২০১০ বনাম ২০২৬ : বৈষম্যের বেড়াজালে উপজেলা ভূমি অফিসের অফিস সহকারীরা, কেন এই অবহেলা?
দেশের মাঠ প্রশাসনের চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন গ্রেড ও পদবিতে গত দেড় দশকে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। ২০১০ সালে সমসাময়িক গ্রেডে চাকরিতে যোগদান করেও ২০২৬ সালে এসে দেখা যাচ্ছে এক আকাশ-পাতাল বৈষম্য। অন্যান্য প্রায় সব দপ্তরের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও পদমর্যাদা বৃদ্ধি পেলেও চরম বৈষম্যের শিকার হয়ে একই স্থানে স্থবির হয়ে আছেন উপজেলা ভূমি অফিসের অফিস সহকারীরা। এই বৈষম্য নিরসনে এখন মাঠ পর্যায়ের কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের সুবাতাস বইছে।
২০১০ বনাম ২০২৬: একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ
২০১০ সালে চাকুরিতে নিয়োগের পর বিভিন্ন দপ্তরের কর্মচারীদের তৎকালীন গ্রেড এবং ২০২৬ সালে বর্তমান সরকারের বিভিন্ন সময়ের আপগ্রেডেশন ও নীতিমালার আলোকে তাদের বর্তমান গ্রেডের একটি চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
| পদের নাম | ২০১০ সালের গ্রেড | ২০২৬ সালের বর্তমান গ্রেড |
| উপজেলা ভূমি অফিসের অফিস সহকারী | ১৬তম গ্রেড | ১৬তম গ্রেড (কোনো পরিবর্তন নেই) |
| প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক | ১৪তম গ্রেড | ১০ম গ্রেড |
| প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক | ১৭তম গ্রেড (পিটিআই থাকলে ১৬) | ১৩তম গ্রেড |
| উপ-সহকারী তহশিলদার | ১৭তম গ্রেড | ১২তম গ্রেড |
| সহকারী তহশিলদার (পদোন্নতি প্রাপ্ত) | ১৬তম গ্রেড | ১১তম গ্রেড |
| উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা | ১৬তম গ্রেড | ১০ম গ্রেড |
| স্বাস্থ্য সহকারী | ১৬তম গ্রেড | ১৪তম গ্রেড |
উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১০ সালে যারা ১৭তম গ্রেডে (যেমন: উপ-সহকারী তহশিলদার) যোগদান করেছিলেন, তারা পদবি ও গ্রেড পরিবর্তন করে আজ ১২তম গ্রেডে উন্নীত হয়েছেন। এমনকি উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা ১৬তম গ্রেড থেকে আজ ১০ম গ্রেডের দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তার মর্যাদা পাচ্ছেন। অথচ, উপজেলা ভূমি অফিসের অফিস সহকারীরা ২০১০ সালেও ১৬তম গ্রেডে ছিলেন, ২০২৬ সালেও সেই একই ১৬তম গ্রেডেই পড়ে আছেন।
কেন এই বৈষম্য এবং এর প্রভাব?
ভূমি অফিসের একজন অফিস সহকারীকে প্রতিদিন শত শত নামজারি, মিস কেস, ভূমি উন্নয়ন কর এবং খতিয়ান সংক্রান্ত জটিল প্রাতিষ্ঠানিক কাজ সামলাতে হয়। মাঠ প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই স্তরের কর্মচারীদের গ্রেড পরিবর্তন না হওয়ায় তাদের মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করছে। সমসাময়িক সময়ে চাকরিতে ঢুকে অন্য দপ্তরের সহকর্মীরা যখন উচ্চতর গ্রেডে বেতন ও সামাজিক মর্যাদা পাচ্ছেন, তখন ভূমি অফিসের অফিস সহকারীরা অর্থনৈতিকভাবে দারুণভাবে পিছিয়ে পড়ছেন।
এখন করণীয় কী?
তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই দীর্ঘস্থায়ী বৈষম্য থেকে মুক্তি পেতে উপজেলা ভূমি অফিসের সকল অফিস সহকারীদের এখনই একক প্ল্যাটফর্মে একত্র হওয়া জরুরি।
১. ঐক্যবদ্ধ ফোরাম গঠন: দেশের প্রতিটি উপজেলার ভূমি অফিসের কর্মচারীদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ঐক্য পরিষদ বা ফোরাম গঠন করা।
২. তথ্য-উপাত্তসহ স্মারকলিপি প্রদান: অন্যান্য দপ্তরের আপগ্রেডেশনের সুনির্দিষ্ট প্রজ্ঞাপন ও তথ্য-উপাত্ত সংযুক্ত করে একটি বিস্তারিত ও যৌক্তিক দাবি সম্বলিত চিঠি/স্মারকলিপি সরাসরি ভূমি মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং অর্থ বিভাগ বরাবর প্রেরণ করা।
৩. নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন: দাবি আদায়ে ঢাকাসহ দেশব্যাপী কালেক্টরেট ও মাঠ পর্যায়ের কর্মচারীদের সাথে সমন্বয় করে নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করা।
মাঠ প্রশাসনের এই বিশাল বৈষম্য দূর করা না হলে সরকারি কাজের গতিশীলতা ব্যাহত হতে পারে। তাই ২০২৬ সালের এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে উপজেলা ভূমি অফিসের অফিস সহকারীদের পদবি পরিবর্তন ও গ্রেড উন্নীতকরণের দাবিটি এখন সময়ের দাবি।



