নতুন পে-স্কেল : প্রথম বছরে বেশি সুবিধা পেতে পারেন নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামো বা পে-স্কেল কার্যকর করার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ এবং সরকারের রাজস্ব আয়ের সীমাবদ্ধতার কথা বিবেচনা করে পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রাথমিক কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম বছরে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের তুলনায় ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মচারীদের বেতন বেশি হারে বাড়ানো হতে পারে।
বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে এটি এজেন্ডাভুক্ত না থাকলেও ‘বিবিধ’ আলোচনায় বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উঠে আসে। বৈঠক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
তিন অর্থবছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন
নাম প্রকাশের শর্তে মন্ত্রিসভার একজন প্রতিমন্ত্রী জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ঘোষণা অনুযায়ী, নতুন এই বেতন কাঠামো একবারে নয়, বরং তিন অর্থবছরে ধাপে ধাপে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করার পরিকল্পনা করছে সরকার।
প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত ছিল—নতুন বেতন কাঠামোতে মূল বেতন যতটুকু বৃদ্ধি পাবে, তা পরপর দুই অর্থবছরে ৫০ শতাংশ করে দেওয়া হবে এবং শেষ (তৃতীয়) অর্থবছরে ভাতার বর্ধিত অংশ কার্যকর করা হবে। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এই মডেলে পরিবর্তন আনার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।
১ম-৯ম গ্রেডে ৪০% এবং ১০ম-২০তম গ্রেডে ৬০% বৃদ্ধির প্রস্তাব
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন খসড়া পরিকল্পনা অনুযায়ী:
১ম থেকে ৯ম গ্রেড: এই উচ্চ ও প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের বর্ধিত মূল বেতনের ৪০ শতাংশ আগামী অর্থবছরে দেওয়া হতে পারে।
১০ম থেকে ২০তম গ্রেড: নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মচারীদের বর্ধিত মূল বেতনের ৬০ শতাংশ আগামী অর্থবছরেই কার্যকর করা হতে পারে।
তবে এই অনুপাত পরিবর্তনের বিষয়ে এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের নেপথ্যে ‘মূল্যস্ফীতি ও পরিচালন ব্যয়’
মন্ত্রিসভার সদস্যরা মনে করছেন, বর্তমান বাজারে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে কম আয়ের কর্মচারীরা সংসার চালাতে তীব্র হিমশিম খাচ্ছেন। তাই প্রথম বছরে তাদের বেশি আর্থিক স্বস্তি দেওয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে, নতুন পে-স্কেল পুরোপুরি একসাথে বাস্তবায়ন করলে সরকারের পরিচালন ব্যয় এক লাফে বিপুল পরিমাণ বেড়ে যাবে। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সেই অনুপাতে রাজস্ব আয়ের নিশ্চয়তা নেই। তাই ব্যয়ের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের সুরক্ষা দিতেই এই ‘কম-বেশি’ রেশিও অনুসরণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামোর তুলনামূলক চিত্র (খসড়া):
+-------------------------+------------------------+
| গ্রেড বিন্যাস | প্রথম বছরে বাস্তবায়নের হার|
+-------------------------+------------------------+
| ১ম থেকে ৯ম গ্রেড | ৪০% (প্রস্তাবিত) |
| ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড | ৬০% (প্রস্তাবিত) |
+-------------------------+------------------------+
তিন কমিশনের প্রতিবেদন পর্যালোচনা ও ব্যয়ের চাপ
উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে ‘জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫’ গঠিত হয়েছিল। গত ২১ জানুয়ারি এই কমিশন প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়, যেখানে কর্মচারীদের বেতন ১০০ শতাংশ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়। এটি সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে।
জাতীয় বেতন কমিশনের পাশাপাশি বিচার বিভাগের জন্য ‘বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পে-কমিশন-২০২৫’ এবং ‘সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিশন-২০২৫’ তাদের পৃথক প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর, গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ জন সচিবের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি ইতিমধ্যে তিনটি বৈঠক করে জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদন বিস্তারিত পর্যালোচনা করেছে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আগামী মাসে
সচিব কমিটির খসড়া সুপারিশে মূল বেতন সর্বোচ্চ ১২০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে, তবে সর্বনিম্ন কত শতাংশ বাড়ছে তা এখনও প্রকাশ করা হয়নি। কমিটি অন্য দুটি কমিশনের প্রতিবেদনও পর্যালোচনা করছে।
সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, এই তিনটি কমিশনের প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে আগামী মাসে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে আনুষ্ঠানিক এজেন্ডা হিসেবে উপস্থাপন করা হবে। সেখান থেকেই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের চূড়ান্ত রূপরেখা ঘোষণা করা হবে। বর্তমানে জনপ্রশাসনে ২০টি গ্রেডের মধ্যে বিসিএস ক্যাডারসহ প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তারা ৯ম গ্রেডে এবং অন্যান্য কর্মচারীরা ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডে কর্মরত রয়েছেন।



