দেয়, তখন তা সরাসরি উৎপাদন খরচ কমিয়ে দেয়।
জ্বালানি ভর্তুকি: ডিজেল বা বিদ্যুতের দাম না বাড়লে পরিবহন খরচ এবং সেচ খরচ নিয়ন্ত্রণে থাকে। ফলে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম হঠাৎ করে বেড়ে যায় না।
কৃষি ও ফ্যামিলি কার্ড: সার ও বীজে ভর্তুকি দিলে ফসলের উৎপাদন বাড়ে। আবার ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে কম দামে পণ্য দিলে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর বাজারের বাড়তি দামের চাপ পড়ে না।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে, ভর্তুকি হলো মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে একটি ‘ঢাল’।
২. যেভাবে ভর্তুকি মূল্যস্ফীতি “উসকে” দিতে পারে (নেতিবাচক দিক)
ভর্তুকি তখনই বিপদের কারণ হয় যখন সরকারের আয়ের চেয়ে ব্যয় অনেক বেশি হয়ে যায়।
বাজেট ঘাটতি ও টাকা ছাপানো: ভর্তুকির ২৪ হাজার কোটি টাকা যদি সরকারের কাছে না থাকে এবং এই ঘাটতি মেটাতে সরকার যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ধার করে বা নতুন টাকা ছাপায়, তবে বাজারে মুদ্রার সরবরাহ বেড়ে যায়। মুদ্রার সরবরাহ বাড়লে টাকার মান কমে যায় এবং জিনিসের দাম বেড়ে যায়।
সুযোগ ব্যয় (Opportunity Cost): পে-স্কেলের ৪০ হাজার কোটি টাকা যখন ভর্তুকিতে চলে যাচ্ছে, তখন সেই টাকা উন্নয়নমূলক কাজে (যেমন অবকাঠামো তৈরি) ব্যয় হচ্ছে না। দীর্ঘমেয়াদে এটি উৎপাদনশীলতা কমিয়ে মূল্যস্ফীতি ঘটাতে পারে।
সারসংক্ষেপ:
সরকার এখানে একটি ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে। পে-স্কেল দিলে সরকারি কর্মচারীদের হাতে নগদ টাকা আসত, যা সরাসরি বাজারে চাহিদা বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি ঘটাত। তার বদলে সরকার জ্বালানি ও কৃষিতে ভর্তুকি দিচ্ছে যাতে উৎপাদন ও পরিবহন খরচ কম থাকে, যা পুরো দেশের সাধারণ মানুষের জন্য সহায়ক।
তবে, এই ভর্তুকির টাকা যদি রাজস্ব আয় থেকে না এসে ঋণ বা টাকা ছাপানোর মাধ্যমে আসে, তবে তা অবশ্যই ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেওয়ার ঝুঁকি রাখে।



